04/21/2026
অভিবাসীদের স্বপ্নের শহর নিউ ইয়র্ক কি তার পুরনো জৌলুস হারাচ্ছে? নিউ ইয়র্ক সিটি নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিটিজেনস বাজেট কমিশনের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, টানা দুই বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির পর ২০২৫ খৃস্টাব্দে এসে শহরটির সামগ্রিক জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এ নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম পিক্স১১।
সংস্থাটি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। যেখানে বলা হচ্ছে, ২০২৫ খৃস্টাব্দে নিউ ইয়র্ক শহরটি অন্য জায়গা থেকে আসা বাসিন্দাদের তুলনায় ১ লাখ ১৪ হাজার জন বেশি পুরনো বাসিন্দা হারিয়েছে। কঠোর ফেডারেল অভিবাসন নীতির কারণে আন্তর্জাতিক অভিবাসন ৭০ শতাংশ কমে গেছে এবং মহামারীর পর প্রথমবারের মতো অভ্যন্তরীণভাবে শহর ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এক সময় প্রধানত উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো শহর ছাড়লেও, বর্তমানে সব আয়ের স্তরের মানুষের মধ্যেই শহর ছাড়ার প্রবণতা সমানভাবে দেখা যাচ্ছে, যা শহরের জীবনযাত্রার মানের ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।
২০২৩ থেকে ২০২৪ খৃস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে দেখা গেছে, শহরের একেবারে স্বল্প আয়ের ৪০ শতাংশ মানুষ উচ্চবিত্তদের তুলনায় অনেক বেশি হারে নিউ ইয়র্ক ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
শহরটি গত দেড় দশকে জনসংখ্যা ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০১১ থেকে ২০১৬ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও এই বৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে কমেছে। এরপর ২০১৭ থেকে ২০১৯ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত টানা কয়েক বছর জনসংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করে, যা শহর থেকে মানুষের বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময়, বিশেষ করে ২০২০ ও ২০২১ খৃস্টাব্দে জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়। মহামারির পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়- ২০২৩ ও ২০২৪ খৃস্টাব্দে উল্লেখযোগ্য হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেখা যায়, যা শহরে মানুষের ফিরে আসা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন বৃদ্ধির প্রতিফলন। কিন্তু এই পুনরুদ্ধার স্থায়ী হয়নি; ২০২৫ খৃস্টাব্দে আবার সামান্য পতন লক্ষ্য করা যায়। সব মিলিয়ে, তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয় যে নিউইয়র্ক সিটির জনসংখ্যা প্রবণতা এখন আর স্থিতিশীল নয়, বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে ২০১৯ থেকে ২০২৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ অন্য স্টেটে চলে গিয়েছে। সবচেয়ে বেশি মানুষ পাড়ি জমিয়েছেন নিউ জার্সিতে। প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি মানুষ নিউইয়র্ক সিটি ছাড়ে, বিপরীতে এসেছে প্রায় ২৬ হাজার। এতে প্রকৃত অর্থে ৩১ হাজার মানুষ নিউ ইয়র্ক ছেড়েছে।
একইভাবে ফ্লোরিডাতেও চলে যাওয়ার বড় ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সেখানে গেছেন, বিপরীতে এসেছেন প্রায় ১৩ হাজার।
এছাড়া পেনসেলভেনিয়া ও কানেকটিকাট এর মতো নিকটবর্তী স্টেটেও স্থানান্তর হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলিনা ও জর্জিয়াতেও নিউইয়র্ক সিটি থেকে মানুষের প্রবাহ বাড়ছে, যা উষ্ণ আবহাওয়া ও কম খরচের জীবনের প্রতি আকর্ষণের ইঙ্গিত দেয়।
শহর ছাড়ার পেছনে বেসরকারি খাতে চাকরি কমে যাওয়ার কারণও যুক্ত। ২০২৫ খৃস্টাব্দের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ খৃস্টব্দের জানুয়ারী - এক বছরে বেসরকারি খাতে মোট ১৮,১০০টি চাকরি কমেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা খাতে ১৬,৭০০টি চাকরি কমেছে।
২০২৪ খৃস্টাব্দের উপাত্ত অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটির অর্ধেকেরও বেশি ভাড়াটিয়া পরিবার তাদের আয়ের একটি বিশাল অংশ ভাড়ায় ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, বহু পরিবার তাদের আয়ের ৩০% থেকে ৫০% ভাড়ায় খরচ করে। এমনকি একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের আয়ের ৫০% এরও বেশি ঘর ভাড়ায় ব্যয় করে, যাকে 'মারাত্মক ভাড়া বোঝা' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয় ও সেই সঙ্গে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব ও উচ্চ করের বোঝা সাধারণ মানুষকে দিশেহারা করে তুলেছে। ক্রমবর্ধমান এই জীবনযাত্রার ব্যয় নিউইয়র্কের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।