21/12/2025
বিষ্ণুপুর মেলা, -একসময় ছিল শিল্প, সুর ও জীবনের মেলা। এখন হয়েছে –পর্যটন সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প উৎসব। একসময় বিষ্ণুপুর মেলার পরিচয় ছিল তার নামেই, বিষ্ণুপুর মেলা মানেই ছিল বাউল-ফকিরের গান, ছৌ-নাচ, কিংবা উচ্চাঙ্গ সংগীতের মায়াবী আসর। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে মেলার সেই চিরাচরিত রূপটি ক্রমশ ধূসর হয়ে আসছিল। গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছিল, লোকসংস্কৃতির সেই ধ্রুপদী গাম্ভীর্যকে সরিয়ে দিয়ে মেলার মঞ্চ দখল করে নিয়েছিল চটুল নাচ-গান আর সস্তা বিনোদনের হুজুগ। সংস্কৃতির এই অবক্ষয় যখন অনেককেই ব্যথিত করছিল, ঠিক তখনই এ বছর মেলার প্রাঙ্গণে দেখা গেল এক অন্যরকম আবহাওয়া। দীর্ঘদিনের সেই হাহাকার মুছে দিয়ে এ বছরের বিষ্ণুপুর মেলা আবার ফিরেছে তার আদি ও অকৃত্রিম রূপে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের আলাপ থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার লোকগানের শিকড় ছোঁয়া সুর—সব মিলিয়ে এ বছর যেন কেবল উৎসব নয়, বরং বাংলার হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের এক পবিত্র অঙ্গীকার।
অনেক কিছুর মধ্যে এই সব বিশেষ লোকশিল্পের আয়োজনও থাকছে এবারের বিষ্ণুপুর মেলায়-
• • নাটুয়া নাচ (23rd Dec, 2025)
পুরুলিয়া মানেই রুক্ষ লাল মাটি, পলাশ ফুল আর মাদলের শব্দ। এই মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে আছে এমন এক আদিম নৃত্যধারা, যা দেখলে আজও শিহরণ জাগে। সেই নাচটি হলো নাটুয়া। 'নাটুয়া' শব্দটি এসেছে 'নাট্য' থেকে। তবে এটি প্রচলিত নাটকের মতো নয়। মনে করা হয়, প্রাচীনকালে এই অঞ্চলের মল্লবীর বা যোদ্ধারা যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য যে শারীরিক ব্যায়াম ও কসরত করতেন, তা-ই কালক্রমে নৃত্যের রূপ পেয়েছে। এটি মূলত একটি পুরুষপ্রধান নাচ। নৃত্যশিল্পীদের বলা হয় 'নাটুয়া'।
নাটুয়া নাচের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্রুত লয় এবং বীরত্বপূর্ণ ভঙ্গি। নাচের সময় শিল্পীরা এমনভাবে হাত-পা সঞ্চালন করেন, যা দেখে মনে হয় তাঁরা সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছেন। নাটুয়া নাচের সাজসজ্জা বেশ বৈচিত্র্যময় এবং আকর্ষণীয়:
• সারা শরীরে সাদা খড়িমাটি বা রঙের প্রলেপ দিয়ে বিভিন্ন নকশা আঁকা হয় (যাকে স্থানীয় ভাষায় 'তিলক' বলা হয়)।
• মাথায় পাগড়ি এবং কোমরে রঙিন কাপড় বা ঘুনসি বাঁধা থাকে।
• পায়ে থাকে ভারী নূপুর বা ঘুঙুর, যা প্রতিটি পদক্ষেপে বীরত্বব্যঞ্জক শব্দ তৈরি করে।
• অনেক সময় হাতে লাঠি বা ঢাল-তলোয়ারের প্রতীকী সরঞ্জাম থাকে।
নাটুয়া নাচের প্রাণ হলো তার বাদ্য। ধামসা, মাদল, শানাই আর করতালের গগনবিদারী শব্দে যখন আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়, তখন শিল্পীদের মধ্যে এক অদ্ভুত উন্মাদনা কাজ করে। বাদ্যের তালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচের গতি বাড়ে, যা দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। ছৌ নাচের প্রবল জনপ্রিয়তার আড়ালে নাটুয়া অনেক সময় ঢাকা পড়ে গেলেও, এর মৌলিকত্ব এবং আদিম বুনো সৌন্দর্য একে স্বতন্ত্র করে রেখেছে।
