25/07/2026
ক্ষমতার দম্ভ বনাম গণআন্দোলনের জয়
ইতিহাসের ধূলিমলিন পাতাগুলো উল্টালে একটি চিরন্তন ও অবধারিত সত্য বারবার আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বন্দুকের নল, পুলিশের লাঠি কিংবা রাজদণ্ড যত শক্তিশালীই হোক না কেন, জনরোষের আগ্নেয়গিরির সামনে তা অবলুপ্ত হতে বাধ্য। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দালালি, অন্ধ পক্ষপাতিত্ব বা তোষামোদের চশমা খুলে দেখলে খুব সহজেই বোঝা যায়, ভারতের রাজনীতি ও সামাজিক কাঠামোর আসল রূপকার কোনো সাময়িক শাসকদল নয়; বরং এই দেশের পরম শক্তির উৎস হল এর আপামর জনগণ।
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রবল সামরিক ও প্রশাসনিক দাপটকে যারা রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও অহিংস আন্দোলনের যৌথ শক্তিতে পরাস্ত করে এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই সাধারণ মানুষের উত্তরাধিকার আজও এই স্বাধীন ভারতের মাটিতে সমানভাবেই সজীব। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শাসকের চেয়ার বদলায়, প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়; কিন্তু ক্ষমতার অহংকার যখনই জনকল্যাণকে পদদলিত করে নিজের দম্ভ প্রকাশ করতে যায়, তখনই নতুন গণআন্দোলনের জন্ম হয়।
সম্প্রতি নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ এবং তার পরিণতিতে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টির ঐতিহাসিক জয় আরও একবার ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে সশব্দে প্রমাণ করল, জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও প্রতিরোধের সামনে অবশেষে নতিস্বীকার করতেই হয় শাসককে।
দিল্লির রাজপথে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী নেমে এসেছিল, তাঁদের সবাইকে স্রেফ নিট পরীক্ষার্থী বা শিক্ষানুরাগী ভাবলে শাসকশ্রেণির চরম রাজনৈতিক অপরিণামদর্শিতারই পরিচয় পাওয়া যায়। সাধারণ চোখে এটি আপাতদৃষ্টিতে পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে একদল সংক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীর আন্দোলন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করলে স্পষ্ট হয়, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বা দুর্নীতি ছিল স্রেফ এক সলতে পাকানোর বাহানা বা তাৎক্ষণিক অনুঘটক। ক্ষোভের আসল বারুদ জমেছিল জনমানসে বহু আগেই।
আজকের শিক্ষিত যুবসমাজ কেবল একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ক্ষুব্ধ নয়; তারা দিশেহারা ও বিভ্রান্ত। একদিকে রয়েছে যোগ্যতার অনুপাতে কাজের সুযোগ না থাকার ফলে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, আর অন্যদিকে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া দামে পিষ্ট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ না পাওয়া, স্বনির্ভর হতে না পারা এবং সংসারের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত অপমানিত ও সংকুচিত হওয়ার যন্ত্রণা সাধারণ পরিবারগুলোকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
বছরের পর বছর ধরে তরুণ প্রজন্মের মনের ভেতর জমতে থাকা এই ক্ষোভ, হতাশা ও অবমূল্যায়ন যখন কোনো ইতিবাচক প্রশাসনিক দিশা পায় না, তখন একটি নির্দিষ্ট সামাজিক বা শিক্ষাগত ইস্যুকে কেন্দ্র করে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন তখন আর স্রেফ একটি নির্দিষ্ট অন্যায়ের প্রতিবাদ থাকে না; তা হয়ে ওঠে সরকারের প্রতি জমে থাকা সার্বিক অসন্তোষ, যন্ত্রণা ও ক্ষোভ প্রকাশের সর্বজনীন ও অপ্রতিরোধ্য মঞ্চ।
স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের রাজনৈতিক অলিন্দে শাসকের একটি নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক মানসিকতা প্রায় অপরিবর্তিত থেকে গেছে। সাধারণ মানুষ বা ছাত্রসমাজ রাজপথে আন্দোলনে নামলেই তাকে সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত, বিরোধী দলের সাজানো নাটক কিংবা দেশবিরোধী চক্রের কাজ বলে দাগিয়ে দেওয়ার এক অদ্ভুত ঝোঁক দেখা যায়।
