17/09/2025
⏳ আর মাত্র ১৬ দিনের প্রতীক্ষা!
✨ শতবর্ষের বিজয়া দশমী 2025 ✨
📅 ২ অক্টোবর, ২০২৫ (বৃহস্পতিবার)
🕖 সকাল ৭টা
বাংলায় সঙ্ঘ কার্য
নাগপুরের বিদর্ভ থেকে তরুণ ডাক্তারি ছাত্র কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার যখন ১৯১০ সালে কলকাতায় পড়তে এলেন, তখন তিনি শুধু চিকিৎসা শিখতে আসেননি, জাতীয়তাবাদের অগ্নিস্রোতও তাঁর অন্তরে প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল। অনুশীলন সমিতি, বিপ্লবী পুলীন বিহারী দাশ আর সেই সময়কার যুবক সমাজের মধ্যে তিনি খুঁজে পেলেন দেশমুক্তির তীব্র তৃষ্ণা। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে বন্যা-পীড়িত হাওড়ার গ্রামে গিয়ে তিনি সহপাঠীদের নিয়ে স্বামী অখণ্ডানন্দের রামকৃষ্ণ মিশনের তত্ত্বাবধানে ত্রাণ বিতরণ করতেন। এভাবেই সমাজসেবার সঙ্গে দেশসেবার বীজ তাঁর অন্তরে রোপিত হয়।
সঙ্ঘের প্রেরণা ও সূচনা
শ্রীগুরুজী যখন মুর্শিদাবাদের সারগাছি আশ্রমে স্বামী অখণ্ডানন্দের কাছে দীক্ষা নিলেন, তখন থেকে তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠল সমাজ ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ। নাগপুরে ফিরে তিনি ড. হেডগেওয়ারের সঙ্গে মিলে সংঘের কাজে নিজেকে নিযুক্ত করেন। তাঁদের প্রেরণার কেন্দ্র ছিল স্বামী বিবেকানন্দের বাণী—একত্ব, শৌর্য, ও ধর্মভিত্তিক জাতীয় জাগরণ।
১৯৩৯ সালে বর্ষপ্রতিপদে কলকাতায় সংঘের প্রথম শাখা শুরু হয়। এক কামরায় শুরু হওয়া সেই ছোট্ট ধান্দাটি পরে বিপ্লবীদের আখড়া থেকে রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটের তেলকল মাঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এখানেই ১৯৪০ সালে প্রথমবার ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সংঘের কার্যক্রমে যুক্ত হলেন ও পেলেন *‘গার্ড অফ অনার’।*
বাংলার সঙ্ঘকার্যের বিস্তার
নাগপুর শিবিরে বাংলার স্বয়ংসেবকেরা অংশ নিয়ে নতুন উৎসাহে ফিরতেন। কিন্তু ১৯৪০ সালের জুনে ড. হেডগেওয়ারের মহাপ্রয়াণে সংগঠনের কর্মীরা যেন এক মুহূর্তে অভিভাবকহীন হয়ে পড়লেন। তবে শ্রী বিট্ঠলরাও পাতকী ও বালাসাহেব দেওরস বাংলার বিভিন্ন জেলায়—হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, রংপুর, দার্জিলিং, ময়মনসিংহ—সংঘকার্যের বিস্তার ঘটালেন।
১৯৪৮ সালে গান্ধীজির হত্যার দায়ে যখন সংঘ নিষিদ্ধ হয়, তখন বাংলার বহু কর্মী কারাগারে বন্দি হলেন। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার, এই সময়ও কার্যক্রম থেমে যায়নি। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আবার আগের জায়গায় শাখা পুনরুজ্জীবিত হয়।
দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা ও দেশভাগের সময়
ভয়াবহ ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪৬-৪৭-এ দাঙ্গায় বঙ্গদেশ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে আসেন, যাদের পাশে দাঁড়ায় সংঘের স্বয়ংসেবকেরা। তখনকার দিনে বাংলায় প্রায় ৭৫-৮০টি শাখা সক্রিয় ছিল।
১৯৫০ সালে একনাথ রানাডের উদ্যোগে মহারাষ্ট্র থেকে ১০ জন প্রচারককে বাংলায় পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে কেশবরাও দীক্ষিত ছিলেন অন্যতম, যিনি দীর্ঘদিন বাংলার মাটিতে নিরলস কাজ করেছেন। ধীরে ধীরে কলকাতা শহরে শাখার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪৫। প্রচারক কালিদাস বসু প্রতিটি সপ্তাহে শিক্ষকদের নিয়মিত বৈঠক ডাকতেন।
