11/05/2026
বাংলার মাটিতে ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সিধু মুর্মু, কানু মুর্মু এবং নীল বিদ্রোহের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের ঘটনাগুলো শুধু ভাঙচুর নয়, এটা বাংলার কৃষক, আদিবাসী এবং প্রতিরোধের ইতিহাসের উপর সরাসরি আঘাত।
সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মু শুধুমাত্র দুইজন ব্যক্তি নন। তাঁরা ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল হুল বিদ্রোহের প্রতীক। ব্রিটিশ শাসন, জমিদার, মহাজন আর শোষণের বিরুদ্ধে হাজার হাজার সাঁওতাল মানুষকে সংগঠিত করেছিলেন তাঁরা। ইতিহাস বলছে, এই বিদ্রোহ ছিল ভারতের প্রথম বৃহৎ গণঅভ্যুত্থানগুলোর একটি, যা পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের আগেই ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আজ সেই মানুষদের মূর্তি ভেঙে দেওয়া মানে শুধুমাত্র পাথর ভাঙা নয়, আদিবাসী আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামের ইতিহাসকে অপমান করা।
একইভাবে নীল বিদ্রোহ বাংলার কৃষকদের রক্ত, কান্না আর প্রতিরোধের ইতিহাস। ১৮৫৯-৬০ সালে বাংলার কৃষকরা জোর করে নীল চাষ চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। ইউরোপীয় নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, এমনকি বহু বুদ্ধিজীবীও এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। দীনবন্ধু মিত্রের “নীলদর্পণ” থেকে শুরু করে সংবাদপত্রের প্রতিবাদ, সবকিছুই এই বিদ্রোহকে ইতিহাসে বিশেষ জায়গা দিয়েছে। আজ যদি সেই বিদ্রোহের স্মৃতিচিহ্নও ধ্বংস করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, কারা ইতিহাস মুছে ফেলতে চাইছে এবং কেন?
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এই ধরনের ঘটনায় প্রায়শই প্রশাসনিক নীরবতা দেখা যায়। দ্রুত তদন্ত, দোষীদের গ্রেপ্তার, পুনর্নির্মাণের আশ্বাস, এসব অনেক সময় দেখা যায় না। অথচ একটি মূর্তি শুধুমাত্র একটি শিল্পকর্ম নয়। এটি একটি সমাজের স্মৃতি, একটি সম্প্রদায়ের আত্মপরিচয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাস শেখানোর মাধ্যম।
বাংলায় আজ রাজনৈতিক স্মৃতির লড়াই চলছে। যাঁদের ইতিহাসে জায়গা পাওয়া উচিত, তাঁদের মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। কারণ ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মানুষের চিন্তাকেও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। তাই সিধু-কানুর মূর্তি ভাঙা হোক বা নীল বিদ্রোহের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো সেই মানসিকতার প্রকাশ, যারা চায় মানুষ নিজের শেকড় ভুলে যাক।
প্রজাশক্তি পার্টি এই ধরনের ভাঙচুর, উন্মাদনা বা তথাকথিত “উৎসবের” নামে ইতিহাস ও সমাজের প্রতীকগুলোর উপর হামলাকে তীব্র ভাষায় ধিক্কার জানাচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিজয় মিছিল বা জনতার আবেগ কখনও ইতিহাস ধ্বংসের লাইসেন্স হতে পারে না। আমরা অবিলম্বে দোষীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে সিধু মুর্মু, কানু মুর্মু এবং নীল বিদ্রোহের সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত মূর্তি ও স্মৃতিচিহ্নকে পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে পুনর্নির্মাণ ও পুনঃস্থাপনের দাবিও জানাচ্ছি।
কারণ ইতিহাসের সত্যি হলো, মূর্তি ভাঙা যায়, স্মৃতি নয়। সিধু মুর্মু, কানু মুর্মু এবং নীল বিদ্রোহ বাংলার মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাঁদের সংগ্রাম বইয়ের পাতায়, মানুষের মনে, লোকগাথায় এবং ইতিহাসে বেঁচে থাকবে। আর তাই এই ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক কর্তব্যও।