14/08/2021
স্বর্গ, নরক ও আমরা।
আমাদের সনাতন ধর্মে, মৃত্যুর পরবর্তী জীবন নিয়ে অনেক কিছুই লেখা আছে। কিন্তু সেটা খ্রীষ্ট ধর্ম বা ইসলাম ধর্মের থেকে অনেকটা আলাদা। খ্রীষ্ট ধর্মে বা ইসলাম ধর্মে, তাদের নিজস্ব ধর্ম প্রচারক আছেন, তারা মানুষের কি কি করলে স্বর্গ প্রাপ্তি হবে আর কি কি করলে নরক প্রাপ্তি হবে সেগুলো খুব নির্দিষ্ট করে বলেছেন, তাদের ধর্মগ্রন্থে। কিন্তু সনাতন হিন্দু ধর্মে এমন কোন কিছুই নির্দিষ্ট নেই। পুরানে আমরা দেখতে পাই যে, আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের ক্রীত কর্মের হিসাব হয়, সেখানে আমাদের ইহ জন্মের ক্রীত কর্মের জন্য স্বর্গ বাস বা নরক বাস হতে পারে, কিন্তু কারোর ই চিরকালীন স্বর্গবাস বা চিরকালীন নরক বাস হয় না। গরুড় পুরানে নরক যন্ত্রনার নানা বর্ণনা আছে, যেমন, গায়ে গরম তেল ঢেলে দেওয়া, সুলে চড়ানো ইত্যাদি। এই সবই মানুষ কে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার জন্য বলেই মনে হয়।
এই প্রসঙ্গে মহাভারতের একটা বিষয় বলা প্রয়োজন বলে মনে করছি। মহাভারতে, পান্ডব রা যুদ্ধে জিতে, ৩৬ বছর রাজত্ব করার পর, বানপ্রস্থে চলে যায়, এবং তারা মনে করে যে, তারা এতো ভালো কাজ করেছে, যে তাদের স্বর্গ প্রাপ্তি নিশ্চিত। কিন্তু এই স্বর্গ যাওয়ার পথে, হিমালয়ের রাস্তায় আস্তে আস্তে যুধিষ্ঠির এর সব ভাই এর মৃত্যু ঘটে, শেষে, এক সহচর কুকুর কে নিয়ে ইন্দ্রলোকের দরজায় পৌছায় যুধিষ্ঠীর। সেখানে যখন প্রবেশ করে, স্বর্গে, ইন্দ্র তাকে আহ্বান করেন, কিন্তু যুধীষ্টীর অবাক হয়ে যান, কারন স্বর্গে তিনি দেখতে পান, কৌরবদের। অর্থাৎ, দূর্যোধন, এবং তার ভাইদের। স্বভাবতই, যুধিষ্টীর ভীষণ রেগে গিয়ে ইন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করেন, কৌরব রা কেন স্বর্গে, ওদের তো নরক প্রাপ্তি হওয়ার কথা। তখন ইন্দ্র বলেন যে, না কুরুক্ষেত্রে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের সবাই তাদের ক্ষত্রিয় ধর্মের পালন করতে গিয়ে, নিজের নিজের ধর্ম পালন করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন, আর ধর্ম পালন করলে তো তার স্বর্গবাস নিশ্চিত। যুধিষ্টীর তখন তার বাকি ভাইদের কথা জানতে চান, ইন্দ্র তখন তাকে নরকে নিয়ে যায়, সেখানে দেখা যায়, ভীম, দ্রৌপদী, অর্জুন, নকুল সহদেব সবাই যন্ত্রনাতে কষ্ট পাচ্ছে। ভীম তার খাওয়ার মায়া ত্যাগ করতে পারেনি তাই, অর্জুন তার আত্মবিশ্বাসের অভাবের জন্য, দ্রৌপদী পাঁচস্বামী থাকা সত্ত্বেও অর্জুন কে বেশি ভালোবাসতো তাই। এমন অবস্থায় যুধিষ্টীর ভীষণ রেগে যায়, ইন্দ্রের