শিক্ষণ শিবির ও সাংগঠনিক উত্থান
১৯৫০-এর দশক জুড়ে গয়া, পাটনা ও কলকাতার বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ শিবির অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে বাঁশদ্রোণীতে অনুষ্ঠিত শিবিরে চার প্রদেশের ৩২৫ জন স্বয়ংসেবক অংশ নেন। এখানে প্রথমবার বাংলার নিজস্ব নেতারা সামনে আসতে শুরু করেন।
১৯৬০-৭০-এর দশকে কলকাতা নগর জুড়ে বার্ষিক উৎসব, বিজয়া দশমী ও পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সে সময় বিশিষ্ট নাগরিকেরা যেমন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ড. রমেশ মজুমদার, স্বামী হিরন্ময়ানন্দ প্রমুখ সক্রিয়ভাবে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে শহিদ মিনারে গুরুদেবের উপস্থিতিতে ২০০০ যুবক ও ১৬০০ বালকের সমাবেশ সংঘের শক্তির নিদর্শন হয়ে ওঠে।
চ্যালেঞ্জের সময় ও দৃঢ় প্রত্যয়
জরুরি অবস্থার সময় (১৯৭৫) বাংলায় শাখার সংখ্যা কমে গেলেও, ১৯৮০-এর দশকে আবার নতুন জোয়ারে কাজ বাড়তে থাকে। গুরুতর প্রতিকূলতার পরও বাংলার ভূমি থেকে বহু নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বেরিয়ে এলেন। তৃতীয় সরসঙ্ঘচালক বালাসাহেব প্রায়ই বলতেন, *“বাংলা সবসময় দেশকে যোদ্ধা কার্যকর্তা দিয়ে এসেছে।”* তাঁর সেই উক্তি বাস্তবায়িত করে ১৯৮৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে ১০০ জন সন্ন্যাসী সম জীবন যাপন করা প্রচারক বাড়ি ছেড়ে সমাজের কাজে যোগদান করেন।
নবজাগরণ ও ব্যাপক বিস্তার
১৯৯১ সালের মধ্যে বাংলায় শাখার সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলে ১০০০। ১৯৯২ সালে কল্যাণীর শিবিরে প্রায় ১৮,০০০ স্বয়ংসেবক পূর্ণ গণবেশে উপস্থিত হন। ১৯৩৯ সালে রোপিত বীজ তখন বিশাল মহীরুহ বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
নাগরিক সমাজ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে নীলমণি দাস, জ্যোতিষ মৈত্র, স্বামী নির্মলানন্দ, প্রাক্তন মেয়র দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বহু বিশিষ্ট নাগরিক তখনকার সঙ্ঘকার্যে যুক্ত হন। শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, শিল্পোদ্যোগী—সবাই মিলিয়ে সংগঠনের শক্তিকে সমাজমুখী করে তোলেন।
অখিল ভারতীয় নানা সময়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব:
সংঘ শুধু সাংগঠনিক কার্যকলাপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বঙ্গভূমিতে সংঘ উত্থাপিত করেছে নানা জাতীয় প্রশ্ন।
১৯৫৯ সালে বেরুবাড়ি পাকিস্তানকে দেওয়ার চেষ্টার বিরোধিতা।
১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু গণহত্যার প্রতিবাদ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানো।
২০১২ সালে আসামে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তোলা।
২০২১ সালে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে বিশ্বময় আহ্বান।
১৯৩৯ সালে কলকাতার এক কামরায় শুরু হওয়া সঙ্ঘকার্য আজ বাংলার মাটিতে বিস্তৃত এক অখণ্ড শক্তি। দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ, রাজনৈতিক দমন—কোনো বাধাই এর অগ্রগামী যাত্রা থামাতে পারেনি। স্বামী বিবেকানন্দের বাণীতে উদ্বুদ্ধ, ডাক্তারজি হেডগেওয়ারের বীজ রোপণে জন্ম নেওয়া এই সংগঠন আজও একতার মন্ত্র ছড়িয়ে চলেছে বাংলার বিভিন্ন এলাকায়।