• • রাভা নৃত্য (24th dec, 2025)
উত্তরবঙ্গের সবুজ বনানী আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বসবাসকারী রাভা সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ার জেলার রাভা জনজাতির জীবনচর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী রাভা নৃত্য। এই নৃত্য কেবল বিনোদন নয়, বরং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, কৃষি এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক শৈল্পিক মাধ্যম। রাভারা মূলত প্রকৃতি উপাসক। তাদের প্রতিটি নাচের পেছনে থাকে কোনো না কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় কারণ। রাভা নৃত্য সাধারণত দলবদ্ধভাবে পরিবেশিত হয়। নারী ও পুরুষ উভয়েই এতে অংশগ্রহণ করেন। এই নৃত্যের চলন অত্যন্ত সাবলীল এবং প্রকৃতির ছন্দ—যেমন বাতাসের দোল বা নদীর বয়ে চলা—এর মুদ্রার মধ্যে ফুটে ওঠে।
রাভা নৃত্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
• খোকচি নৃত্য: এটি রাভাদের অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় নৃত্য। সাধারণত ফসল কাটার উৎসবের সময় এই নাচ পরিবেশিত হয়। ভালো ফলন হওয়ার আনন্দে দেবতাকে ধন্যবাদ জানাতে এই নাচের আয়োজন করা হয়।
• ফারকান্তি নৃত্য: এটি মূলত একটি বীরত্বব্যঞ্জক এবং শোক পালনের নৃত্য। রাভাদের কোনো বীর যোদ্ধার মৃত্যু হলে তার সম্মানার্থে এবং শোকাতুর পরিবারের মনোবল বাড়াতে এই নাচ করা হয়। হাতে তলোয়ার ও ঢাল নিয়ে পুরুষরা এই নাচে অংশ নেন।
• হামজার নৃত্য: কৃষিভিত্তিক এই নাচে ঝুম চাষের বিভিন্ন পর্যায়—যেমন জমি পরিষ্কার করা, বীজ বোনা এবং ফসল তোলার ভঙ্গিগুলো নাচের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়।
রাভা নৃত্যশিল্পীরা সাধারণত নিজেদের তাঁতে বোনা পোশাক পরেন। রাভা নৃত্য প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে তাদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায়। নাচের তালের সাথে সংগতি রেখে বাজানো হয়:
• হেম (ঢোল সদৃশ বাদ্যযন্ত্র)
• শিঙা (মহিষের শিং দিয়ে তৈরি)
• বাঁশি (বাঁশের তৈরি)
• খাম এবং বাদুংডুপ্পা (এক ধরণের তন্তুজ বাদ্যযন্ত্র)
এই নাচ শুধু রাভা সমাজের পরিচয় বহন করে না, বরং এটি পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতির একটি অমূল্য সম্পদ। প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের এক চমৎকার প্রতিফলন এই রাভা নৃত্য।
• • ভাটিয়ালি গান (24th dec, 2025)
