07/11/2021
ছবির ছেলেটার নাম অনিন্দ্য। আমার একমাত্র ভাই।বয়সে আমার চেয়ে ৪ বছরের ছোট। আজকের লেখাটা অনিন্দ্য কে নিয়ে এবং প্রেক্ষাপটটা আমাদের ছেলেবেলাটাকে ঘিরে।
পারসোনালিটির দিক থেকে আমি ভীষণ এক্সট্রোভার্ট একজন মানুষ। ছেলেবেলা থেকেই মানুষের সাথে মিশতে পারি সহজে। যেখানেই যাই মোটামুটি আসর জমিয়ে ফেলি বলা যায়। সোশ্যাল স্কিলস ভাল। তার উপর স্কুলে ভর্তি হবার পর বিভিন্ন ক্লাসে রেজাল্ট ও ভাল হতে শুরু করল। এই সব বৈশিষ্ট্যগুলোর কারনেই ছোটবেলায় আমি ছিলাম পরিবারের 'Favourite Child'। একেবারে 'Center of Attention' এ থাকতাম সব সময়।
অন্যদিকে অনিন্দ্য ছিল ইন্ট্রোভার্ট। ভাবুক টাইপের ছেলে। ধীর স্থির। ভীষণ শান্ত স্বভাবের।ওর একটাই খুঁত যে ও আমার মত 'Performer' বাচ্চা ছিল না। মেহমান আসলে বাবা যখন বলতেন 'আংকেল কে একটা কবিতা শোনাও' তখন আমার মত হড়বড় করে ও কবিতা বলতে পারতো না। এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিতেও ছিল জঘন্য গোছের। একটা ছবি এঁকে মানুষকে তাক লাগাবার মত তেমন কিছু কখনোই ওর ঝুলিতে থাকতো না। তবে ওকে নিয়ে Greater Family এর সবচেয়ে বড় যে আপত্তি তা হল, ওর স্কুলের রেজাল্ট ছিল অত্যন্ত মাঝারি গোছের। যা দিয়ে কখনো ঠিক জাতে ওঠা যায়না।
ওর বয়স ৬-৭ হতে না হতেই শুরু হল আসল নাটক। অনিন্দ্য প্রতিদিন বুলিং এর শিকার হোত। কখনো আত্মীয় স্বজন কে দিয়ে, কখনো স্কুলের টিচার কে দিয়ে, কখনো বন্ধুদেরকে দিয়ে। আত্মীয় মহলে ওকে নিয়ে টিপ্পনি কাটা, হাসি তামাশা করাটাকে কেউ অপরাধ ভাবতো না। আমাদের বাবা মা ও তখন এর ইম্প্যাক্ট টা বুঝতেন না। তাই তাদেরকেও কোনদিন এসবের প্রতিবাদ করতে দেখিনি।
ওকে শুনতে হোত ও একটা স্টুপিড/গরু/গাধা/ছাগল, ও ওর বোনের মত ব্রিলিয়্যান্ট না, ওকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, বড় হয়ে ও ঢাকার রাস্তায় রিকশা চালাবে, আমার পা ধোয়া পানি ওর সকাল বিকাল ২ বেলা খাওয়া উচিত!
বয়োঃসন্ধিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ওর আত্মবিশ্বাস মাটিতে গিয়ে ঠেকল। কথা বলতে গেলে কথা আটকে যেতো। মানুষের ওকে নিয়ে হাসাহাসি আরো তাতে সহজ হল।রাতের পর রাত ভয়ে ওর ঘুম ভেংগে যেতে দেখেছি।
এতো সব যখন চলছে তখন গল্পের নায়ক অনিন্দ্যর রেসপন্সটা ছিল ভীষণ অন্যরকম। অনেকটা মুনী ঋষি টাইপের।
ও কোনদিন কোনকিছুর প্রতিবাদ করেনি। কারো কাছে বুলিং থেকে বাঁচার জন্যে হেল্প চায়নি। এতোসবের পরেও আমি কোনদিন ওকে ছোট-বড় কারো উপর কখনো রেগে যেতে দেখিনি, বড়দের মুখের উপর একটা কথা ফেরত দিতে দেখিনি, যে ওকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে তাকে ও কখনো হাসিমুখে সালাম দেয়া থামায়নি।
আপাতদৃষ্টিতে লেখাপড়ায় অথর্ব একটা ছেলে এতো অপমানের পরেও কোনদিন কখনো রেন্সপন্সিবিলিটি নেয়া থামায় নি। ঘরের প্রতিটা কাজে বাবা মা কে আমার চেয়ে ও বেশি হেল্প করেছে। ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, থালা বাসন পরিষ্কার করা সব কিছু করতো। সম বয়সী ছেলেদের মত কোন বায়না, জেদ কিচ্ছু ছিল না ওর মাঝে। অসম্ভব নীতিবান, পরোপকারী একটা মানুষ হিসেবে আমি ওকে চোখের সামনে বড় হতে দেখেছি।
সন্তান হিসেবে কে কেমন - সেই বিচার যদি করা হয়, আমি সব সময় ওকে আমার চেয়ে বেশি মার্কস দেব।
আফসোস এটাই যে, এই সমাজে সোনার টুকরো ছেলে সে ই যে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবার একটু খানি ঝলক ছেলেবেলায় তার রেজাল্টে দেখায়। অনিন্দ্যরা সত্যবাদিতার জন্যে, বিনয়ী হবার জন্যে, উপকারী হবার জন্যে কখনো প্রশংসিত হয়না।
অথচ একটা এডুকেশন, বিশেষ করে এক্সাম সিস্টেম প্রতিটা শিশুর Full Potential একে চিহ্নিত করতে এবং সেটা বের করে আনতে পারে কীনা সেই বিচার কোন কাঠগড়ায় হবে? --কেউ কি এই প্রশ্নটা তোলে?