ওপর, বলে, যে এটা একদমই অনাচার। তখন ইন্দ্র বা মতান্তরে কৃষ্ণ বলেন, যে সবকিছুর মায়া ত্যাগ করলে তবেই স্বর্গ প্রাপ্তি ঘটে, তুমি তো তোমার ক্রোধই ত্যাগ করতে পারোনি। কুরুক্ষেত্রে, কৌরবদের অন্যায়ের শাস্তি তো তাদের মৃত্যুর মাধ্যমে দিয়েছে পান্ডবরা, তাহলে একই অপরাধে কেন বার বার শাস্তি পাবে, কৌরব রা, অপরদিকে পান্ডব দের মৃত্যু তো যুদ্ধভূমিতে ধর্মপালনের জন্য হয়নি, হয়েছে জীবিত স্বর্গ প্রাপ্তির লোভের জন্য।
অর্থাৎ পুরো বিষয়টাই বিপরীত হয়ে গেলো। পুরানে বলা হয়, চারটে স্বর্গ, আর চারটে নরক আছে, যা মিলিয়ে হলো সংসার, মানুষ এই সবের মধ্যেই বারবার ঘোরাফেরা করে। আর যখন সব ধরনের আশা আকাঙ্খা মানুষের কাছে সমান হয়ে পরে, ত্যাগে শান্তি মনে হয়, তখনই একমাত্র এই সংসারের চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মা কে একটা নদী পেরোতে হয়, যার নাম বৈতরিনী, যার খেয়া মাঝিকে দেওয়ার জন্য চিতাতে দেওয়া হয়, সোনা আর রুপোর টুকরো। সেই নদী পার হলে আত্মার ঠাঁই হয়, পিতৃলোকে। যেখানে তার পুর্বপুরুষরা থাকে। নারীদের কোথায় জায়গা হয়, সেই নিয়ে তেমন কোন উল্লেখ আমি পাই নি। সেই পিতৃলোককেই বলা হয় যমালয়। যেখানে থাকে যম। এবার পিতৃলোকের পুর্বপুরুষরা তাদের সন্তান দের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, যাতে সে আবার পৃথিবীতে জন্ম নিতে পারে, আর যতদিন না সেটা হচ্ছে, ততদিন, তাদের খাওয়ার জন্য পিন্ড দান করা হয়। পিন্ড দান করেন মর্তে থাকা তাদের সন্তান বা সন্তান রা।
প্রধানত তিনটে খন্ড দেওয়া হয়, একটি মনের জন্য, একটি শরীরের জন্য আর একটি আত্মার জন্য।
যম কিন্তু যমালয়ে কোন কিছুর বিচার করেন না, যমের উল্লেখ বেদে পাওয়া যায়, যার প্রধান কাজ হলো মানুষের কৃতকর্মের হিসাব রাখা, কে কি পুণ্য করলো কে কি পাপ করলো তার হিসাব অনুযায়ী তার স্বর্গ, বা নরক বা মর্ত প্রাপ্তি ঘটে থাকে।
আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়, স্বর্গ বা নরকের এই ধারনা, মানুষের জীবনের নানা সময়কে নির্দিষ্ট করার জন্য বলা হয়েছে। মানুষের জীবনে স্বর্গ বা স্বর্গ সুখ, এবং নরক বা নরক যন্ত্রনা, সময়ের সাথে সাথে ফিরে ফিরে আসে, যে মানুষটা সুখ ও দুঃখকে সমান ভাবে নিতে পারে এবং ক্ষুদ্র স্বার্থ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে, এবং সমস্যার প্রকৃত কারন খুঁজে তার সমাধানের চেষ্টা করে, সেই প্রকৃত মুক্ত। যাকে অসাধারন কোন আনন্দ যেমন ভাসাতে পারেনা, তেমনই তীব্র দুঃখ তাকে পাগল করতে পারেনা, কারন সে জানে কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়।