21/07/2025
প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো উমা-মহেশ্বরের মূর্তি উঠে এলো সুরথেশ্বর তলার শিব মন্দিরের গর্ভ গৃহ সংস্কারের সময়। গর্ভ গৃহের প্রায় ৫ ফুট নিচে থেকে উদ্ধার হয়েছে মূর্তি দুটি।অতি নিষ্ঠার সাথে শুদ্ধিকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাও করা হলো। মুর্তিগুলি সম্ভবত পাল বংশের শাসনকালের।
শোনা যায় এই সুরথেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা সুরথ। এই মন্দিরটির ইতিহাস সম্পর্কে একটু বলি-
বোলপুর শহরের ৩ কি.মি দক্ষিণে অজয় নদের তীরে অবস্হিত সুপুর এক অতি সমৃদ্ধ ও ঐতিহাসিক গ্রাম। সুপুরে অবস্থিত বিভিন্ন পুরনো বাড়ি থেকে উঁকি মারা দেওয়ালের ইট আর মন্দির গাত্রে থাকা বট, অশথের শিকড় আজও বহু প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী আঁকড়ে ধরে আছে৷
বোলপুর শহর গড়ে ওঠার বহু আগেই সুপুর ছিল একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য কেন্দ্র৷ অজয় নদীপথে হাজারিবাগ, সুরাট, চন্দ্রকেতুগড়, তিব্বত, অসম সহ নানা জায়গা থেকে আসা পন্যসামগ্রীর ব্যবসা-বাণিজ্য চলত সুপুরে৷ আজ থেকে আড়াই-তিনশো বছর আগের কথা, ব্যবসার জন্য বাংলার উপকূলে তখন আসতে শুরু করেছে পোর্তুগিজরা৷ সেই সময় বাংলায় নুনের ব্যবসা করতে একদল ব্যবসায়ী আসে গুজরাট থেকে৷ তারাই আজ গন্ধবণিক চন্দ্র হিসেবে এই বাংলায় পরিচিত৷ কাটোয়ার গঙ্গার ধারে লবণগোলাই ছিল এদের ব্যবসার কেন্দ্র৷ এক সময় জমি জায়গা কিনে শ্রীবাটি গ্রামে স্থায়ী হয়েছিল তারা৷ এখান থেকে সুপুর বন্দরে লবণ আসত৷ সুপুরের অজয় তীরে দুটি ঘাট ছিল৷ বর্তমান সুপুর দক্ষিণ পাড়ার পশ্চাতে ছিল ‘মাঠতলার’ ঘাট, আর একটু পশ্চিমেই ছিল ‘নুন ভাঙা ঘাট’, এখানে ভিজে নুন শুকিয়ে গুঁড়ো করা হত। যে স্থানে ব্যবসায়ীরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসতেন, সেটি বর্তমানে হাটরসুলগঞ্জ নামে পরিচিত৷ ১৮৫০ সালে খানা থেকে সাঁইথিয়া গামী রেলপথ নির্মানের জন্য অজয় নদের উপর রেল ব্রীজ (বত্রিশ ফোঁকর) তৈরি হল৷ এর রূপকার ছিলেন রাইপুরের জমিদার পরিবারের নীলকন্ঠ সিংহের পুত্র রুদ্রপ্রসন্ন সিংহ এবং স্টেম্বার সাহেব৷ তাই সুপুর বন্দরের গুরূত্ব কমতে থাকে ধীরে ধীরে৷ রসুলগঞ্জের হাট উঠে গিয়ে বসল বর্তমান বোলপুর হাটতলায়৷ বোলপুরের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী রাইপুর, সুপুর, সর্পলেহনা, রূপপুর, বেড়গ্রাম, দেবগ্রাম, গয়েশপুর সহ নানা গ্রামগুলি থেকে মানুষজনের ঢল নামে বোলপুরে৷ অজয়ের তীরের ইটন্ডা, সুপুর, ইলামবাজার বন্দরগুলি ফলস্বরূপ বিলীন হতে থাকে৷
অতীতে সুপুরের নাম ছিল ‘স্বপুর’/ ‘সুবাহুপুর’৷ আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার পূর্বে লাড় দেশে (বর্তমান বাংলার রাঢ় অঞ্চল) রাজত্ব করতেন রাজা সুবাহু সিংহ৷ তাঁর প্রতিষ্ঠিত জনপদ সুবাহুপুরই হল আজকের সুপুর৷ অতীতে সুপুর ছিল একটি রাজ্য৷ রাজা সুবাহুর পরবর্তী এক বংশধর ছিলেন রাজা সুরথ৷ কিংবদন্তি ঘটনা অনুযায়ী পৌরানিক রাজা সুরথ রাজ্যহারা হয়ে এখানেই আশ্রয় নেন। মার্কন্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী তিনিই নাকি নতুন করে প্রথম বসন্তকালীন দুর্গা পুজা শুরু করেন৷ হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরে পেতে তিনি ভগবতী দেবী শিবিক্ষার (গ্রামদেবী) উপাসনার জন্য লক্ষ বলি দেন বলে জনশ্রুতি আছে৷ এই বলি সুপুরের শিবিক্ষা মন্দির (বাঘালা পুকুরের পার্শ্ববর্তী মন্দিরটি) থেকে শুরু করে রজতপুরের মহামায়া মন্দির হয়ে বোলপুরের ডাঙ্গালি কালিতলা পর্যন্ত হয়েছিল৷ এরপরই ডাঙ্গালি কালিতলা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল বলিপুর নামে খ্যাত হয়। এই বলিপুরই কালক্রমে হয়ে ওঠে আজকের বোলপুর।
উপরিউক্ত শিবিক্ষা মন্দিরের পশ্চিম কোণেই রয়েছে বাঘালা (বাঁধা ঘাট) পুকুর৷ পরবর্তী আমলে তৈরি পুকুরটির পূর্ব পাড়ে বাঁধানো সিঁড়ির সম্মুখেই ছিল দুটি বাঘের মূর্তি, কয়েকবছর আগেও যা লক্ষ্য করা যেত, কিন্তু কালের কপোঘাতে আজ তা বিলুপ হয়ে পড়েছে৷ এই বাঘ মূর্তি থেকেই পুকুরের নাম হয় বাঘওয়ালা পুকুর, এখন যা শুধুমাত্র বাঘালায় রূপান্তরিত হয়েছে৷
রাজা সুরথের নামধারী সুরথেশ্বর মন্দির (শিবতলা) বোলপুর-ইলামবাজার সড়কের পাশেই অবস্হিত৷ সুরথেশ্বর মন্দির একসময় ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল৷ প্রায় একশো বছর আগে গজপতিনাগা নামে এক শৈব সাধু মন্দিরে এসে এই মন্দিরের আংশিক সংস্কার সাধন করেন৷ ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে রাইপুরের জমিদার বংশজ প্রমথনাথ সিংহের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তার অর্ধাঙ্গিনী শ্রীমতি সুভাষিনী দাসীর সহায়তায় সুরথেশ্বর মন্দির নতুন করে তৈরি হয়৷
পরবর্তী পোস্টগুলির মধ্যে সুরথেশ্বর মন্দিরের সমস্ত ছবি এবং উৎসব অনুষ্ঠান নিয়ে আসছি।
© Santiniketan and Positivity শান্তিনিকেতন ও ধনাত্মকতা
#ঐতিহাসিক #হিন্দু #মন্দির