অনিন্দ্য বাংলা, ধর্ম, সমাজ, কৃষিশিক্ষায় পেতো ৫০-৬০। এই ছেলেটাই ইংলিশ-অংক-বিজ্ঞানে পাচ্ছে ৯০-১০০। মোট নাম্বারের দিক থেকে ক্লাসে হয়তো অবস্থান ৩০ তম। অথচ ওর রিপোর্ট কার্ডের নাম্বার তো কন্সট্যান্টলি ইংগিত দিচ্ছিল যে, ওর ইন্টারেস্ট আসলে সাইন্সে। আর মজার ব্যাপার এটাই যে, ক্লাস নাইনে সাইন্সে যাবার পরেই ওর রেজাল্ট ভাল হতে শুরু করে। এস এস সি তে Golden GPA 5 পাবার পরই সবাই নড়েচড়ে বসে, ওকে সিরিয়াসলি নিতে শুরু করে।
সিজিপিএ ৪ এর মধ্যে ৩.৮৪ (যতদূর মনে পড়ে) পেয়ে ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে। এরপর দেশের বাইরে চলে যায়। ওখানে গিয়ে ও নতুন করে নিজের পোটেনশিয়ালটা এক্সপ্লোর করার সু্যোগ পায়। এবং সত্যিকার অর্থে একাডেমিক্যালি প্রশংসা পেতে শুরু করে।এরপর এম এস সি তেও ভাল রেজাল্ট করে পাশ করে। PhD এর জন্যে Canada এর McGill University তে সিলেক্টেড হয়। যেটা ওয়ার্লড র্যাংকিং এ তখন সম্ভবত ছিল ৩২(যদিও পরে সব কিছু না মেলায় যাওয়াটা ক্যান্সেল হয়)। Now he is planning to start his PhD.
একটা brutally bullied ছেলের এই হল চলার পথ।
এই গল্পের সবচেয়ে বড় টুইস্ট হল, আমার ভাই ছোটবেলা থেকে এভাবেই বিশ্বাস করতে প্রোগ্রামড হয়ে গেছে যে - He Is Not Good Enough! এবং এই Inner Voice টা এতো deep, এতোটাই deep এবং raw যে ওর কাছে মনে হয়ে এটা একটা ছায়ার মত ওর পিঠের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। কোন অর্জন ওর আত্মায় শান্তি দেয়না। ওর সবসময় মনে হয় ও সেরা টা করতে পারেনি। এই ফিলিংসটা বয়ে বেড়ানো ভীষণ দুঃসহ। কোন মোটিভেশন, কোন কাউন্সিলিং ওকে কনভিন্স করেনা। কিছুদিন ভাল রাখে কিন্তু ওর বুকের ভেতরের অদৃশ্য ঝড়টা টা পুরোপুরি থামে না।
ওকে আমি জিগ্যেস করেছি, তোমার বুকের মধ্যে কি অনেক ঘৃণা? ও হেসে জবাব দিয়েছিল, "একেবারেই না আপু! ঘৃণার বোঝা তো অনেক ভারি, আমি সবাইকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি।"
আমার যতদূর মনে পড়ে ও দেশের বাইরে যাবার পর ওর একটা ডায়েরি বাবা খুঁজে পান। যেটা ভর্তি ছিল কবিতা দিয়ে। কোনদিন আমরা জানিনি ও কবিতা লিখতে জানে, কোনদিন ও মানুষকে দেখায় নি। সেদিন আমার বাবা মা দু'জনেই অনেক কেঁদেছিলেন। মা বলছিলেন, আমার ছেলেটাকে আমি কষ্ট থেকে আগলে রাখতে পারিনি। আমি যখন ছোটবেলায় আম, বটগাছ, সূর্যাস্তের ছবি আঁকতাম ও আঁকতো 3D shapes, Alien - বাক্সের বাইরের এই পাগলামিগুলো আশেপাশ থেকে কোন উৎসাহ পেতো না। জানিনা অনিন্দ্য এখনো কবিতা লেখে কীনা, স্পেসশিপের ছবি আঁকে কীনা!
আমরা অনিন্দ্যদের সময় থাকতে চিনি না!
