01/07/2026
⚽ হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তি: মেটিয়াবুরুজের মোহাম্মদ সেলিম – ভারতীয় ফুটবলের প্রথম বিদেশ যাত্রী
ফুটবলবিশ্বে আজও অনেকে বলেন, বাইচুং ভুটিয়া হলেন প্রথম ভারতীয় যিনি বিদেশি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। অথচ ইতিহাসের পাতায় প্রায় মুছে যাওয়া এক নাম, যিনি সত্যিকারের পথিকৃৎ—মেটিয়াবুরুজের এক যুবক, মোহাম্মদ সেলিম।
কলকাতার মেটিয়াবুরুজের সরু গলি থেকে সোজা স্কটল্যান্ডের ‘সেলটিক’ ক্লাব—একটা স্বপ্নের উড়ান। অনেকটা যেন মতি নন্দীর উপন্যাস ‘স্ট্রাইকার’-এর প্রসূন, যে স্বপ্ন দেখত কসমস ক্লাবে খেলার। তবে মোহাম্মদ সেলিমের কাহিনি কোনো কল্পনা নয়, এটা বাস্তব।
সেলিমের শৈশব কেটেছিল ১৯১১ সালে মোহনবাগানের সেই ঐতিহাসিক শিল্ড জয়ের স্মৃতিতে। খালি পায়েই ‘গোরাদের’ হারিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় ক্লাব। ছোট্ট সেলিমের চোখে তখন জ্বলে উঠেছিল দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন।
⚽ ফুটবলযাত্রা শুরু হয় বউবাজার ক্লাব দিয়ে। এরপর মোহামেডান বি-টিম থেকে স্পোর্টিং ইউনিয়ন, ইস্টবেঙ্গল, এরিয়ান্স ঘুরে ফেরেন মহামেডানে। তাঁর খেলা মানেই মুগ্ধতা—ছবির মতো পাস, মসৃণ ড্রিবল, খালি পায়ের জাদু। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮—টানা পাঁচবার কলকাতা লিগ জিতেছিল মহামেডান, যার পেছনে সেলিম ছিলেন এক অবিচ্ছেদ্য নাম।
📌 তখনই এক্সিবিশন ম্যাচে চীনা অলিম্পিক দলের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর সেলিম হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
হঠাৎ করেই খবর—সেলিম আর নেই! আসলে তিনি তখন কায়রো হয়ে পৌঁছে গেছেন ব্রিটেনে। সেখানে আত্মীয় হাশিমের সাহায্যে পৌঁছে যান স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত ক্লাব Celtic FC-তে।
কোচ উইলিয়াম ম্যালি প্রথমে খালি পায়ে খেলার প্রস্তাবে অবাক হলেও একবার খেলার সুযোগ দিলেন। সামনে প্রায় এক হাজার খেলোয়াড় আর তিনজন কোচের সামনে সেলিম জাদু দেখালেন খালি পায়ে!
সেই খেলা দেখে তাঁকে দুটো চ্যারিটি ম্যাচে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথম ম্যাচে পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে মাঠে নামেন। ব্যান্ডেজ বেঁধেছিলেন ট্রেনার জিমি ম্যাকিনিমি।
📣 স্টেডিয়াম হাততালিতে ফেটে পড়েছিল। স্কটল্যান্ড জয় করে নিয়েছিল ভারত থেকে যাওয়া সেই ‘খালি পায়ের যাদুকর’।
তবুও দেশের টান ছিল গভীর। জার্মানির অফারও ফিরিয়ে দিয়ে তিনি ফিরে আসেন কলকাতায়। সেলটিক ক্লাব তাঁর খেলা মনে রেখেছিল আজীবন। যখন তিনি মৃত্যুশয্যায়, মেজো ছেলে রশিদ ক্লাবকে খবর দিলে উত্তর আসে... সঙ্গে আসে ১০০ পাউন্ডের ব্যাংক ড্রাফট। চিঠির শব্দে ছিল ভালোবাসা—
"How is the magician doing?"
⚫ সেলিম ১৯৮০ সালে ৭৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন। ততদিনে তিনি শতাধিক খেলোয়াড় গড়ে তুলেছেন, কোচিং দিয়েছেন জীবনভর।
আর রেখে গেছেন এক প্রশ্ন—
> "বাংলার এই গর্ব, ভারতীয় ফুটবলের প্রথম আন্তর্জাতিক তারকা—কোন আজও পাঠ্যবইয়ে নেই?"