16/02/2026
"কমিউনিস্ট পার্টির ম্যানিফেস্টো"র
বাংলা পরিভাষা নিয়ে কয়েকটি কথা----------------------------------
----------------------অতনু হুই
বিদ্যাজাগতিক কর্মীদের বাংলাভাষায় সাম্যবাদী চর্চা, এবং তার মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে - প্রথম সময় থেকেই পরিভাষা চর্চাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হয়েছিলো। আজ যখন "লাল মলাটের বই" প্রকাশ দিনের ১৭৫ বছর পেরিয়ে গেছি, তখন বিষয়টির গুরুত্ব আরো বেশি বেশি করে সামনে আসছে।
( ২১ ফেব্রুয়ারী, ১৮৪৮, রেড বুক ডে, "কমিউনিস্ট পার্টির ম্যানিফেস্টো" র ২৩ পাতার জার্মান সংস্করনের প্রথম প্রকাশ।)
আজকের দিনে মার্কসবাদ বিষয়ে চর্চার অন্যতম মূল সমস্যা হলো বাংলা ভাষায় ঐ বিষয়কে বোধগম্য ভাবে প্রকাশ করা। এখনো এই বাংলায় বিদ্যাজাগতিক ক্ষেত্রে সাম্যবাদী চর্চা আঞ্চলিক ভাষায় সেভাবে বিকশিত না হওয়ায় সুনির্দিষ্ট পরিভাষা গড়ে তোলার কাজ অনেকাংশে অধরা থেকে গেছে। সে কারনে "কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো"র বাংলা ভাষায় অনুবাদে আড়ষ্টতা ও কাঠিন্য দু'ই থেকে গেছে। এ রকম হলে যে কোনো মৌলিক রচনা ও তার অনুবাদ কখনো সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে না। বরং তা হয়ে ওঠে আরো দুর্বোধ্য। যা অনুবাদ পাঠে মানুষকে মোটেই আগ্রহী করে তোলেনা।
বাংলাভাষায় সাম্যবাদী চর্চা ও পরিভাষা প্রনয়নে অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন- সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীকালে নরেন্দ্রনাথ রায়, চারুচন্দ্র সান্যাল, রেবতী বর্মন, এবং আরো পরে, কাকাবাবু, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সুধী প্রধান, ও আরো অনেকে এ কাজে আগ্রহের সঙ্গে এগিয়ে আসেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'সাম্য' প্রবন্ধে -কমিউনিস্ট, কমিউনিজম কথাগুলি পরিভাষা ছাড়া সরাসরি ব্যবহার করেন। পরবর্তীকালে রুশবিপ্লব বাঙালির- মননে, চিন্তনে, ভাবজগতে যে আলোড়নস্রোতের সৃষ্টি করে, তাতে সাম্যবাদী চর্চার মাত্রা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি শুরু হয় বিভিন্ন পরিভাষার অনুসন্ধান। এই সময়-'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা'থেকে, 'ভারতবর্ষ', 'বিশ্বভারতী' আরো অনেক পত্রিকায় পরিভাষা চয়নের নতুন বহুমাত্রিক আবহাওয়া সৃষ্টি হয়।
এই সময় সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর - "সাধারণ সত্ত্ববাদীর ইস্তাহার"নাম দিয়ে ১৯২৯ খ্রীঃ "কমিউনিস্ট পার্টির ম্যানিফেস্টো"র বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। এটি বাংলাভাষায় প্রকাশিত সর্বপ্রথম অনুবাদ কি না এ প্রশ্নে পন্ডিতমহলে দ্বিমত আছে। অনেকে দাবী করেন ১৮৭৬ খ্রীঃ জনৈক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি প্রথম সেই কাজটি করেছিলেন। সে কথা ভিন্ন।
সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ইস্তাহারের অনুবাদ প্রকাশক করেছিলেন - "ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি"র বঙ্গীয় প্রাদেশিক শাখার পক্ষে-আবদুল হালিম।
এখানে সেই অনুবাদের কয়েকটি পরিভাষা উল্লেখ করা হল-----
১)কমিউনিস্ট---সাধারণ সত্ত্ববাদী।
২)বুর্জোয়া---পরশ্রম ভোগী।
৩)প্রলেটারিয়েট---আত্মোৎপন্ন বঞ্চিত সম্প্রদায়।
৪)ক্লাস---সম্প্রদায়।
বলা চলে কমিউনিস্ট অর্থে -"সাধারণ সত্ত্ববাদী" কথাটির প্রয়োগ ছিলো একেবারেই নতুন।
পরবর্তীকালে এই পরিভাষা ও তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্নমহলে সংশয় তৈরী হয়। অবশেষে ১৯৩২ খ্রীঃ আবদুল হালিম "গণশক্তি পাবলিশিং হাউস" থেকে হুবহু "কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো"নাম দিয়ে পৃথক অনুবাদ বাংলাভাষায় প্রকাশ করেন। সেই সময় ১২ আনা দামে বইটি পাওয়া গেলেও এখন বহু মূল্য দিয়েও তা বড় দুর্লভ। বইটি পাওয়া গেলে আবদুল হালিম ও সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পরিভাষা সংক্রান্ত মিল অমিলগুলি চিহ্নিত করতে পাঠক মহলের অনেক সুবিধা হতো।