এই লেখাটা হয়তো অনিন্দ্যর মত অনেকেই পড়ছে, আমরাই হয়তো আমাদের শব্দ দিয়ে, বাক্য দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার অনিন্দ্যর বুক ভেংগে দিচ্ছি। এবং ওদের বুকের ভেতরে তৈরি করছি ক্ষত। বছরের পর বছর পেরোয় কিন্তু সেই ক্ষতটা শুকায় না। মাঝে মাঝেই সেখান থেকে রক্ত ঝরে। কখনোবা দুঃস্বপ্ন হয়ে রোজকার জীবনের অংশ হয়ে যায়।
একটা শিশু Validation চায়, Acceptance চায়। তার সকল গুণের জন্যে প্রশংসা তার প্রাপ্য। Introversion কখনোই কোন দূর্বলতা না। অন্যের সাথে তুলনা করে প্রতিদিন একটা সত্তাকে ক্ষতবিক্ষত করার কেন কোন বিচার হবে না?
পরিবারের Performer বাচ্চার জন্যেই সব ভালোবাসা, সব ইনভেস্ট এমনটা থাকলে আজই বদলে ফেলুন।
যারা Childhood Trauma থেকে বিভিন্ন আসক্তিতে চলে যায়, আচরণ খারাপ হয়ে যায়, বেপরোয়া জীবন যাপন শুরু করে অনিন্দ্য তাদের জন্যে একটা ক্ল্যাসিক এক্সাম্পল হতে পারে যে, কিভাবে ম্যাচিউরলি কাজের মাধ্যমেই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। এবং রাগ থেকে মানবিক গুণগুলো থেকে স্খলিত না হলে Self Love বাড়ে। এবং দায়িত্বশীল হবার মাধ্যমে Confidence। যে কোন অবস্থায় ভাল মানুষ হবার কোন বিকল্প নাই।
আমার আদরের পুতুল অনিন্দ্যর জন্যে সবাই দোয়া করবেন।
নিচের লেখাটুকু অনিন্দ্যর জন্যে।
--------------------------------
অনিন্দ্য, Raquib Ehsan
আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করেও তোমাকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারিনি। আমার জন্যে তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে এজন্যে আমার ভীষণ একটা অপরাধবোধ কাজ করে। এটা মৃত্যু অবধি থাকবে।
তোমাকে আজকে ২ টো সিক্রেট বলি,
১. আজ থেকে ৪ বছর আগে আমি প্রথম পজেটিভ প্যারেন্টিং এর গুরুত্ব নিয়ে কথা বলা শুরু করি যখন এই শব্দটাও কেউ জানতো না। আজ দেশের লাখ লাখ মানুষ আমার ভিডিও গুলোর মাধ্যমে এই শব্দটা নিয়ে নতুন করে ভাবছে।
খেলনার দোকানে 'সাজানো সুন্দর শৈশব' কিনতে পাওয়া গেলে আমি পৃথিবীর যে প্রান্তেই সেটা থাকুক আমি তোমার জন্যে কিনে আনতাম! সেটা তো পারব না! তবে আমার ভিডিওগুলো আমি কন্টিনিউ করব ইন শা আল্লাহ। তুমি যেটা জান না সেটা হল, আমার পুরো মিশনটার একমাত্র অনুপ্রেরণা তুমি। আমি চাই, যারা আমার ভিডিও দেখে তারা তোমার নামটা জানুক।
তোমার মত হাজার অনিন্দ্যর জীবনটা আমি সুন্দর করতে চাই।
২. I know this one will sound silly for sure! আমি কোনদিন কোন ক্লাসে First হইনি। হয় সেকেন্ড বা থার্ড বা ফোর্থ হয়েছি। আম্মু আব্বু কোনদিন মিলাতে পারতো না কেন আমি জানা প্রশ্ন ইচ্ছে করে ১ টা বা ২ টা ছেড়ে দিয়ে আসতাম।
আমি কখনো কোনদিন জিততে চাইনি। প্রথম হবার উছ্বাস আমি কোনদিন পেতে চাইনি, পরিবারে দিতে চাইনি। আমি অনেক চেষ্টা করেছি যতটুকু হারলে এটা বিশ্বাসযোগ্য হয়। 'I am not the best ' - I strongly wanted to make everyone convinced with this.
রেজাল্টের দিন তোমার মলিন মুখের স্মৃতি আমার জন্যে আজ ও দুঃসহ।
Its an absolute honour for me having you as my sibling.
আমি জানি রিসেন্টলি তুমি ভয়ংকর একটা বিপদের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছ। নিয়মিত নামাজ পড়বে। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাবে। জীবনটা কষ্টের। সৎ মানুষ হিসেবে এটা কাটিয়ে দেও। আর বিশ্বাস কর, Allah will be enough for you.
I pray for you a beautiful place in Jannah. & I wish, I were your neighbour there! It is such a visual treat & contentment of my heart being reared up with an amazing pure soul like you. I dont want to miss that chance in hereafter too.
Much love as always.
✍️ Dr. Shusama Reza 💗