চলমান আন্দোলনেও সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারী ছাত্রদের ‘সন্ত্রাসীদের বি-টিম’ বলে অভিহিত করে বিতর্ক ও উত্তাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে অরাজনৈতিক ছাত্রদের দাবিয়ে রাখতে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে থাকা পুলিশকে দিয়ে লাঠিচার্জ করানো এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ানো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি শাসনের দম্ভেরই প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ।
যেকোনো শাসক যখন ক্ষমতার শীর্ষস্তরে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করে, তখন তাঁদের বাস্তব সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে একদল সুবিধাবাদী চাটুকার ও তোষামোদকারী পারিষদ। ‘সব ঠিক আছে মহারাজ’, ‘অল ইজ ওয়েল’— চাটুকারদের এই অলীক সুর শুনতেই পছন্দ করেন ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিত্বরা। এর ফলে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত ভবনের আরামদায়ক কক্ষ থেকে রাজপথের জ্বলন্ত সত্য ও সাধারণ মানুষের চোখের জল ঢাকা পড়ে যায়।
এই বিচ্ছিন্ন মানসিকতার চরম রূপ দেখা যায়, যখন দেশনেতারা বা সুপ্রিম কোর্টের মতো সর্বোচ্চ বিচারপীঠের অসংবেদনশীল মন্তব্যে নিজেদের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া তরুণদের ‘আরশোলা’ বা ‘সমাজের পরজীবী’ বলে কটাক্ষ করা হয়। কিন্তু শাসকশ্রেণি ভুলে যায়, প্রদীপের নীচের তীব্র অন্ধকার দূর করতে সেই হেয় করা ‘আরশোলা’রাই যখন সংগঠিত হয়ে জোট বাঁধে, তখন তারা ইতিহাস বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
শুরুতেই অহংকার পাশে সরিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় না বসে দমনপীড়নের পথ বেছে নেওয়াটাই ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল। শেষ পর্যন্ত প্রবল গণচাপ, সোনম ওয়াংচুকের আমরণ অনশন এবং গণআন্দোলনের তীব্রতার মুখে নতিস্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা গ্রহণ করা এবং আন্দোলনকারীদের সমস্ত দাবি মেনে নেওয়ার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হল, অহংকারী শাসকের চেতনার চেয়ে অরাজনৈতিক জনতার সম্মিলিত প্রজ্ঞা বহু গুণ বেশি শক্তিশালী।
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, প্রশাসনিক নীতিনির্ধারণে পরিবর্তন আনা কিংবা অগণতান্ত্রিক সরকারকে নতিস্বীকার করানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে অরাজনৈতিক গণআন্দোলনের ভূমিকা অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যখনই জনস্বার্থমুখী আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তখনই ক্ষমতার শক্ত ভিত কেঁপে উঠেছে।
১৯৬৫ সালের তামিলনাড়ুর ভাষা আন্দোলনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। জোরপূর্বক হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় তৎকালীন সময়ে সমগ্র তামিল সমাজ একজোট হয়েছিল। ফলে ১৯৬৭ সালে অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ আইন সংশোধন করতে বাধ্য হয় কেন্দ্র, এবং শাসকদল চিরতরে সেখানে রাজনৈতিক জমি হারায়।
ঠিক একইভাবে, ১৯৭৪ সালে গুজরাত ও বিহারের ছাত্র সংগ্রাম মিলেমিশে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে যে সর্বাত্মক জেপি আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল, তা পরবর্তীকালে জরুরি অবস্থা পেরিয়ে ১৯৭৭ সালে তৎকালীন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের পতন ঘটিয়েছিল।
১৯৯০ সালে ওবিসিদের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণের সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যখন দেশজুড়ে মেধাভিত্তিক সাধারণ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা তীব্র আন্দোলনে নেমেছিল, তখন চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছিল।
২০১১ এবং ২০১২ সালে আন্না হাজারে ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং নির্ভয়া আন্দোলনের জেরে শুধু কেন্দ্রের সরকারই নয়, দিল্লিতে দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত সরকার পর্যন্ত ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল।
