06/07/2026
বিষয়টা হিন্দু মুসলিমের নয়। আসলে দেশকে ছিন্নভিন্ন করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার এমন একটি আইন নিয়ে এল, যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে নির্বাচন করার ব্যবস্থা করা হলো। এর ফলে হিন্দুদের আসনসংখ্যা কয়েকটি কমে গেল। বর্বর ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্যই ছিল দেশে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং দাঙ্গার পরিবেশ তৈরি করা।
যে সময় হিন্দুদের হয়ে বলার মতো কোনো শক্তিশালী কণ্ঠস্বর আইনসভায় ছিল না, বলা ভালো যখন হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো মুখেরই অভাব ছিল, তখন ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সেই কণ্ঠস্বর হয়ে সামনে এলেন। জীবনের প্রথমদিকে তিনি কখনোই হিন্দু মুসলিম বিভেদের রাজনীতি করেননি। এটি ছিল ব্রিটিশদের কৌশল, আর সেই দাবার চালের প্রভাবেই সারা দেশে বিভেদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
যে মুহূর্তে হিন্দুদের গেল গেল রব উঠল, তখন তিনি হিন্দু সমাজকে রক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, তিনি কখনোই ভিড়ের সঙ্গে গা ভাসিয়ে চলেননি। নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর যে সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজও প্রশংসার দাবি রাখে।
যাই হোক, তাঁর পরিচিতি শুধু রাজনীতি বা হিন্দু নেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তা তাঁর জীবনের প্রতি অবিচার করা হবে। এটি তাঁর জীবনের মাত্র একটি অংশ। তিনি একসময় শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন শ্যামা হক জোট সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন,এবং জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন। যা তাঁর বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় বহন করে। তবে সময় মানুষকে বদলে দেয়। সেই সময়ের যে দাবি ছিল, তিনি সেই দাবিকেই নিজের কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর নামে যারা সংক্ষিপ্ত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লেখা লেখেন, তাঁদের যদি এতটুকু উপলব্ধি থাকত যে রাজনীতির বাইরে মানুষের আরেকটি পরিচয় থাকে, আর সেটিই তার প্রকৃত ও নিজস্ব পরিচয়, তাহলে হয়তো তাঁকে আরও পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরতে পারতেন। যদিও পিতার পরিচয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় অনেকটাই পরিচিত ছিলেন, তবুও তাঁর নিজের কর্মনিষ্ঠা, মেধা, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং দেশপ্রেম তাঁকে সকলের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা এনে দিয়েছে।
১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, অধ্যবসায়ী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ। পিতা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শ এবং শিক্ষার পরিবেশ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ছাত্রজীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি অসামান্য সাফল্যের পরিচয় দেন। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি আইনশাস্ত্রেও দক্ষতা অর্জন করেন এবং বিদেশে গিয়েও পড়াশোনা করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা অর্জনই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। দেশের শিক্ষা ও সমাজের উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।
মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি এক বিরল নজির স্থাপন করেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার প্রসার, ভারতীয় সংস্কৃতির মর্যাদা বৃদ্ধি এবং মাতৃভাষার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করেন। তাঁর চেতনায় দৃঢ়ভাবে স্থান করে নিয়েছিল এই বিশ্বাস যে একটি শিক্ষিত সমাজই একটি শক্তিশালী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি গড়ে তুলতে পারে। তাই তিনি এমন শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন, যা কেবল পেশাগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মানুষের চরিত্র, মূল্যবোধ ও মানবিকতারও বিকাশ ঘটাবে।
সমাজের প্রতিও তাঁর দায়িত্ববোধ ছিল গভীর। অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের কর্তব্য বলে মনে করতেন। দেশভাগের ফলে উদ্বাস্তু হয়ে পড়া মানুষের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তাঁদের পুনর্বাসন, নিরাপত্তা এবং সম্মানজনক জীবনের দাবিতে তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করেন। মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট বলে অনুভব করার এই মানবিকতাই তাঁকে একজন প্রকৃত সমাজসেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
আজ তাঁর জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।