01/05/2026
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে পুঁজিবাদ যখন বিকাশ লাভ করছে, শ্রমিকদের কারখানায় দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি দিতে হতো । তারা দাবি তোলে "আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, এবং আট ঘণ্টা নিজেদের জন্য।" এই দাবির ভিত্তিতে
১লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরে শুরু হয় এক সাধারণ ধর্মঘট, যেখানে লাখো শ্রমিক কাজ বন্ধ করে পথে নামেন। ৩রা মে ধর্মঘটী শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোর প্রতিবাদে ৪থা মে হে মার্কেট স্কোয়ারে এক বিশাল প্রতিবাদ সভার ডাক দেওয়া হয়। সেই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের প্ররোচনায় কে বা কারা হঠাৎ একটি বোমা ছোঁড়ে, আর সেই সুযোগ নিয়ে পুলিশ বাহিনী নিরীহ শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হে মার্কেটকে রক্তে ভাসিয়ে দেয়।
তারপরেও এই শ্রমিক আন্দোলনকে নেতৃত্বহীন করে ধ্বংস করতে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে অগাস্ট স্পাইজ, অ্যালবার্ট পার্সনস, অ্যাডলফ ফিশার এবং জর্জ এঙ্গেলকে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয়।
ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে কমরেড অগাস্ট স্পাইজ দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, "The time will come when our silence will be more powerful than the voices you strangle today"
এই শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরন করেই ১৮৮৯ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক (Second International) ১লা মে - কে 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে।
আজ প্রায় দেড় শতাব্দী সময় পর দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, ইতিহাস যেন আবার পেছনের দিকে হাঁটছে। শাসকশ্রেণি আজ সেই আট ঘণ্টা কাজের অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়ে শ্রমিকদের দাসত্বের শৃঙ্খলকে আরও শক্ত করতে কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে। আজ মে দিবসে যখন আমরা শ্রমিক শ্রেণির লড়াইয়ের ইতিহাস স্মরণ করছি, তখন আমাদের চোখের সামনে দেশের আপামর মেহনতি মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, আর অন্যদিকে উচ্চবিত্তদের সম্পদ রকেটের গতিতে বাড়ছে।
তারা কারখানায় পুড়ে মরুক বা খনিতে চাপা পড়ুক। তাতে এদেশের দালাল বুর্জোয়াশ্রেণির বা তাদের পাহারাদার সরকারের কিছু যায় আসে না! কিছুদিন আগেই কলকাতার আনন্দপুর নজিরাবাদে তৃণমূল সরকারের নাকের ডগায় ওয়াও মোমো কোম্পানির গুদামে আগুনে পুড়ে অন্তত ২৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বৈধ ফায়ার লাইসেন্স বা অগ্নিনির্বাপণ ছাড়পত্র ছাড়াই শুধুমাত্র লেবার দপ্তর ও পুলিশ-প্রশাসনকে ঘুষ দিয়ে এই মৃত্যুফাঁদ চলছিল। একইভাবে, তামিলনাড়ুর বিরুধুনগরে বাজি কারখানার ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন শ্রমিক, যাদের অধিকাংশই দলিত, নারী ও প্রান্তিক জনগণ।
এছাড়াও কেন্দ্রের ফ্যাসিবাদী শক্তি আরএসএস-বিজেপির পরিচালিত সরকার ১লা এপ্রিল, ২০২৫ থেকে যে চারটি ‘লেবার কোড’ লাগু করেছ। ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজের আইনি মান্যতা, যথেচ্ছ ছাঁটাইয়ের অধিকার, ধর্মঘটের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং ইউনিয়ন গড়ার পথ কঠিন করে দিয়ে মালিকদের হাতে শ্রমিকদের আধুনিক দাস হিসেবে তুলে দিতে তারা এই আইন এনেছে।
পাশাপাশি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে এবং শ্রমিকদের সস্তা পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত করতে আনা হয়েছে ‘VB-G-RAM-G’ বিল। এর মাধ্যমে ১০০ দিনের কাজ বা মনরেগা (MGNREGA)-কে কার্যত শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। বছরের যে সময় কাজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই সময় ৬০ দিনের জন্য কাজ বন্ধ রাখার আইনি ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। মনরেগার মতো একটি অধিকারভিত্তিক আইনকে কেন্দ্রীয় দয়ার দানে পরিণত করা হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী গ্রামের প্রান্তিক নারী শ্রমিকরা।
গ্রামীণ কর্মসংস্থান ধ্বংস, লেবার কোডের আক্রমণে সবচেয়ে বিপন্ন পরিযায়ী শ্রমিকরা। গ্রামের পর গ্রাম শুন্য করে, পেটের দায়ে, কাজের খোঁজে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন হাজার হাজার যুবক। এদের কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই, চিকিৎসা নেই।
ভিনরাজ্যে ঠিকা শ্রমিকের কাজে গিয়ে লকডাউনে মাইলের পর মাইল হাঁটা থেকে শুরু করে, ট্রেন দুর্ঘটনায় কাটা পড়া, কিংবা ওয়াও মোমোর মতো গুদামে পুড়ে ছাই হয়ে বাড়ি ফেরাই আজ দেশের আপামর মেহনতি মানুষের ভবিতব্য। তৃণমূল বা বিজেপি শাসক দলের রং যাই হোক না কেন, শ্রমিকদের রক্ত চুষেই এদের নির্বাচনী ফান্ডের পাহাড় তৈরি হয়।
আজ মে দিবসে দাঁড়িয়ে আমরা ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস ফ্রন্ট (DSF) এর পক্ষ থেকে জানাচ্ছি যে, ছাত্র ও যুব সমাজ শ্রমিক শ্রেণির এই লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আম্বানী আদানীর চাকর সংসদীয় দলগুলির খপ্পর থেকে বেরিয়ে এসে, নিজেদের শ্রেণি-স্বার্থে মেহনতী মানুষকে আজ বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে।
যাদের রক্ত-ঘামের বিনিময়ে সমাজ চলে, সেই মজুর-কৃষকরা যতদিন না নিজেদের সংগঠিত শক্তি চিনতে পারছেন, ততদিন এই শোষণ চলবে। মে দিবসে তাই আমরা শপথ নিই, দিকে দিকে ছাত্র - শ্রমিক- কৃষক ঐক্য গড়ে তুলে শোষনমুক্ত সমাজের লড়াইকে জোরদার করি!
কর্পোরেট-বান্ধব ৪টি লেবার কোড অবিলম্বে বাতিল করো!
দুনিয়ার মজদুর এক হও!
ইনকিলাব জিন্দাবাদ!