03/09/2026
বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ি, জলপাইগুড়ি:
জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো: এখানে মায়ের সাথে থাকে বাঘ ও সিংহ দুজনেই, মধ্যরাতে হত নরবলি!
১৫১০ সাল নাগাদ শুরু হওয়া এই পুজো আজ ৫১৭ বছরে পদার্পণ করেছে, কিন্তু এর রাজকীয় গাম্ভীর্য আজও এতটুকু ম্লান হয়নি। রায়কত বংশের দুই ভাই, শিষ্য সিংহ এবং বিশ্ব সিংহ এই প্রাচীন পুজোর সূচনা করেছিলেন।
ইতিহাস ও লোককথা থেকে জানা যায়, একবার দুই ভাই শিষ্য সিংহ এবং বিশ্ব সিংহ বৈকুণ্ঠপুরের গভীর জঙ্গলে শিকারে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। শ্রান্ত ও ক্লান্ত হয়ে জঙ্গলের মাঝে একটি বিশালাকার গাছের নিচে বিশ্রাম নেওয়ার সময় তাঁরা দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান। দেবী স্বয়ং তাঁদের নির্দেশ দেন ওই জঙ্গলের বুকেই আরাধনা শুরু করার। দেবীর আদেশে কালবিলম্ব না করে সেই গভীর অরণ্যেই মাটি দিয়ে বেদি তৈরি করে পুজো শুরু করেন তাঁরা। মায়ের আশীর্বাদেই বিশ্ব সিংহ কামতাপুর (পরবর্তীকালে কোচবিহার) রাজ্যের সিংহাসন লাভ করেন এবং শিষ্য সিংহ জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুরে স্বাধীন রায়কত রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। আজও প্রতিমা গড়ার আগে বৈকুণ্ঠপুরের সেই আদি জঙ্গল এলাকা থেকে মাটি সংগ্রহ করে আনা হয়।
রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে দেবীর গায়ের রং 'তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ' বা গলিত সোনার মতো। এই প্রতিমার একটি বিরল ও চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো দেবীর বাহন। এখানে মায়ের পায়ের নিচে চিরাচরিত শ্বেত সিংহের পাশাপাশি একটি বাঘও অবস্থান করে। রাজবংশের আদি বাসস্থানের গভীর অরণ্যের পরিবেশ এবং স্থানীয় কোচ-কিরাত সংস্কৃতির প্রভাব থেকেই বাঘ ও সিংহ উভয়ের এই অনন্য সহাবস্থান দেখা যায়। এছাড়া, অবিভক্ত ভারতের এক অপূর্ব মেলবন্ধন আজও এই প্রতিমার সাজে ফুটে ওঠে। নিয়ম অনুযায়ী, কার্তিক ও গণেশের পোশাক আসে অসম থেকে, মা দুর্গা এবং দুই বোন লক্ষ্মী-সরস্বতীর বেনারসি আসে কলকাতা থেকে, আর মাথার ওপরের চাঁদোয়াটি আসে সুদূর বাংলাদেশ থেকে।
এই পুজোর সবচেয়ে রহস্যময় প্রথাটি হলো সপ্তমীর গভীর রাতের 'অর্ধরাত্রির পুজো'। শোনা যায়, প্রাচীনকালে দেবীকে সন্তুষ্ট করতে মাঝরাতে সত্যি সত্যিই নরবলি দেওয়া হতো। সময়ের সাথে সাথে সেই প্রথা আজ বন্ধ হলেও, রীতি মেনে আজও চালের গুঁড়ো বা পিটুলি দিয়ে একটি মানুষের মূর্তি তৈরি করে কুশ দিয়ে তাকে বলি দেওয়া হয়। এই গুপ্ত পুজো চলাকালীন ঠাকুরদালানে রাজপরিবারের সদস্য ছাড়া বাইরের কারও প্রবেশাধিকার থাকে না।
কালিকা পুরাণ মতে পুজো হওয়া এই রাজবাড়িতে মায়ের ভোগেও রয়েছে বিশেষত্ব। দেবীকে প্রতিদিন আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। ইলিশ, চিতল এবং মাছের মাথা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পদের পাশাপাশি বিজয়া দশমীর দিন মাকে পান্তা ভাত ও মাছের ভোগ দেওয়া হয়। দশমীতে বিসর্জনের রীতিটিও বেশ রাজকীয়। একসময় নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে মায়ের বিদায়বার্তা জানানো হতো। এখন তা বন্ধ হলেও, আজও মাকে রাজবাড়ির দিঘিতে নিয়ে গিয়ে বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ বা তোপধ্বনি দিয়ে রাজকীয় মর্যাদায় বিদায় জানানো হয়।
বঙ্গের প্রাচীণ দুর্গাপুজো স্পেশাল - ১