14/05/2026
২০২৪-এর নিট কেলেঙ্কারির জেরে এনটিএ (NTA) প্রধানের পদ থেকে সরানো হয়েছিল সুবোধ কুমার সিংকে। শাস্তির বদলে এখন তিনি ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব এবং বিদ্যুৎ পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত।
---
২০২৬ সালের মে মাস। ভারতের তপ্ত গ্রীষ্মের দুপুরের চেয়েও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের শিক্ষাঙ্গন। নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগে যখন লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর স্বপ্ন পুনরায় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, তখন দেশজুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। ২০২৪ সালের সেই দুঃসহ স্মৃতির পুনরাবৃত্তি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজও এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত। আর এই অন্ধকার অধ্যায়ের পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে একটি নাম—সুবোধ কুমার সিং। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র (NTA) প্রাক্তন এই প্রধানকে ঘিরে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক নতুন ও বিস্ময়কর মোড় নিয়েছে।
সুবোধ কুমার সিং ১৯৯৭ ব্যাচের ছত্তিশগড় ক্যাডারের একজন আইএএস (IAS) অফিসার। আইআইটি রুরকির মতো নামী প্রতিষ্ঠান থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ইগনু থেকে এমবিএ করা এই আধিকারিক একসময় প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। খনিজ সম্পদ নিলামে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে সাফল্যের জন্য তিনি জাতীয় স্তরের একাধিক পুরস্কারও ঝুলিতে পুরেছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালের জুন মাসে যখন তিনি এনটিএ-র ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই যেন দেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তৈরি হতে শুরু করে। তাঁর কার্যকালেই ভারতের কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষামূলক কেলেঙ্কারিগুলো দানা বাঁধে।
২০২৪ সালের নিট-ইউজি এবং ইউজিসি-নেট (UGC-NET) পরীক্ষার সময় যে কেলেঙ্কারি সামনে এসেছিল, তা ছিল অভাবনীয়। নিট পরীক্ষায় ১,৫০০-র বেশি ছাত্রছাত্রীকে বিতর্কিতভাবে 'গ্রেস মার্কস' দেওয়া, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নেট পরীক্ষা বাতিল করা এবং বিহার থেকে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত প্রশ্নপত্র পাচারকারী চক্রের জাল বিস্তার—সব মিলিয়ে এক চূড়ান্ত অরাজকতা তৈরি হয়েছিল। সুবোধ কুমার সিংয়ের নেতৃত্বাধীন এনটিএ তখন কেবল অস্বীকারের রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিল। অবশেষে সেই বছরের জুন মাসে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে এটি একটি 'প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা'। চাপের মুখে ২২ জুন ২০২৪-এ সুবোধ কুমার সিংকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে 'কম্পালসরি ওয়েট'-এ পাঠানো হয়। কিন্তু এই অপসারণটি কি আদৌ কোনো শাস্তি ছিল, নাকি কেবল লোক দেখানো আইওয়াশ—তা নিয়ে আজ বড় প্রশ্ন উঠেছে।
সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপরাধে হয়তো কঠোর বিভাগীয় তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আমলাতন্ত্রের জটিল সমীকরণ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটল। তদন্ত চলাকালীনই ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে তাঁকে কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ছাত্র ও অভিভাবক মহলে এটি "শাস্তির বদলে পুরস্কার" হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই পুরস্কারের বহর আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালের শেষে সুবোধ কুমার সিং কেন্দ্রীয় ডেপুটেশন ছেড়ে তাঁর পুরনো ক্যাডার ছত্তিশগড়ে ফিরে যান। সেখানে নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর তাঁকে সরাসরি 'মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব' (Principal Secretary to CM) পদে বসানো হয়। প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে এই পদটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন।
২০২৬ সালের মে মাসের সাম্প্রতিকতম তথ্য অনুযায়ী, সুবোধ কুমার সিং বর্তমানে কেবল একটি পদেই সীমাবদ্ধ নন। গত ৬ মে একটি সরকারি নির্দেশে তাঁকে ছত্তিশগড় রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থার (Chhattisgarh State Power Companies) চেয়ারম্যান এবং জ্বালানি বিভাগের প্রধান সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যে আধিকারিকের বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরের পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ ছিল, আজ তিনি একটি গোটা রাজ্যের কয়েক হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বাজেট এবং নীতি নির্ধারণের সর্বেসর্বা। যেখানে ২০২৬ সালেও নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে দেশ উত্তাল, সেখানে অভিযুক্ত প্রাক্তন প্রধানের এমন লাগামহীন উন্নতি দেশের বিচারব্যবস্থা ও আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহির গালে চপেটাঘাতের সমান।
সিবিআই (CBI) ২০২৪ সাল থেকেই নিট কেলেঙ্কারির তদন্ত করছে। তদন্তে একাধিক গ্রেফতারি হলেও মূল প্রশাসনিক স্তরে কার গাফিলতি ছিল, তা আজও অস্পষ্ট। এই তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগেই সুবোধ কুমার সিংয়ের মতো আধিকারিকরা একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে নিচ্ছেন। ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এ কথা বলাই বাহুল্য যে, কেবল প্রধান মুখগুলো বদলে দিলে ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। যতক্ষণ না বড় বড় আমলাদের ব্যক্তিগত জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভারতের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পরিশ্রম এভাবেই অর্থলিপ্সু চক্রের কাছে বন্দি থাকবে। পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে ভারতে অন্তত ১৫টি বড় সরকারি পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ কোটি পরীক্ষার্থী।
সুবোধ কুমার সিংয়ের ক্যারিয়ারগ্রাফ দেখলে মনে হয়, আমলাতান্ত্রিক সুরক্ষাকবচ এতটাই শক্তিশালী যে সেখানে জনরোষ বা নৈতিক দায়বদ্ধতার কোনো স্থান নেই। ২০২৬-এর নিট কেলেঙ্কারি আমাদের পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা এই পচন রোধ করতে হলে দুর্নীতির চেয়েও বড় প্রয়োজন কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যে আধিকারিকের সময়ে 'প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা' ঘটেছিল, তিনি আজ ক্ষমতার শিখরে বসে রাজ্যের বিদ্যুৎ ও প্রশাসনের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। সুবোধ কুমার সিংয়ের এই অধ্যায়টি কেবল একজনের পদচ্যুতির গল্প নয়, এটি একটি গোটা ঘুণে ধরা শিক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতীক, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে আমলাতান্ত্রিক চতুরতা অনেক বেশি জয়ী হয়।
২০২৬ সালের এই নতুন পরীক্ষা বাতিলের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সুবোধ কুমার সিংয়ের পদোন্নতি একটি অশুভ সংকেত বহন করছে। এটি প্রমাণ করে যে, লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর চোখের জল এবং অভিভাবকদের স্বপ্নভঙ্গের চেয়েও ক্ষমতার অলিন্দে থাকা যোগাযোগ অনেক বেশি শক্তিশালী। সুবোধ কুমার সিং আজ হয়তো নতুন উচ্চতায় আসীন, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তিনি চিরকাল সেই সময়ের প্রতিনিধি হয়েই থাকবেন, যখন ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থা তার বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণ হারিয়েছিল।
🚨 এর পরেও আপনি ভাবেন নাকি যে যারা করেছে তারা শাস্তি পাবে ?