বাঙালির প্রাণের সুর ভাটিয়ালি। মূলত মাঝিমাল্লাদের কণ্ঠেই এই গানের জন্ম। যখন মাঝি নদীর ভাটির দিকে নৌকা ছেড়ে দেন, তখন কায়িক শ্রমের প্রয়োজন খুব একটা থাকে না। অলস মুহূর্তে নৌকার গলুইতে বসে উদাস মনে যখন মাঝি আপন মনে গান ধরেন, তখনই সৃষ্টি হয় ভাটিয়ালি। বাংলার লোকসংগীতের এক অমূল্য সম্পদ হলো ভাটিয়ালি গান। নদীমাতৃক এই বাংলায় নদীর কলতান আর মাঝিদের জীবনের সুখ-দুঃখের মিশেলে গড়ে উঠেছে এই বিশেষ সংগীত ধারা। 'ভাটিয়ালি' শব্দটি এসেছে 'ভাটি' থেকে। নদী যখন সমুদ্রের দিকে বয়ে যায়, তখন তাকে বলা হয় ভাটি। ভাটির টানে নৌকা চালানোর সময় যে সুরের লহরী তৈরি হয়, তাই ভাটিয়ালি। ভাটিয়ালি গান শুধু মাঝির পেশাগত গান নয়, এটি জীবনের এক গভীর দর্শনও বটে।
দূর দেশে থাকা প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা এবং একাকীত্বের আকুতি। মানব জীবনকে একটি নৌকার সাথে এবং সংসারকে অগাধ সমুদ্রের সাথে তুলনার মধ্য দিয়ে "মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না"—সুরে মুহূর্তেই বাঙালির মন এক আদিম ও অকৃত্রিম শান্তিতে ভরে যায়। ভাটিয়ালি কেবল একটি লোকসঙ্গীত নয়, এটি বাংলার জনপদের এক অখণ্ড ইতিহাস।
• • মারুনি নাচ (25th dec, 2025)
উত্তরবঙ্গ ও সিকিমের মানুষেরা আজও মারুনি নাচের ঐতিহ্য সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছেন। রঙিন পোশাক, মাদলের গুমগুম শব্দ আর ধাতুরের হাস্যরস—সব মিলিয়ে মারুনি নাচ হিমালয়ের কোলের এক অমূল্য সাংস্কৃতিক সম্পদ। নেপালি সংস্কৃতির এক অনন্য ও প্রাণবন্ত লোকনৃত্য হলো মারুনি নাচ। এটি প্রধানত নেপালি সম্প্রদায়ের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্যগুলোর মধ্যে একটি, যা দার্জিলিং, সিকিম, নেপাল এবং ভুটানের পার্বত্য অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মারুনি নাচ কেবল বিনোদন নয়, বরং এটি ভক্তি, সংস্কৃতি এবং আনন্দ উদযাপনের এক চমৎকার সমন্বয়।
মারুনি নাচের উৎপত্তি কয়েক শতাব্দী আগে। প্রচলিত আছে যে, এই নাচের শুরু হয়েছিল মালসিংহ রাজার আমল থেকে। ধর্মীয়ভাবে এটি অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়গান গাওয়ার প্রতীক। মকর সংক্রান্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও এই নাচের প্রচলন রয়েছে। মারুনি নাচের মূল আকর্ষণ হলো এর পরিবেশনা শৈলী। এই নাচে সাধারণত পুরুষরাই অংশগ্রহণ করে, তবে মূল নৃত্যশিল্পীরা নারীদের পোশাকে সজ্জিত হন। এদের বলা হয় 'মারুনি'।
• মারুনি: রঙ-বেরঙের শাড়ি, গয়না এবং মাথায় ফুল পরে পুরুষরা নারী সেজে নৃত্য করেন।
• ধাতুরে: এই নাচের অন্যতম মজার চরিত্র হলো 'ধাতুরে'। সে মূলত একজন বিদূষক বা সং হিসেবে কাজ করে। ধাতুরে মাস্ক বা মুখোশ পরে দর্শকদের বিনোদন দেয় এবং নাচের তালে তালে রসিকতা করে।
মারুনি নাচের প্রাণ হলো এর সংগীত। কোনো যান্ত্রিক বাদ্যযন্ত্র নয়, বরং মাটির টানে তৈরি বাদ্যযন্ত্রই এখানে ব্যবহৃত হয়।
• মাদল: এটি এই নাচের প্রধান বাদ্যযন্ত্র। মাদলের ছন্দেই নাচের গতি নির্ধারিত হয়।
• খৈঞ্জরি ও মুজুরা: তালের ভারসাম্য বজায় রাখতে এই ছোট বাদ্যযন্ত্রগুলো ব্যবহৃত হয়।
• বাঁশি: পাহাড়ি সুরের আমেজ তৈরি করতে বাঁশির ভূমিকা অনবদ্য।
• • পুতুলনাচ
বাংলার পুতুল নাচের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। মধ্যযুগীয় কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে পুতুল নাচের উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, নাটকের আদি রূপটিই ছিল পুতুল নাচ। সাধারণ মানুষের কাছে পৌরাণিক কাহিনী বা সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এটিই ছিল সবথেকে সহজ ও আকর্ষণীয় উপায়। বাংলার পুতুল নাচ কেবল কাঠ বা মাটির পুতুলের নড়াচড়া নয়, এটি বাংলার গ্রামীণ প্রাণের স্পন্দন। এই লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।
• • বনবিবির পালা (29th dec, 2025)
সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে যেখানে বাঘ আর নোনা জলের কুমিরের সাথে মানুষের নিত্য বসবাস, সেখানে মানুষের একমাত্র ভরসার নাম 'বনবিবি'। বনবিবির পালগান বা জহুরনামা মূলত এই অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস ও জীবনসংগ্রামের কাহিনী।
বনবিবির পালার সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ হলো দুখে নামের এক অনাথ ছেলের কাহিনী।
• সংকট: ধনা ও মনা নামক দুই সওদাগর সাতটি নৌকা নিয়ে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে যায়। তারা দক্ষিণ রায়ের কাছে দুখেকে উৎসর্গ করার বিনিময়ে প্রচুর মধু ও মোম লাভ করে।
• উদ্ধার: বাঘ-রূপী দক্ষিণ রায় যখন দুখেকে খেতে উদ্যত হয়, তখন দুখে তার মা’র শিখিয়ে দেওয়া বনবিবির মন্ত্র পড়ে ডাক দেয়। বনবিবি তাঁর ভাই শাহ জঙ্গলীকে নিয়ে এসে দুখেকে উদ্ধার করেন।
• শান্তি স্থাপন: এরপর বনবিবির হাতে দক্ষিণ রায় পরাজিত হয় এবং শেষে তাদের মধ্যে একটি আপস হয় যে, দক্ষিণ রায় আর কখনো কোনো মানুষকে আক্রমণ করবে না, যদি মানুষ লোভ ত্যাগ করে বনে প্রবেশ করে।
বনবিবির পালা কেবল একটি অতিপ্রাকৃত গল্প নয়, এর পেছনে গভীর পরিবেশগত বার্তা রয়েছে:
• প্রকৃতি ও মানুষের ভারসাম্য: এই পালা শিখিয়ে দেয় যে, বন থেকে কেবল ততটুকুই নেওয়া উচিত যতটুকু বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। লোভ করলে দক্ষিণ রায় (প্রকৃতি) রুষ্ট হয়।
• সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: সুন্দরবনে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই বনবিবির পূজা দেয় বা শিরনি চড়ায়। এটি বাংলার লোকায়ত ধর্মের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেখানে জাতপাত বা ধর্মের বিভেদ ম্লান হয়ে যায়।
বনবিবির পালা আসলে সুন্দরবনের আদিম ভয় আর সেই ভয়কে জয় করার এক সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। আজ আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও যখন দক্ষিণ রায়ের বাঘের আতঙ্ক কমেনি, তখন বনবিবি আজও সুন্দরবনের মানুষের কাছে সাহস আর বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে টিকে আছেন।
আপনিও সপরিবারে ও সবান্ধবে আসুন, প্লাবিত হোন বাংলার লোকশিল্পের এই ধারায়, অনুভব করুন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অপার্থিব জগত; আমাদের 'মল্লভূম বিষ্ণুপুর' পেজের পক্ষ থেকে রইল নিমন্ত্রণ।