এরপরে "বর্মণ পাবলিশিং হাউস" থেকে "কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো"র আরেকটি বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়। অনুবাদক- শ্রী কৃষ্ণ গোস্বামী। নাম--"সাম্যবাদীদের ফতোয়া"।ম্যানিফেস্টোর তর্জমা হিসাবে "ফতোয়া" কথাটি সে সময় মোটেই গ্রহণীয় হয়নি।
অপরদিকে সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিভাষা চয়নের সঙ্গে সহমত ছিলেন না চারুচন্দ্র সান্যাল। তিনি ১৯৩৩ খ্রীঃ জলপাইগুড়ি থেকে ম্যানিফেস্টোর অপর এক অনুবাদ প্রকাশ করেন। নাম দেন--"সাম্যবাদীদের আদর্শ"। তিনি পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে 'কমিউনিজম'-অর্থে সাম্যবাদ, 'বুর্জোয়া'- অর্থে বণিক, এবং 'প্রলেটারিয়েট' অর্থে শ্রমিক কথাটি ব্যবহার করেন।
১৯৩১ খ্রীঃ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতে থাকে ('প্রলেটারিয়েট' অর্থে)'সর্বহারা' নামে একটি পত্রিকা। তাছাড়া তারও পূর্বে 'গণবাণী'পত্রিকায় "সর্বহারার দাবী" শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তবু চারুচন্দ্র কেন যে 'প্রলেটারিয়েট' অর্থে 'শ্রমিক' কথাটি ব্যবহার করেছিলেন,'সর্বহারা' কথাটি বাদ দিয়ে তা অজানা থেকে গেছে।
অবশ্য পরবর্তীকালে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর সামগ্রিক ভাবে গ্রহণীয় পরিভাষাগুলিকেই তাঁর লেখাগুলিতে স্হান করে দেন।যেমন-কমিউনিস্ট, সর্বহারা, শ্রেণী, বুর্জোয়া ইত্যাদি।
এই প্রসঙ্গে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। রেবতী বর্মণ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ১৯৩২ খ্রীঃ এক পত্রে মার্কসীয় বিভিন্ন শব্দের পরিভাষা নিয়ে তাঁর সংশয় ও জিজ্ঞাসার কথা উল্লেখ করেন। এবং এ প্রসঙ্গে শ্রীযুক্ত যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধির পরিভাষাগুলির যৌক্তিকতা কতটা তা জানতে চান।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর উত্তরে বলেন-- নেশন, ন্যাশানাল কথাগুলি ইংরাজীতেই শ্রেয়। যেমন- অক্সিজেন,হাইড্রোজেন। তিনি বিদ্যানিধির নেশন অর্থে "রাষ্ট্রজন"শব্দটি অপেক্ষা "রাষ্ট্রজাতি" শব্দটি অধিক সহজ বলে বিবেচনা করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি উত্তরপত্রে রেবতী বর্মণকে দেওয়া পরিভাষাগুলি নিম্নরুপ-
১)caste-- জাতি।
২)nation--- রাষ্ট্রজাতি।
৩)race--- জাতি।
৪)people-- জনসমূহ।
৫)population--- প্রজন।
সর্বশেষে বলা প্রয়োজন, পরিভাষা না খুঁজে মুজফ্ফর আহমদ ই সর্বপ্রথম "প্রলেটারিয়েট" ও "বুর্জোয়াজি" শব্দের তাৎপর্য পূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন---
"শোষণের দ্বারা সম্পত্তিহীন হয়ে যারা আপনাদিগকে ভাড়া খাটতে বাধ্য হয় তাদেরকেই 'প্রলেটারিয়েট' বলা হয়।
কিম্বা আধুনিক ধনিকগণ, যারা দিন মজুরকে কোনো প্রকারে বেঁচে থাকার মতো মজুরি দিয়ে যে কোনো কাজে খাটিয়ে থাকে তাদেরকেই 'বুর্জোয়াজি' বলা হয়।
তবু আজও বাংলাভাষায় পরিভাষা চর্চা নিয়ে সমস্যা কিন্তু পিছু ছাড়েনি। বরং তা থেকেই গেছে। মার্কসবাদ আন্তর্জাতিকতায় পরিপুষ্ট এক মতবাদ হলেও রাষ্ট্র, সমাজ,জাতি ইত্যাদির প্রশ্নে সময়ের কালভেদে পৃথক থেকে যাওয়ায় - তার ভাব ও ভাষার পার্থক্য থেকেই গেছে। কাজেই আজ বুঝি ভাষা বোধেরও সাম্য আর আন্তর্জাতিকতা জরুরী।তাই বিদ্যাজাগতিক কর্মীদের এ নিয়ে আরো চর্চা জরুরি।
---------------------------------------
' রেড বুক ডে'- লাল মলাটের বই দিবসকে সামনে রেখে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে মনে রেখে।