এই প্রতিটি ঘটনা একটি ঐতিহাসিক সত্যকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়— সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে শাসক যখন পুলিশি অত্যাচার বা ক্ষমতার ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে, তখন ক্ষুদ্র পরিসরের সাধারণ আন্দোলনও একসময় সমগ্র সরকারের অস্তিত্বের মূল সংকট তৈরি করতে পারে।
বিখ্যাত লেখক জেমস সুরোউইকি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ Wisdom of Crowds-এ অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনায় একক কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি, নীতিনির্ধারক বা শাসকের ধারণার চেয়ে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত বা অবস্থান অনেক বেশি নির্ভুল ও বস্তুনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
আমরা সাধারণত ধরে নিই যে, উচ্চশিক্ষিত মন্ত্রী, আমলা কিংবা নীতিনির্ধারকরাই দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে, যখন সাধারণ মানুষ কোনো একটি যৌথ সামাজিক ইস্যুতে একজোট হয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়, তখন তা সমাজের প্রকৃত আয়নাকে প্রতিফলিত করে।
ককরোচ জনতা পার্টির তরুণ আন্দোলনকারীরা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন তাঁদের অবহেলা করে ‘আরশোলা’ বলে কটাক্ষ করে, তখন সেই সাধারণ মানুষের ক্ষোভই দেশের ভগ্ন শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কারের দোরগোড়ায় নিয়ে আসতে পারে। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকারের লিখিত গ্যারান্টি প্রদান, বিতর্কিত পদাধিকারীদের অপসারণ, আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত আইনি মামলা ও এফআইআর প্রত্যাহার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য এবং আগামী দিনে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারে ছাত্রদের সরাসরি যুক্ত করার অঙ্গীকার আদায় প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি দল বা গোষ্ঠীর সাফল্য নয়; এটি ভারতীয় গণপ্রজাতন্ত্রের মূল ব্যবস্থার জয়।
আজকের এই জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে শাসকশ্রেণির জন্য এই আন্দোলন এক অত্যন্ত কড়া ঐতিহাসিক শিক্ষণীয় বার্তা। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো উপদলে বিভক্ত, বিরোধী জোট হয়তো ছত্রভঙ্গ এবং একজোট হতে ব্যর্থ; কিন্তু বিরোধীদের এই দুর্বলতার অর্থ এই নয় যে, শাসকের অপশাসন বা অসংবেদনশীলতা চিরকাল ঢাকাপড়া থেকে যাবে। যখন প্রথাগত বিরোধী দল মাঠে ব্যর্থ হয়, তখন সচেতন সাধারণ নাগরিক নিজেই দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে রাজপথে আবির্ভূত হয়।
গণআন্দোলনকে শুরুতেই শত্রু বা বিদেশি চক্রান্ত বলে না ভেবে, তার অন্তরালে থাকা মূল সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষোভের কারণ অনুসন্ধান করাই হল প্রকৃত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মুন্সিয়ানা।
পুলিশ দিয়ে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশকে সাময়িকভাবে আটকে রাখা যায়, সত্যি; কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের জ্বালা দূর করা যায় না। সাধারণ নাগরিককে কটাক্ষ, অপমান ও দম্ভ প্রদর্শন করে চিরকাল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। সুবিধাবাদী তোষামোদকারীদের মিষ্টি কথা বিশ্বাস না করে মাটির কাছাকাছি মানুষের স্পন্দন না বুঝলে ক্ষমতার মসনদ উল্টে যেতে খুব বেশি সময় লাগে না।
যে দেশের স্বাধীন সত্তার জন্ম হয়েছিল ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘ ঐতিহাসিক লড়াই ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে, যে দেশের প্রতিটি মানুষের ধমনীতে প্রতিবাদের রক্ত প্রবাহিত, সেই স্বাধীন দেশের জনগণকে তুচ্ছ ভাবার পরিণতি কখনোই ভালো হতে পারে না।
২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক আন্দোলন স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অন্যতম স্বকীয় প্রতিবাদের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে, যা শাসককে চিরকাল মনে করিয়ে দেবে যে, ক্ষমতার শীর্ষাসনের চেয়ে রাজপথের শক্তি এবং সাধারণ জনতার প্রজ্ঞার মূল্য সব সময়ই বহুগুণ বেশি।