02/01/2026
তখন মুসলিম বিশ্বের খলিফা, আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.)। যার শাসনাধীন ছিল আরব থেকে অনারব বিশাল এক সাম্রাজ্য।
একদিন তিনি কুফার বাজারে হাঁটছিলেন। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল, একজন সাধারণ ইহুদি নাগরিক একটি বর্ম (যুদ্ধের পোশাক) বিক্রি করার চেষ্টা করছে। হযরত আলী (রা.) বর্মটি দেখেই চিনতে পারলেন। এটি তাঁর নিজের বর্ম, যা কিছুদিন আগে সিফফিনের যুদ্ধের সময় হারিয়ে গিয়েছিল।
তিনি লোকটির কাছে গিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন, “ভাই, এই বর্মটি আমার। আমি এটি বিক্রিও করিনি এবং কাউকে উপহার হিসেবেও দিইনি। এটি আমার হাত থেকে পড়ে হারিয়ে গিয়েছিল।”
লোকটি বর্মটি আঁকড়ে ধরে বলল, “না! এটি আমার বর্ম এবং এটি আমার দখলেই আছে।”
চিন্তা করুন, যিনি অর্ধ-পৃথিবীর শাসক, তিনি চাইলেই এক ইশারা করতে পারতেন, আর বর্মটি তাঁর হাতে চলে আসত। কিন্তু তিনি ছিলেন ‘শেরে খোদা’ (আল্লাহর সিংহ), যিনি গায়ের জোরের চেয়ে আল্লাহর আইনকে বেশি ভয় করতেন।
হযরত আলী (রা.) বললেন, “বেশ, চলো আমরা কাজীর (বিচারক) কাছে যাই। তিনিই ফয়সালা করবেন।”
আদালতের দৃশ্য
বিচারক ছিলেন কাজী শুরাইহ। তিনি যখন দেখলেন খলিফা নিজেই আদালতে প্রবেশ করছেন, তিনি সম্ভ্রমের সাথে দাঁড়িয়ে গেলেন। কিন্তু হযরত আলী (রা.) তাঁকে ইশারা করে বললেন, “আল্লাহর আইনের সামনে শাসক ও প্রজা সমান। তুমি আমাকে বিশেষ কোনো সম্মান দেখাবে না।”
বিচারক শুরাইহ দুজনকে পাশাপাশি দাঁড় করালেন। তিনি খলিফাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার দাবি কী?”
হযরত আলী (রা.) বললেন, “এই বর্মটি আমার। এটি চুরিও হয়নি, আমি বিক্রিও করিনি।”
বিচারক তখন ইহুদি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কী বলার আছে?”
লোকটি বলল, “বর্মটি আমার কাছে আছে, তাই এটি আমার।”
কাজী শুরাইহ এবার খলিফার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার দাবির পক্ষে কি কোনো সাক্ষী আছে?”
হযরত আলী (রা.) বললেন, “হ্যাঁ, আমার ভৃত্য কাম্বার এবং আমার ছেলে হাসান সাক্ষী।”
কাজী শুরাইহ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার ভৃত্যের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ইসলামি আইন অনুযায়ী, বাবার পক্ষে ছেলের সাক্ষ্য আমি গ্রহণ করতে পারছি না।”
হযরত আলী (রা.) মুচকি হাসলেন। তিনি জানতেন এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। প্রমাণের অভাবে বিচারক রায় দিলেন—বর্মটি সেই ইহুদি ব্যক্তিরই।
হৃদয় পরিবর্তনের মুহূর্ত
রাষ্ট্রের প্রধান হয়েও হযরত আলী (রা.) মাথা পেতে সেই রায় মেনে নিলেন। তিনি কোনো রাগ বা ক্ষমতা প্রদর্শন করলেন না। রায় মেনে নিয়ে তিনি আদালত থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন।
এই দৃশ্য দেখে সেই ইহুদি লোকটি আর স্থির থাকতে পারল না। সে অবাক হয়ে ভাবল, “এ কেমন ধর্ম? এ কেমন বিচার? খলিফা নিজেই নিজের নিয়োগ করা বিচারকের সামনে হেরে গেলেন এবং তা মেনে নিলেন!”
লোকটি দৌড়ে এসে হযরত আলী (রা.)-এর সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল:
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এটিই নবীদের চরিত্র! আমীরুল মুমিনীন আমাকে আদালতে এনেছেন, আর তাঁরই বিচারক তাঁর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন! হে আলী, এই বর্মটি আপনারই। আমি সেদিন আপনার উটের পিঠ থেকে এটি পড়ে যেতে দেখে তুলে নিয়েছিলাম।”
অতঃপর লোকটি আবেগে কেঁদে ফেলল এবং ঘোষণা দিল:
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” (আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসূল)।
হযরত আলী (রা.) তাঁর ইসলাম গ্রহণে এত খুশি হলেন যে, তিনি সেই বর্মটি তাঁকে উপহার হিসেবে দিয়ে দিলেন এবং সাথে একটি ঘোড়াও দান করলেন। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, এই লোকটি পরবর্তীতে হযরত আলীর (রা.) পক্ষে খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন।