01/05/2026
এবছরের মে দিবসের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের করণীয় কাজ
মহঃ নওসাদ সিদ্দিকী
আজ পয়লা মে — আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেট স্কোয়ারে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান অনেকে। সেই রক্তাক্ত লড়াইয়ের স্মরণেই বিশ্বজুড়ে এই দিনটি পালিত হয়। মূল দাবিগুলো ছিল — ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য। সেই দাবি আজও সম্পূর্ণ পূরণ হয়নি, সেটি বলাই বাহুল্য।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের শ্রম কোড নিয়ে যে অসন্তোষ সেটা নিয়ে কিছু কথা জরুরি। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আদানি, আম্বানিদের কথায় উঠছে, বসছে। তারা যে আইন এনেছে সেখানে উল্লেখ নেই আট ঘন্টা কাজের কথা। মালিক পক্ষ তার ইচ্ছা মতো একজন শ্রমিককে কাজ করাতে পারবেন, আবার তাকে ছাঁটাই করে দিতে পারবেন, কোন রক্ষাকবচ নেই। তাই আজ ভারতে যে লড়াই চলছে, সেটি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার লড়াই।
সাম্প্রতিক দিল্লির লাগোয়া নয়ডার শ্রমিক বিক্ষোভ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমত, কেবল জিডিপি বৃদ্ধি করলেই হবে না। অথবা বড় বড় কলকারখানা স্থাপনই প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। শিল্পের বিকাশ তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার পেছনের কারিগররা, যাদের ঘামে এই অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে একটি সম্মানজনক ও সুরক্ষিত জীবন পাবেন। নয়ডায় হওয়া বিক্ষোভের প্রধান কারণগুলি হলো, বকেয়া বেতন না দেওয়া, কোন পূর্ব ঘোষণা বা আইনি ক্ষতিপূরণ ছাড়াই আকস্মিক ছাঁটাই, অমানবিক দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি প্রদান না করা। বিশেষ করে ঠিকা শ্রমিক বা চুক্তি ভিত্তিক কর্মীদের পরিস্থিতি সবচেয়ে শোচনীয়।
বহু কারখানায় শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, যেমন নিরাপদ কাজের পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। যখন বেঁচে থাকার ন্যূনতম দাবিগুলো বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে উপেক্ষিত হয়, তখন শ্রমিকরা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নামেন। অনেক সময় পুলিশি হস্তক্ষেপ বা মালিকপক্ষের চাপের মুখে এই বিক্ষোভগুলো সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়ে গেলেও, শোষণের মূল কারণগুলো অমীমাংসিতই থেকে যায়।
নয়ডার এই চিত্রটি সমগ্র ভারতের শ্রমজীবী মানুষের সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি প্রতিফলন। ভারতের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯০ শতাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের না আছে চাকরির স্থায়ী নিরাপত্তা, না আছে স্বাস্থ্যবীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পেনশনের মতো ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা। করোনা অতিমারির পর থেকে এই ক্ষেত্রে শ্রমিকদের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
এই সমস্যার সাথে যুক্ত হয়েছে 'গিগ ইকোনমি'র রমরমা। ডেলিভারি বয়, রাইড-শেয়ারিং অ্যাপের চালক বা অস্থায়ী কর্মী হিসেবে কর্মরত লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী কার্যত কর্মী হিসেবে আইনি স্বীকৃতিই পান না। এরা শ্রম আইনের আওতাধীন সুবিধাগুলি থেকে বঞ্চিত।
দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে না। ফলে তাদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার মান ক্রমশ নিম্নমুখী হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে যদি কথা বলি তাহলে বলব, এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি খুবই কম। পাশাপাশি কাজের সুযোগও সঙ্কুচিত। দলে, দলে মানুষ এই রাজ্য ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাচ্ছেন।
পয়লা জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে অদক্ষ (Unskilled) শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি জোন A-তে প্রায় ১০,৩৮৬ টাকা অর্থাৎ দৈনিক ৩৯৯ টাকা। এবং জোন B-তে কিছুটা কম। জোন A-তে দক্ষ শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ১২,৫৬৯ টাকা, দৈনিক ৪৮৩ টাকা। অন্যদিকে, কেরালায় সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি হল ৭০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা। কোথাও সেটি ১০০০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। দিল্লিতে দৈনিক মজুরি ৭৬০ টাকা থেকে ৭৯০ টাকা । দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, কর্ণাটকেও মজুরি অনেক বেশি। আমাদের রাজ্য থেকে শ্রমিকরা এই সব রাজ্যেই পাড়ি দিচ্ছেন বেশি। এই রাজ্যে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন জরুরি। আমরা এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছি, গ্রামীণ শ্রমিকদের মর্যাদা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে, ভারতের ন্যূনতম মজুরি আইন অনুযায়ী কৃষি শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরির কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে, যার জন্য নিয়মিত সংশোধন, প্রয়োগ ব্যবস্থা এবং আইন অমান্য করার জন্য শাস্তির বিধান থাকবে।
আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গে মাসিক ন্যুনতম ২৬ হাজার টাকার মজুরি, সংগঠিত ও অসংগঠিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা রক্ষা দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রের শ্রমিক বিরোধী শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে আন্দোলন তীব্রতর করতে হবে। মে দিবসে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
Indian Secular Front
Isf Kolkata