22/03/2026
আজ ২২ মার্চ, ভারতমাতার বীর সন্তান মাস্টারদা সূর্যসেনের জন্মতিথি।
আজকের এই পবিত্র দিনেই অখণ্ড ভারতের চট্টগ্রামের রাউজান থানাধীন নোয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন ভারতমায়ের এই মহান কৃতি সন্তান।
যিনি দেশের মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন নির্ভয়ে।
ব্রিটিশরা যখন অমানবিক নির্যাতনের পর তাঁকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝোলাচ্ছিল, তখনও হয়তো তাঁর বুকের পাঁজরে একটাই মন্ত্র বেজে উঠছিল— আমার ভারত স্বাধীন হবে, আমার দেশ মাতৃকা মুক্তি পাবে, বন্দেমাতরম।
কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, যে মানুষটা দেশের অখণ্ডতা আর স্বাধীনতার জন্য নিজের সর্বস্ব বিলীন করে দিলেন, তাঁর নিজের জন্মভূমি চট্টগ্রাম আজ এক অচেনা মৌলবাদী রাষ্ট্রের দখলে।
মাস্টারদা কি এই মৌলবাদী পাকিস্তান বা বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিলেন?
না, তিনি তা করেননি।
তিনি লড়াই করেছিলেন অখণ্ড ভারতবর্ষের জন্য, তাঁর আদি ও প্রকৃত মাতৃভূমির জন্য।
তাই সেই চট্টগ্রামকে ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা আজও অপূর্ণ।
যে চট্টগ্রামে দাঁড়িয়ে মাস্টারদার নেতৃত্বে মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি দিয়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, নির্মল সেন, অপূর্ব সেন, হরিগোপাল বলের মতো বিপ্লবীরা হাসতে হাসতে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই তপোভূমি তো ভারতেরই অভিন্ন অংশ।
চট্টগ্রামকে ছাড়া যেমন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম অসম্পন্ন, ঠিক তেমনি চট্টগ্রামকে ছাড়া ভারতের স্বাধীনতাও অপূর্ণ।
প্রতিবারই দেখি আজকের দিনে মাস্টারদাকে নিয়ে বহু মানুষ লেখালেখি করেন, শ্রদ্ধা জানান— যা জানানো অবশ্যই উচিত।
কিন্তু এতে কি মাস্টারদা সূর্যসেনের আত্মা একটুও শান্তি পায়?
না, পায় না।
কারণ যে মানুষটা সারা জীবন সংগ্রাম করলেন নিজের ভারত মাতাকে স্বাধীন করতে, আজ সেই ভারত মাতাই মৌলবাদীদের দ্বারা দ্বিখণ্ডিত।
তাঁর স্বপ্নের চট্টগ্রামে আজ উড়ছে মৌলবাদী রাষ্ট্রের পতাকা, অথচ সেখানে তো ভারতের তেরঙা ওড়ার কথা ছিল।
যতদিন না চট্টগ্রামে পুনরায় ভারতের পতাকা উড়ছে, ততদিন মাস্টারদার আত্মা শান্তি পাবে না, আর ভারতের স্বাধীনতাও পূর্ণতা পাবে না।
ভেবে দেখুন, মাস্টারদাকে যখন ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয়েছিল, তিনি বন্দেমাতরম বলতে বলতে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি হয়তো ভেবেছিলেন ভারতবর্ষের মাটিতেই তাঁর শেষ কৃত্য সম্পন্ন হবে।
কিন্তু নিষ্ঠুর ব্রিটিশরা সেটিও হতে দেয়নি; ফাঁসির পর তাঁর দেহ লোহার খাঁচায় ভরে বঙ্গোপসাগরের অতল জলে নিক্ষেপ করেছিল।
সাগরের জলে নিক্ষিপ্ত হয়ে মাস্টারদার আত্মা বোধ হয় ততটা কষ্ট পায়নি, যতটা কষ্ট পেয়েছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট চট্টগ্রামের বুকে পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখে।
তাই মাস্টারদাকে যদি সত্যি ভালোবেসে থাকেন এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হন, তবে আসুন আমাদের সঙ্গে, যোগ দিন ইন্দোপ্রাচ্য জাতীয়তাবাদী মঞ্চের সংগঠনে।
আজ মাস্টারদা সূর্যসেনের জন্মতিথিতে এই সংকল্প গ্রহণ করুন যে— আমরা মাস্টারদার জন্মভূমিকে পুনরায় ভারতের মূল ভূখণ্ডে ফিরিয়ে আনব।
চট্টগ্রামে আবারও ভারতের পতাকা উড়াবো এবং মা চট্টেশ্বরী ও ভগবান চন্দ্রনাথের পবিত্র মন্দিরকে পুনরায় মহান ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত করব।
সেটাই হবে মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আর এটা আমাদের করতেই হবে, কারণ ওই ভূমি তো আমাদের, ওই ভূমি তো অখণ্ড ভারতের।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মূল ভিত্তি ধর্ম হলেও চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে সেই নীতি মানা হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯৮ শতাংশের বেশি মানুষ অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার অনৈতিকভাবে তা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়।
চট্টগ্রাম শহরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল।
১৯৪১ সালের আদমশুমারি (Census) অনুযায়ী চট্টগ্রাম শহরের মোট জনসংখ্যা ছিল ৯১,৪১৫ জন।
যার পরিসংখ্যান ছিল নিম্নরূপ:
হিন্দু: ৪৩,২৬৩ জন (৪৭.৩৩%)
মুসলিম: ৪০,৫৬৫ জন (৪৪.৩৭%)
বৌদ্ধ: ৩,৬১৭ জন (৩.৯৫%)
খ্রিস্টান: ৩,৫১৯ জন (৩.৮৫%)
অন্যান্য অমুসলিম: ৪৫১ জন (০.৫০%)
