18/07/2021
পার্কের মৃদুমন্দ হাওয়া খেতে খেতে প্রেমিকার সাথে গল্প করছিলাম। হেমন্তের সুন্দর বিকেল, সপ্তাহান্তের ছুটির দিন, মনটা বড়ই মনোরম হয়েছিল।
আমাদের সম্পর্কের অনিশ্চিৎ ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনায় নিমজ্জিত দুজন প্রথমে খেয়াল করিনি বাচ্চা ছেলেটাকে। কাছেই দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে কি যেন একটা বলছিল। এমন আবেগঘন মুহূর্তে কেই বা অবান্তর 'ব্যাগড়া' পছন্দ করবে?
আবেগে ছেদ পড়লো, যখন বাচ্চাটা আমাদের আরো কাছে এগিয়ে এলো। এবারে ওর দিকে তাকাতেই হলো। বয়স বোধহয় আট কিংবা নয়, পরনে শুধু একটা ময়লা হাফ প্যান্ট, বোধহয় হাঁটুর কাছটা ছেঁড়াও ছিল। রোগা হাড় জিরজিরে চেহারা, ময়লা শরীর, নিয়মিত না খেতে পাওয়ার স্পষ্ট প্রমান সারা দেহে। শুধু চোখদুটো বাদে। সেটা আমাদের থেকেও বোধহয় উজ্জ্বল ছিল।শিশুকালের উজ্জ্বল চোঁখের কারণটা আমি বড় হয়ে ভুলে গেছি, তাই একটা নোংরা রাস্তার শিশুর চোঁখের ভাষাটা বুঝতে পারিনি।
আপনারা পারছেন কি??
স্বাভাবিক ভাবেই বাচ্চাটা আমাদের মনোযোগের সাথে বিরক্তি বিনামূল্যে পেলো। কিন্তু পরক্ষনেই বুঝলাম, ও একটা গোলাপ আমাদের বিক্রি করতে চায়। ওর হাতে সম্ভবত পাঁচ-ছটা গোলাপ ফুল ছিল। ফুল গুলো সকালের দিকে বেশি টাটকা ছিল তা বোঝা যায়। প্রতিটা গোলাপের ডাঁটি রুপোলি রাংতাই মোরা।
আমার সেই মুহূর্তের 'সহধর্মিনী' আমার হাত ছেড়ে বাচ্চাটাকে জিজ্ঞেস করলো -"কত করে"?
বাচ্চাটা বললো -"দশ টাকা করে"।
প্রেমিকা বাচ্চাদের ভালোবাসে। সে একটা কড়কড়ে নতুন একশো টাকার নোট বার করলো ওর ব্যাগ থেকে। আমি হা করে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেখতে থাকলাম। বাচ্চাটাকে হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বললো-"এটা রাখ"।
বাচ্চাটা বললো -"আমার কাছে খুচরো নেই"।
প্রেমিকা বললো -"তোকে বাকিটা ফেরত দিতে হবে না, আর ফুল গুলোও রাখ। তোকে টাকাটা এমনিই দিচ্ছি"।
নতুন সন্ধের নবাগত অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে প্রেমিকার হাতটা হালকা করে টিপে কানের কাছে ফিসফিস করে বললাম -"বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। ওতো টাকা দেওয়ার দরকার কি"?
প্রেমিকা আমায় পাল্টা ফিসফিসানিতে বললো -"ছাড়োনা, গরিব ছেলে। ওর ভালো লাগবে"।
আমি বললাম -"তুমি জানোনা, এগুলো ওদের চাল। বেছে বেছে আমাদের মতো অল্প বয়সীদের কাছে এসে হাত পাতে (এ কিন্তু হাত পাতেনি), যাতে আমরা সিমপ্যাথি দেখিয়ে কিছু টাকা ওদের দিয়ে দি"।
আমাদের এইসব কথোপকথন বাচ্চাটার সামনেই হচ্ছিল। ও শুনতেও পাচ্ছিল আমাদের কথা। কিন্তু ওর অস্তিত্বের সামনে ওরই অপমান করতে আমার একটুও বাঁধেছিলোনা। কারণ ওতো আমার কাছে তখনও ফেলনা। ও কিন্তু শুধু একবার আমার দিকে তাকাচ্ছিল আর একবার আমার প্রণয়ীর দিকে।
আমার প্রেমিকা আর সময় নষ্ট না করে বাচ্চাটার ডান হাতটা টেনে নিয়ে একশো টাকার নোটটা গুঁজে দিলো।
বাচ্চাটা হতভম্বের মতো খানিক্ষণ আমাদের কাছে দাঁড়িয়েছিল। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম ওর বুদ্ধি দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিভক্ত হয়ে যাওয়া চিন্তা গুলো কি কি, সেই মুহূর্তে মাথায় আসেনি। আপনারা বুঝতে পারলে আমায় অবশ্যই বলবেন। আমি যদিও পরে গালে হাত রেখে ভেবেছি। গালে হাত রেখে কেন ভেবেছি সেটা একদম গল্পের শেষে বলবো।
পাশে আমার প্রেমিকা আবার বললো -"টাকাটা তোকে দিলাম, ফুল গুলো আমাদের লাগবেনা"।
কয়েক সেকেন্ডের ভাবনা। তারপর হঠাৎ বাচ্চাটা আমাদের অবাক করে দিয়ে হাতের সবকটা গোলাপ ফুল আমাদের মাঝে রেখে দিয়ে একশো টাকার নোটটা নিয়ে এক ছুটে আমাদের চোঁখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেলো।
প্রায় মিনিট খানেক আমরা চুপ। শিশুটির ব্যাবহার আমার প্রেমিকাকে মুগ্ধ করেছিল। আর আমার গালে মেরেছিলো একটা অদৃশ্য থাপ্পড়।
ভিখারি কে?
পুনশ্চঃ, আমি গালে হাত দিয়ে কেন এই ঘটনাটা বার বার ভাবি, আশা করি বুঝতে পেরেছেন।
-ঈশান শ্রীমানী। ১৮.০৭.২০২১।