পটাশপুর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলায় (অধুনা পূর্ব মেদিনীপুর) এগরা মহকুমার অন্তর্গত একটি থানা এলাকা । পটাশপুর-১ ও পটাশপুর-২ ব্লক নিয়ে গঠিত, যার প্রধান কার্যালয় অমর্ষি ও প্রতাপদিঘীতে অবস্থিত। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ব্রিটিশ আমলের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। শিক্ষা ও সংষ্কৃতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। কৃষিনির্ভর গ্রামীন এলাকা-তাই এখানকার বেশিরভাগ মানুষই কৃষির ওপর জীবিকা নির্বাহ করে। উল্লেখযোগ্য ক
ৃষিজ ফসলের মধ্যে- ধান,পাট,বাদাম, তৈল বীজ, শাক-সব্জি,পান বরোজ, আরও অন্যান্য ফসল। স্থানীয় নদী কেলেঘাই, বাগুই,বারচৌকা প্রভৃতি নদী-খাল রয়েছে, সেইজন্য কিছুটা কৃষি সেচের সুবিধা পাওয়া যায়।
উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য স্থানের মধ্যে সম্প্রতি হেরিটেজ স্বীকৃতি পাওয়া সুপ্রাচীন "পঁচেটগড়" রাজবাড়ী বা গড় হাভেলী। এছাড়াও-অমর্ষির মখদুম সাহেবের তিন গম্বুজ মসজিদ, পৌষ সংক্রান্তিতে গোকুলপুরে গোকুলানন্দ বাবাজীর তুলসী চারার মেলা, গোপালপুর চৌধুরী বাড়ির রাধামাধব মন্দির ও সুপ্রাচীন বনেদি বাড়ির দূর্গাপূজা, নৈপুর গড়, পাথরঘাটা বুলাকিপুর কঙ্কেশ্বর শিবের মন্দির, বাল্যগোবিন্দপুর, মঙ্গলামাড়োর মা মঙ্গলা ও গোনাড়া মনসা মাতার মন্দির, বাজিতপুর গ্রামে নারাজীউর তোতলা নিবারনে শিরনী, প্রতাপদিঘী, অমরপুর গ্রামে পাওয়া প্রাচীন মূর্তি,প্রাচীন মঙ্গলামাড়ো হাট, আড়গোয়ালের জব্দার রাসমেলা, পালপাড়ায় যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি প্রভৃতি।এবার আসছি পটাশপুর নামকরন নিয়ে, কিভাবে পটাশপুর নামের উৎপত্তি ?নামটি কোথা থেকে এসেছে তা নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মতামত পোষন করেছেন। পটাশপুরে একসময়ে ছিল বস্ত্রশিল্পের প্রসিদ্ধি, তাই অনেকে মনে করেন প্রাচীন বস্ত্রশিল্পের স্মৃতি বহন করেই 'পট্টবাস' থেকে এসেছে পটাশ বা পটাশপুর নামটি।কৃষ্ণচন্দ্র রায়চৌধুরী তাঁর পুঁথিতে জানিয়েছেন- সপ্তদশ শতকের গোড়ায় এলাকাটি মোগল শাসনাধীন তখনই এক পীরের আস্তানা কে রাজপুত সেনারা "পাটোয়াস" এর উৎপত্তি। এখানকার মুসলমান মহল্লা এটিকে পটাশপুর নামে পরিচিত করান।আবার, বঙ্কিম মাইতির "মেদিনীপুর স্থান নাম" গ্রন্থ থেকে জানা যায় ১৫৫৭ সাল নাগাদ স্থানীয় ভূস্বামী অমর সিংহকে হত্যা করে এলাকা দখল নেন পীর মখদুম সাহেব। আধিপত্য কায়েম করতে তিনি নিয়মিত কামান দাগার ব্যবস্থা করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখের ভাষায় বোমা ফাটার সেই শব্দ থেকেই "পটাশপুর" নামকরন থাকতে পারে।