এই পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার হয় যে, তৎকালীন চট্টগ্রাম শহরে অমুসলিমদের সংখ্যা ছিল ৫৫.৬% এবং মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ৪৪.৪%।
এ ছাড়াও চট্টগ্রামের মুসলিম সমাজের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ জাতীয়তাবাদী মুসলমান শেষ নির্বাচনে ভারতের পক্ষে কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছিলেন।
সেই হিসেবে চট্টগ্রাম শহরের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ ছিল ভারতপন্থী, যারা কোনোদিন দেশভাগ বা পাকিস্তান চায়নি।
অথচ ব্রিটিশ সরকার এই ভারতপন্থী বিপুল জনসংখ্যার ওপর বর্বর পাকিস্তান রাষ্ট্রকে চাপিয়ে দিয়েছে।
শুধু জনসংখ্যাই নয়, ব্রিটিশ সরকারের দেশভাগের অন্যতম শর্ত ছিল ধর্মীয় জনসংখ্যার পাশাপাশি সম্পদের মালিকানার ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণ করা।
ব্রিটিশ সরকার এই শর্তটিও ভঙ্গ করেছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রামের মোট আয়তন ২০,৯৬৪ বর্গকিলোমিটার; যার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন ১৩,১৮৯ বর্গকিলোমিটার।
এই বিশাল অঞ্চলের ৯৯ শতাংশের বেশি জমির মালিকানা ছিল হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের। এমনকি সমতলের ৭,৭৭৫ বর্গকিলোমিটারের মধ্যেও প্রায় ৭০ শতাংশ জমি ছিল অমুসলিমদের।
তাই সম্পদের মানদণ্ডেও সমগ্র চট্টগ্রাম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৫%।
কিন্তু গত কয়েক দশকে পরিকল্পিত উপায়ে এই জনসংখ্যায় পরিবর্তন করা হয়েছে।
ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে হাজার হাজার বৌদ্ধ ও আদিবাসী পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়, যাদের একটি বড় অংশ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
এরপর সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমতল থেকে লক্ষ লক্ষ 'সেটেলার' মুসলিমদের পার্বত্য অঞ্চলে পুনর্বাসিত করা হয়।
এই কৃত্রিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এবং আদিবাসীদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতনের কারণে আজ বৌদ্ধ জনসংখ্যা ৮৫% থেকে কমে ৪৪% এর নিচে এসে দাঁড়িয়েছে।
এটি কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মুছে ফেলার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।
আজ পাকিস্তান ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে সেখানে বহিরাগতদের ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
যে চট্টগ্রাম শহরে হিন্দুদের সম্পত্তি ছিল ৮৫ শতাংশ, আজ সেখানে তারা অস্তিত্ব সংকটে।
দেশভাগের এই কয়েক বছরে হিন্দু জনসংখ্যা চট্টগ্রাম শহরে ৪৭ শতাংশ থেকে নেমে ১০ শতাংশের নিচে চলে এসেছে।
ব্রিটিশ সরকারের সেই ঐতিহাসিক ভুলের মাশুল আজ আমাদের ভাইয়েরা দিচ্ছে।
তাই আজ সময় এসেছে সেই ভুল সংশোধনের।
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও প্রাক্তন মুসলিমসহ সকল ভারতপন্থী মানুষ—যারা ১৯৪৭ সালের পর থেকে নির্যাতিত হয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন কিংবা এখনো সেখানে কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন—তাদের আজ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে।
আমাদের এমন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যাতে চট্টগ্রামের বুকে পুনরায় ভারতের পতাকা উত্তোলন করা যায় এবং চট্টগ্রামকে পুনরায় ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
মাস্টারদা সূর্য সেন, স্নেহ কুমার চাকমা ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারদের জন্মস্থানকে পুনরায় ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
কারণ চট্টগ্রামের এই পবিত্র মাটি ভগবান চন্দ্রনাথ, মা চট্টেশ্বরী এবং ভগবান বুদ্ধের শান্তিবাণীর ভূমি।
এই ভূখণ্ডের প্রতিটি কণা আমাদের কাছে পবিত্র এবং তা ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
যারা এই পবিত্র ভূমিকে 'নাপাক' বলে পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল, তাদের জেনে রাখা উচিত—এই মাটি হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান, শিখ, পারসিক ও জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের।
যাদের আদর্শ আরবে, তাদের জন্য এই ভারতীয় উপমহাদেশ নয়।
এই পবিত্র ভূমিতে কোনো মৌলবাদ বা বহিরাগতদের স্থান নেই।
✍️ কঙ্কন মন্ডল।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
ইন্দোপ্রাচ্য জাতীয়তাবাদী মঞ্চ।