22/06/2026
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড-নবদ্বীপের গৌরবগাথা।
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু শহরের নাম লেখা থাকে, যাদের পরিচয় কোনো রাজ্য বা সাম্রাজ্যের সীমায় আবদ্ধ নয়; নবদ্বীপ তেমনই এক নগরী
জ্ঞান, তর্ক ও দর্শনের চিরন্তন রাজধানী।
"প্রাচ্যের অক্সফোর্ড: নবদ্বীপ"
যখন ইউরোপের বহু বিশ্ববিদ্যালয় তখনও নিজেদের পূর্ণ বিকাশের পথে, তখন ভাগীরথীর তীরে এক ছোট্ট জনপদ জ্ঞান, তর্ক, দর্শন ও শাস্ত্রচর্চার দীপ্ত আলোয় আলোকিত করেছিল সমগ্র ভারতবর্ষকে। সেই জনপদের নাম নবদ্বীপ- যে নগরীর খ্যাতি একদিন ছড়িয়ে পড়েছিল কাশী, মিথিলা, উড়িষ্যা, কামরূপ থেকে সুদূর দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য জ্ঞানপিপাসু ছাত্র ও পণ্ডিতের পদচারণায় মুখর ছিল এই বিদ্যাপীঠ। তাই ইতিহাসের পাতায় নবদ্বীপ স্থান করে নিয়েছে "প্রাচ্যের অক্সফোর্ড" নামে।
বৃন্দাবন দাস ঠাকুর তাঁর চৈতন্যভাগবত-এ লিখেছিলেন,
"নানা দেশ হৈতে লোক নবদ্বীপ যায়।
নবদ্বীপে পড়িলে সে বিদ্যারস পায়॥
অতএব পড়ুয়ার নাহি সমুচ্চয়।
লক্ষ কোটি অধ্যাপক নাহিক নির্ণয়॥"
এই পঙ্ক্তি কেবল কাব্যের অলংকার নয়; মধ্যযুগীয় নবদ্বীপের বাস্তব চিত্রেরই প্রতিফলন। ভারতবর্ষের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসতেন ন্যায়, নব্যন্যায়, স্মৃতি, বেদান্ত, মীমাংসা, ব্যাকরণ, অলঙ্কার, জ্যোতিষ ও তন্ত্রশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য। নবদ্বীপের টোলগুলি ছিল সেই সময়ের উচ্চশিক্ষার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র, যেখানে বিদ্যার মর্যাদা ছিল সর্বোচ্চ।
পাল ও সেন যুগে বাংলায় যে জ্ঞানচর্চার ভিত্তি নির্মিত হয়, নবদ্বীপ তার অন্যতম প্রধান ধারক হয়ে ওঠে। একাদশ ও দ্বাদশ শতকে সেন রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই অঞ্চলে সংস্কৃত শিক্ষা ও শাস্ত্রচর্চার বিস্তার ঘটে। পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও বিদ্যার সেই দীপশিখা নিবে যায়নি;
বরং পণ্ডিতসমাজের নিরলস সাধনায় তা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
পঞ্চদশ শতকে নরহরি বিশারদের প্রতিষ্ঠিত চতুষ্পাঠী নবদ্বীপকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। তাঁর উত্তরসূরি বাসুদেব সার্বভৌম এবং পরবর্তীকালে মহামতি রঘুনাথ শিরোমণির হাত ধরে নবদ্বীপ নব্যন্যায় দর্শনের বিশ্ববিখ্যাত কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
নবদ্বীপের শিক্ষাব্যবস্থার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর অবৈতনিক চরিত্র। এখানে বিদ্যা বিক্রয়ের বস্তু ছিল না; ছিল সাধনা ও দানের বিষয়। পণ্ডিতগণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনও বেতন গ্রহণ করতেন না। বরং তাঁদের আহার, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থাও করতেন। জ্ঞানকে সমাজের সম্পদ হিসেবে দেখার এই মহৎ দৃষ্টিভঙ্গি নবদ্বীপকে অন্য সকল শিক্ষাকেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রদান করেছিল।
সমসাময়িক বিবরণে জানা যায়, নবদ্বীপে একসময় হাজার হাজার ছাত্র এবং শত শত অধ্যাপক বিদ্যাচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। টোলগুলির আঙিনা মুখর থাকত শাস্ত্রার্থ, তর্কবিতর্ক ও জ্ঞানান্বেষণের উচ্ছ্বাসে। একজন পণ্ডিতের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছাত্ররা তাঁর কাছে শিক্ষাগ্রহণের জন্য ছুটে আসতেন। বিদ্যার এই অবাধ প্রবাহ নবদ্বীপকে কেবল বাংলার নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধিক রাজধানীতে পরিণত করেছিল।
শুধু শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেই নয়, নবদ্বীপ ছিল আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণেরও উৎসভূমি। এই পুণ্যভূমিতেই আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু, যাঁর প্রেম, ভক্তি ও মানবতার বাণী সমগ্র বিশ্বের কাছে নবদ্বীপের পরিচয়কে আরও মহিমান্বিত করেছে।
আজও নবদ্বীপের প্রাচীন টোল, মঠ, মন্দির ও ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এক গৌরবোজ্জ্বল অতীতের কথা-যখন এই নগরী ছিল ভারতীয় জ্ঞানচর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। তাই নবদ্বীপ শুধু একটি শহর নয়;
এটি বাংলার বিদ্যা, দর্শন, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অমূল্য ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার।
© সিন্ধু ভিশন
#নবদ্বীপ