মোগল আমলে পটাশপুরে একটি মোগলঘাঁটি ছিল। যোগেশচন্দ্র বসুর লেখা ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে সুবর্ণরেখার যুদ্ধে আফগানদের পরাজয়ের মধ্য দিয়েই পটাশপুরে মোগল শাসনের সূত্রপাত। মীর বংশের অধীনে ছিল এই মোগল ঘাঁটি। এই বংশের উত্তরাধিকাররা এখনও পটাশপুরেই বাস করেন। ব্রিটিশ আমলে পটাশপুরে দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য বাড়ে। আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক মন্মথ দাসের ‘পটাশপুরের সেকাল-একাল’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৮০৩ সালে দু’জন ইংরেজ সামরিক অফিসার ফার্গুসন ও হারকট সাহেব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পটাশপুর থানা গড়ে তোলেন। এই থানা সংলগ্ন এলাকা পরে পটাশপুর বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।প্রদ্যোতকুমার মাইতির লেখা ‘পূর্ব মেদিনীপুর জেলার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সংগ্রামীদের কথা’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯৪২ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর পটাশপুর বাজার থানা দখল করে স্বাধীন সরকার গঠিত হয়। এই সরকার প্রায় ছ’মাস ছিল। পড়শি রাজ্য ওড়িশা ও পশ্চিম মেদিনীপুর যাওয়ার পথে পটাশপুর বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
পটাশপুরের প্রাচীন নামের মধ্যেই ছিল এই পোশাকের আভাস। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় ‘‘পট্টবাস’’ থেকে প্রথমে পট্টবাসপুর পরে তা পরিবর্তিত হয়ে এলাকাটির নাম হয় পটাশপুর। ইতিহাস বলছে, অবিভক্ত মেদিনীপুরের অর্থনীতিতে কৃষির পরেই ছিল গ্রামীণ তাঁতশিল্পের স্থান। এই জেলার গ্রামবাসীদের আর্থিক স্বাচ্ছ্যন্দের অনেকটাই নির্ভর করত তাঁত শিল্পের উপর। প্রায় প্রতিটি গ্রামেই ছিল একটি করে তাঁতিপাড়া। গ্রামবাসীর মোটা কাপড়ের চাহিদা মেটাতো এই কাপড়ই। তবে শুধু মোটা কাপড় নয়, এক সময় পটাশপুর এলাকায় তৈরি অমর্ষির শাড়ি ছিল এলাকার বিখ্যাত সম্পদ। রাজ্যে সেই কাপড় বিখ্যাত ছিল অমর্ষি-তাঁত নামে। তার সঙ্গে তুলনা করা হত শান্তিপুরের তাঁতের। ‘‘পটাশপুরের কথা’’ বই বলছে, ‘‘পূর্বে এই থানায় ব্যাপক রেশম শিল্পের ব্যবস্থা ছিল। অল্প কয়েক বছর পূর্বে উহা লুপ্ত হইয়াছে। এখন পটাশপুরের খড়ুইতে কিছু কিছু তসর তৈয়ারি করা হয়।’’ আগে পটাশপুরে যে রেশম শিল্প ছিল তার প্রমাণ মেলে ইংরেজ ঐতিহাসিক বেলি সাহেবের ‘মেমোরান্ডা অফ মিদনাপুর’ বইতেও।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৬ সালে কাটনাদিঘিতে রয়েছে ৭৪ টি তাঁতকল। পটাশপুরের অমর্ষি-র শাড়ি, সরিদাসপুরের ধুতি, প্রতাপদিঘি-র মোটা সুতির গামছা ছিল বিখ্যাত তাঁত শিল্পের নিদর্শন।
যাইহোক, পটাশপুর কেলেঘাই নদীর মুখোমুখি। ভূ-প্রকৃতি,মৌসুমী গ্রামীন ও ঐতিহ্য বৈচিত্রের সাথে সাথে,এটি তার সাধারন উপকূলভূমি এবং গ্রামাঞ্চলে পর্যটনে উপলব্ধি করে ।
অমলেন্দু নায়ক
পটাশপুর , পূর্ব মেদিনীপুর