20/05/2022
পুত্রদায়।
পূর্বালাপেই সব ঠিক করা ছিল, রবিবারেই রহিমা তার ছেলেটিকে মনির সাহেবের মেয়েকে দান করবে। সেভাবেই গ্রহিতার গৃহ লোকে লোকারণ্য । ছেলের শরীরের মাপে নতুন কাপড়-চোপড়, জুতা-মোজা, টুপি ও পাঞ্জাবি সবকিছুই কিনে প্রস্তুত। কিন্তু মায়ের মন তখনো পুত্রদানের জন্যে শতভাগ প্রস্তুত হতে বাকি। অবুজ শিশুকে কোলে নিয়ে রহিমা মনে মনে কতোকিছুই ভাবে। একদিন বড় হলে সেইতো সুখে দুঃখে মায়ের পাশে দাঁড়াবে। দিনে তিনবেলা না হলেও একবেলা ভাত দিবে। নিজহাতে মায়ের লাশ কবরে নামাবে এমন শত চিন্তা রহিমার মনে এসে বাসা বাঁধে।
এরই মাঝে, প্রতিশ্রুত রবিবারের কথা মনে ভেসে আসতেই, সেই ভরসার খড়কুটো একটা একটা করে মনের অজান্তেই বৈশাখী ঝড়ের মতো ঝরে পড়তে থাকে। নিধর রহিমা সেদিন কি জবাব দিবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। গরীবের মাথার ঘিলু অপুষ্টিতে সে পর্যন্ত বাড়েনি কখনো । সন্তানের স্নেহ মায়ায় যতটুকু বেড়েছে তাও যেনো আজ শূন্য হতে চলেছে। দারিদ্রতার শেষ প্রান্তে এসে অসহায় মা যেন অমানুষদের মাঝেই নিজেকে বারবার আবিস্কার করেন। মায়ের নির্ঘুম চোখ দুটো তখনো ছলছল। অশ্রুজল ছাড়া তার আছেই বা কী। একাই চলতে পারে না সাথে যোগ দিয়েছে তিনটি সন্তানের বোঝা । সংসার সমরে একাই সেই বোঝা বয়ে চলেছে। আর যে পারে না। অসহায়ত্বের শেষ সীমান্তে এসে রহিমা কোন সঠিক স্বীদ্ধান্ত নিতে পারে না ।
পুত্রদানের মাহেন্দ্রক্ষণ চোখ থেকে সরাতে পারেনি রহিমা, ঘুমিয়েও পুত্রহারা কল্পিত শিহরণে জেগে উঠে বারবার । চোখের পাতায় পাতাঝরা আর্তনাদের ঢেউ তুলে, সে ঢেউ দু'চোখ ছাপিয়ে বন্যা বইয়ে চলে ত্যানার বালিশে। গত তিনদিন ধরে মায়ের বুকের স্রোতসীনি নিঃশব্দে বয়েই চলেছে।
অসার দেহের হৃদস্পন্দন জীবনকে নানা প্রশ্নবাণে ব্যথিত করে। অসম পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব ম্লান মুখে মূহ্যমান মা সহস্র যাতনা সহ্য করেই আজ এ পর্যন্ত এসেছে । জীবনের এই অসহনীয় ভার, সইতে যে পারে না আর।
স্বামী নামের যে দেবতা তাকে এ অকূল সায়রে ভাসিয়ে গেছে, ক্ষণে ক্ষণে তার কথাও ফল্গুধারার মতো চীড়ধরা বক্ষে বইয়ে চলে। স্বামীর নিরুদ্ধেষ যাত্রার রাতের কথাও মনে পড়ে । সুখের আশা নিয়েই একদিন দু'জনে ঘর বেঁধেছিল। আজ সে সুখের ঘরের খড়কুটো কালবৈশাখীর বাতাসে উড়ে, উড়ে ঝরে পড়ে। অভাগীদের সুখের ভাগীদার কেউ হতে চায় না, দুঃখেরও না। পৃথিবীর সকল মায়া বুকে জড়িয়েও সন্তানকে পরহস্তে সমর্পণ করতেও রহিমার মন সায় দেয় না। তবুও কথা রক্ষার খাতিরে সেদিন মনির সাহেবের বাড়িতে উপস্থিত হয়।
আজ তার সন্তানের আদরের কমতি নেই। নতুন কাপড় পরিয়ে বিভিন্নজন কোলে নিয়ে দেখছে। জীবনে আজই প্রথম সে একটু ভালো খাবার খেয়েছে। উচ্ছিষ্ট খাওয়ার প্রচলিত মুখে তার স্বাদ-গন্ধ অপরূপ কিন্তু সে স্বাদ তার কাছে নিম তিক্ততার বিষাদেই মিশে রইলো।
সবাই অনুষ্ঠান আয়োজনে ব্যস্ত, সেই দৃশ্য দেখে রহিমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে । কখনো ভাবে, মা হয়ে সন্তানের জন্যে জীবনে যা করতে পারেনি হয়তো তার চেয়ে সহস্রগুণ সুখে জীবন কাটাবে তারই গর্ভজাত । দুঃখ-সুখের দুকূলে, কোলের সন্তানের নতুন পোশাক ঝলক দিয়ে উঠে অনাথের চোখে । বুকভাঙ্গা ব্যথার বাঁধভাঙ্গা জোয়ার উথলে উঠে বারবার। সবাই রহিমার স্বহস্তে পুত্রদানের জন্যে অপেক্ষা করছে। সবার কোল ঘুরিয়ে ছেলেটিকে রহিমার কোলে দেয়া হলো । কোলের সন্তানের চোখে চোখ পড়তেই ছেলেটি মায়ের দিকে তাকিয়ে সুখের হাসি, হেসে উঠে। তখনি রহিমা, ছেলেটিকে নিয়ে একদৌড়ে সেই গৃহত্যাগ করে। এরপর থেকে আর কোনদিন রহিমাকে ঐ এলাকায় ভিক্ষার জন্যে আসতে দেখা যায়নি।
এনামুল হক।
২০-০৪-২০২২