29/11/2021
S S C-র মৃত্যুঘণ্টা(শেয়ার না করলে মনে করবেন আপনার বিবেক মারা গেছে)
১৯৯৮ সাল, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিল বাংলার শিক্ষিত বেকারদের কথা মাথায় রেখে।স্কুলে ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগে ঘুষ, স্বজনপোষণ,দলীয় কর্মীদের অবৈধ সুযোগে মামলায় মামলায় যখন জেরবার সরকার,তখন গঠিত হলো স্কুল সার্ভিস কমিশন। বাংলার যুব সমাজের কাছে এক আশার আলো,এক ভবিষ্যতের দিশা।
বছর বছর নিয়ম করে এস এস সি পরীক্ষা হতো। ফর্ম বেরোত, দলে দলে বেকার ফর্ম ফিল আপ করতো। ইউনাইটেড ব্যাংক এর সামনে বিশাল লাইন। রাইস, মাইস,হালদার কোচিং নামক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন,কোচিং,এবং সাফল্যের হারের প্রতিযোগিতা। সেন সুন্দরম, বি এম পাবলিকেশন, মনোরমা ইয়ার বুক এ ডুবে থাকতো ছাত্র সমাজ। নিয়মিত পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, প্রতিদিন পত্রিকায় ফল ঘোষণা,পরবর্তী কালে অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।এবং প্রতিবছর পাড়ায় পাড়ায় বেশ কিছু ছেলে মেয়ে মাস্টার দিদিমণির তকমা পেয়ে জীবনে সার্থকতা লাভ করতো। যারা পেত না আবার পরের বছরের প্রস্তুতি।আবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ,আবার পরীক্ষা,ফল প্রকাশ।এক সুন্দর সিস্টেম ছাত্র ছাত্রীদের ভবিষ্যতের দিশা দেখিয়েছিল।
রাজনীতি থাকে রাজনীতির জায়গায়, সিস্টেম চলে নিজের মতো। ২০১১ সালে বাম সরকারের যখন পতন হলো, মহা উচ্ছ্বাসে মাতলো জনগন, নতুন যুব সমাজের মধ্যে হুল্লোড় আনন্দ। তখনও কেউ ভাবেনি বাম সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পতন হলো এক সিস্টেমের,পতন হলো লক্ষ বেকারের স্বপ্নের,পতন হলো স্কুল সার্ভিস কমিশনের।
এরপর থেকে শুধুই ধোঁয়াশা। কমিশনের চেয়ারম্যানের পোস্টটা মিউজিকাল চেয়ার হয়ে গেল। অভিযোগ উঠলো দুর্নীতির। ফর্ম বিক্রি হলো,কখনো পরীক্ষা হলো না,কখনো পরীক্ষা হলো তো ফল প্রকাশ হলো না,ফল প্রকাশ হলো তো প্যানেলে ব্যাপক গরমিলের অভিযোগ।লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে নিয়োগের অভিযোগ সামনে আসতে লাগলো। বিশ্বজিৎ কুণ্ডুর মতো বেকারের স্বপ্ন নিয়ে ব্যবসা করার কান্ডারী গণ বুক ফুলিয়ে ঘুরতে লাগলেন। কোনো নেতার কন্যা প্যানেলে না থেকে চাকরি পেয়ে গেলেন। কোর্টে মামলা হলো,কতো প্যানেল বাতিল হলো,কতো বেকার হাহাকার করে গেল কে তার খবর রাখে? স্কুলে স্কুলে ভ্যাকেন্সি পড়ে রইলো। মহামান্য শিক্ষামন্ত্রী ব্যঙ্গ করে বললেন "এস এস সি তো দুর্গা পুজো নয় যে প্রতি বছর করতে হবে।" তার চেয়ে দুর্গা পুজোয় টাকা দিলে যুবকদের বেশি আনন্দ দেওয়া যায় বুঝে নিল সরকার। দেবাংশুর মত কচি নেতাও ব্যঙ্গ করে এস এস সি পরীক্ষার্থীকে বার্ধক্য ভাতা নেবার আবেদন করতে বললেন। আসলে সরকার বুঝে গেছিল যুব সমাজকে পকেটে পোরার অনেক রাস্তা আছে।কটা শিক্ষিতরা মরল তো কি আছে? তার কয়েক গুন যুবককে খেলাতে মাতিয়ে রাখা বাম হাতের খেলা।
এরপর গ্রুপ ডি নিয়োগ নিয়ে হাইকোর্টে উলঙ্গ হয়ে গেল স্কুল সার্ভিস কমিশনের দুর্নীতি। প্যানেল এর বাইরে থেকে এমন বহু নিয়োগ হয়েছে যার সম্মন্ধে অধিকর্তা,আঞ্চলিক অধিকর্তা থেকে আধিকারিক কারোর কাছে কোনো তথ্য নেই। বললেই একদল সমর্থক চিৎকার করে উঠবে সরকারকে বিপাকে ফেলার চক্রান্ত, কেস করে নিয়োগ আটকে দেবার অভীপ্সা ইত্যাদি। আজ হাইকোর্ট রায় দিল সি বি আই তদন্তের।
না উল্লসিত হবার কোনো কারণ নেই। সারদা কান্ড, রাজীব কুমার বহু কেস তো দেখলাম।কোনো ফয়সালা নেই,তদন্তের অগ্রগতি নেই।ভোটের সময় হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হয়,কাজের কাজ শূণ্য। অভিযোগ বিষয়ে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দেখাচ্ছেন প্রাক্তনকে,প্রাক্তন দেখাচ্ছেন শিক্ষা দপ্তরকে,শিক্ষা দপ্তর কমিশনকে।বেকারদের স্বপ্ন,ভবিষ্যত, ন্যায় বিচার নিয়ে পাসিং ফুটবল খেলা হচ্ছে।খেলা হবে স্লোগানের সার্থক রূপায়ণ। আর কোর্ট আজ একে ভর্ৎসনা,কাল ওকে তিরস্কার করছে। কোর্টের কাজ কি বকুনি দেওয়া নাকি! সে তো যে কেউ পারে? ন্যায় বিচারের আশায় যৌবন ধুঁকে ধুঁকে মরছে,তাদের বিচারের কোনো হদিস নেই। "শিব ঠাকুরের আপন দেশে,আইন কানুন সর্বনেশে।" এর মধ্যে কোর্ট বলেছে কমিশনটাই তুলে দেওয়া উচিত। শুনে ভয় হয়,এটাই বোধয় সকলের ইচ্ছা।আবার ম্যানেজিং কমিটি,আবার নিয়োগের ক্ষমতা,আবার পকেটভরা যোগ্যতার কাগজ।
অবশ্য লিখেই কি হবে।সকলেই বেশ ভালো আছে।মাস গেলে মুফতে টাকা ঢুকছে। কজন দেয়? সামান্য টাকায় বিক্রি করছে চেতনা,বিক্রি করছে স্বপ্ন। বেশ ভালোই আছে সমাজ। দুয়ারে যে কি দুর্দশা অপেক্ষা করছে কেউ বুঝছে না। হুজুগ,ধর্ম,উৎসব,খয়রাতি,নেশার ককটেলে ডুবছে সবাই। সি বি আই দিয়ে ঘন্টা হবে।তার চেয়ে বাজুক কমিশনের বিদায় ঘণ্টা।আমরা এই বেশ ভালো আছি।