09/01/2026
একটি দেশ কতটা এগোচ্ছে তা পরিমাপ করা যায় সেই দেশের গবেষণাগার এবং উদ্ভাবনের হার দেখে। যখন পুরো বিশ্ব Artificial Intelligence (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং রোবোটিক্স নিয়ে বিপ্লব ঘটাচ্ছে, তখন আমাদের গর্বের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি 'আধুনিক রিকশা'যা বুয়েট আবিষ্কার করেছে। রিকশা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হতে পারে, কিন্তু এটি কি আমাদের মেধার চূড়ান্ত প্রতিফলন?
#বিশ্ব যখন মত্ত মহাকাশ ও সমরাস্ত্রের আধুনিকায়নে:
• যুক্তরাষ্ট্র (USA): তারা এখন F-35 Lightning II-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার জেট ব্যবহার করছে যা রাডারে ধরা পড়ে না। এছাড়া তারা এমন লেজার ওয়েপন সিস্টেম (HELIOS) তৈরি করেছে যা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ড্রোন বা দ্রুতগামী বোট ধ্বংস করা সম্ভব। তাদের 'প্রম্পট গ্লোবাল স্ট্রাইক' প্রজেক্টের লক্ষ্য হলো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে এক ঘণ্টার মধ্যে নির্ভুলভাবে হামলা চালানো।
• রাশিয়া (Russia): তারা উদ্ভাবন করেছে S-500 প্রোমিথিউস, যা বিশ্বের অন্যতম সেরা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এছাড়া তাদের 'জিরকন' (Zircon) হাইপারসনিক মিসাইল শব্দের চেয়ে ৯ গুণ দ্রুত চলতে পারে, যা বর্তমান কোনো ডিফেন্স সিস্টেম দিয়ে আটকানো প্রায় অসম্ভব।
• চীন (China): চীন এখন চালকবিহীন যুদ্ধজাহাজ এবং DF-17 হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল তৈরিতে শীর্ষে। তারা এআই (AI) চালিত ড্রোনের একটি বিশাল 'ঝাঁক' (Swarm Drones) তৈরি করছে যা একসাথে শত শত টার্গেটে হামলা করতে পারে।
• তুরস্ক (Turkey): তাদের তৈরি Bayraktar TB2 ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। সল্পমূল্যে কার্যকর এই ড্রোন দিয়ে তারা বিশ্বের সমরাস্ত্র বাজারে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে।
#আমাদের পরনির্ভরশীল উন্নয়ন:
আমরা পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু সত্যটা হলো—এগুলো তৈরি হয়েছে জাপান ও চীনের নকশা এবং প্রযুক্তিতে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে রাশিয়ার প্রযুক্তিতে। উদ্বেগের বিষয় হলো, আজ যদি সেখানে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তা সামাল দেওয়ার মতো নিজস্ব বিশেষজ্ঞ বা উন্নত রোবোটিক প্রযুক্তি আমাদের দেশে নেই। আমরা কেবল ব্যবহারকারী হয়েই রয়ে গেলাম, নির্মাতা হতে পারলাম না।
অন্যান্য দেশগুলো যেখানে নিজেদের স্বনির্ভর করছে, আমরা সেখানে পিছিয়ে আছি:
• ভারত: তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে চন্দ্রযান পাঠাচ্ছে চাঁদে এবং নিজস্ব ফাইটার জেট (Tejas) বানাচ্ছে।
• ভিয়েতনাম: তারা এখন বৈশ্বিক চিপ (Microchip) ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের বড় হাবে পরিণত হচ্ছে।
ইসরায়েল এবং নেদারল্যান্ডস এখন Precision Agriculture ব্যবহার করছে। তারা ড্রোন এবং AI দিয়ে প্রতিটি গাছের পুষ্টির অভাব নির্ণয় করে। আধুনিক বিশ্বে এখন Vertical Farming এবং Lab-grown Meat (ল্যাবে তৈরি মাংস) নিয়ে গবেষণা চলছে যেন ২০৫০ সালের বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য নিশ্চিত করা যায়।
আমাদের কৃষকরা এখনও বৃষ্টি বা সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। যদিও আমরা দানা শস্য উৎপাদনে সফল, কিন্তু ফসলের রোগ নির্ণয় বা আধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব প্রযুক্তির কোনো ছোঁয়া নেই। আমরা কেবল ট্রাক্টর আমদানিতেই সীমাবদ্ধ।
আমেরিকা ও ইউরোপে এখন Robotic Surgery (যেমন: Da Vinci Surgical System) সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। CRISPR প্রযুক্তির মাধ্যমে জিন এডিটিং করে ক্যান্সার বা বংশগত রোগ নিরাময়ের চেষ্টা চলছে। উন্নত বিশ্বে এখন থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে মানুষের কৃত্রিম অঙ্গ (Bioprinting) তৈরির গবেষণা চলছে।
আমাদের এখানে একটি আধুনিক এমআরআই (MRI) বা সিটি স্ক্যান মেশিন নষ্ট হলে তা ঠিক করার মতো নিজস্ব প্রকৌশলী নেই। বিদেশের টেকনিশিয়ানের অপেক্ষায় রোগীরা মাসের পর মাস বসে থাকে। আমরা কেবল দামী দামী মেশিন কিনতে জানি, কিন্তু সেগুলো তৈরি বা মেরামত করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারিনি।
প্রতি বছর আমাদের বুয়েট, মেডিকেল বা ঢাবির হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী দেশ ছাড়ছে। কেন? কারণ এখানে মেধার মূল্যায়ন নেই, গবেষণার পরিবেশ নেই।
• প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে বড় বড় ফ্লাইওভারের কথা থাকে, কিন্তু একটিও কি বলে যে তারা জিডিপির ৫% গবেষণায় ব্যয় করবে?
• কোনো দল কি অঙ্গীকার করেছে যে তারা বিদেশে থাকা বাংলাদেশী মেধাবীদের ফিরিয়ে এনে উন্নতমানের 'রিসার্চ ল্যাব' তৈরি করবে?
• মেধা পাচার রোধে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য কি সরকারের কাছে আছে?
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার থাকে ক্ষমতা দখল আর গালভরা উন্নয়নের বুলি নিয়ে, দীর্ঘমেয়াদী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পরিকল্পনা সেখানে অনুপস্থিত।
বিদেশ থেকে প্রযুক্তি কেনা বন্ধ করে সেই টাকা শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। বাইরে থেকে কনসালটেন্ট হায়ার না করে আমাদের দেশের মেধাবীদের ফিরিয়ে এনে কাজের পরিবেশ দিতে হবে। রিকশা নয়, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিক্স, আধুনিক অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং সফটওয়্যার।
ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমাদের দাবি হওয়া উচিত—মেধাবীদের দেশে ধরে রাখার রোডম্যাপ কী? কেবল ভবন বানিয়ে উন্নয়ন হয় না, উন্নয়ন হয় মেধা চর্চার ক্ষেত্র তৈরিতে।
-Abdullah Al Masud