11/02/2026
কাটোয়া লোকাল 🚉🚉
এটি শুধু একটি ট্রেনই নয়, এটি হলো হাজারো মানুষের সুখ, দুঃখ ও জীবিকার সঙ্গী।
আজ আপনাদের সঙ্গে তুলে ধরবো এক হকার দাদার কিছু কথা।
গত রবিবার ১১:২০ তে বালি থেকে ব্যান্ডেল লোকালে চেপেছি।
ব্যান্ডেলে টাইম ১২:১৭,এদিকে আমি ব্যান্ডেল থেকে কাটোয়া লোকাল ধরবো,টাইম ১২:১৫। ট্রেন লেট করলে কাটোয়া লোকাল পাবো এই টেনশনের মাঝেই ব্যান্ডেল ঢুকে দেখি স্টেশন ফাঁকা 🥲🥲। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ১২:১৫ ট্রেন ক্যানসেল।
কি আর করা যাবে ১ঘন্টা বসতে হবে।
লাস্ট কাটোয়া লোকাল গেছে ১১টার দিকে, তাই স্টেশনে আগে থেকেই ভীড় ছিল এরপর দেখতে দেখতে এই ১ঘন্টায় স্টেশনে আরও ভীড় হয়ে গেলো।
এদিক ওদিক ঘুরে ১ ঘন্টা কেটে গেল,১২:১০ এর কাটোয়া লোকাল হাওড়া ছেড়ে ১:১৫ র দিকে ব্যান্ডেল ঢুকলো, গুতোগুতি করে উঠে পড়লাম ট্রেনে। রোববার হলেও ট্রেনে প্রচুর ভীড়. দুটো ব্যান্ডেল লোকাল, নৈহাটী, বর্ধমান আবার হাওড়া থেকে এই ট্রেনে আসা লোক সব এক ট্রেনে বাকিটা বুঝতেই পারছেন।
যাইহোক ধীরে ধীরে চ্যানেলে গিয়ে দাঁড়ালাম ট্রেন ততক্ষনে জিরাট ছেড়েছে।
এতো কিছুর মাঝেও যেন কিছু একটা কমতি ছিল। কি তবে সেটা থাউর করতে পারছিলাম না।
ট্রেন ঢুকলো কালনা, হালকা খিদেও পেয়েছে, বাদাম কিনলাম,বাদাম খেতে খেতে বুঝলাম, এটাই ছিল আজকের এই ট্রেনে আমার দেখা প্রথম হকার। আগেও উঠতে পারে তবে আমি হয়তো খেয়াল করিনি, তবে গেট থেকেই হয়তো তারা ঘুরে যাচ্ছিলো, কারণ ভেতরে ঢোকার অপশন ছিল না।
এই হকার দেরই আমি এতোক্ষণ মিস করছিলাম, এতো ভিড়ের মধ্যে তাঁদেরই শুন্যতা ছিল ট্রেনে।
ট্রেন এলো নবদ্বীপে, এবার সিটে বসা যাবে। আহঃ আমার পা টা যেন হাপ ছেড়ে বাঁচলো 🥹।
যাইহোক এবার আসি আসল গল্পএ
নবদ্বীপ থেকে এক হকার দাদা কমলা/মোসুম্বি নিয়ে উঠেছে।
অর্ধেক ঝুড়ি লেবু ছিল, কিন্তু দেখলাম বিষ্ণুপ্রিয়া এলেও তিনি ওই ক্যামরাতেই ঘুরতে লাগলেন। তারপর লেবুর ঝুড়ি গেটের সামনে রেখে আমার সামনেই বসলেন। আর একজন হকার ওনাকে বললো কিরে আর যাবি না? উনি বললেন না, এবার নেমে পড়বো, যা বেচা কেনা হয়ে গেছে, আজ আর হবে না।
এবার আমিই তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আজতো হকার ই দেখলাম না ট্রেনে রবিবার বলে কি সব ছুটিতে।
উনি বিরক্ত হয়েই বললেন(আমার ওপর নয়, ট্রেনের উপর)
আর বলো না ট্রেন ব্লক তাই কেউ বেরোয়নি।
এতো ভীড় ট্রেন আমি ঝুড়ি নিয়ে যাবো না মানুষ দাঁড়াবে, না মানুষ কিছু কিনে খাবে?
ট্রেনে যত ভীড় আমাদের ততো কম বেচাকেনা।
ট্রেনে হালকা লোক থাকলেই বেচা কেনা বেশি হয়।
উনি এবার নিজে থেকেই আমাকে বলতে লাগলেন। ১ দেড় ঘন্টা পর পর ট্রেন মানুষ জন বেড়েছে, হকার বেড়ছে ট্রেন বাড়েনি। প্রত্যেক ট্রেনেই ভীড়। লোকে দাঁড়িয়ে থাকে একে ওকে ধাক্কা দিয়ে গালি শুনে ঝুড়ি নিয়ে এগিয়ে যায়, কি করবো পেট তো চালাতে হবে।
তার ওপর রোজ দিনই ব্লক। যে দিন একটা ট্রেনে ও ব্লক থাকে গোটা দিনের ব্যবসায় খাড়াপ হয়ে যায়। একটা ট্রেনে বিক্রি করতে না পারলে পরের ট্রেন বিক্রি করতে গেলে এর মাঝে ১/২ ঘন্টা চলে যায়। গোটা দিনই মাটি। তাই ব্লক থাকলে অনেকে মাল নিয়ে বেরোই না। তাই আজকেও অনেকে বেরোয়নি। আর বেরিয়েই বা কি করতো দেখতেই তো পাচ্ছ দাঁড়ানো জায়গা ছিল না, মাল নিয়ে কোথায় নামাবো। সেই সকালে বেড়িয়েছি এক ঝুড়ি এখনও হাফ রয়েই গেছে। কতই বা লাভ হয়। দিন হিসেবে দেখতে গেলে এতক্ষন পর্যন্ত বেকার টাইম নষ্ট করলাম।
এবার আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম একটা ট্রেনে তাও কতজন হকার থাকে? তার কথা শুনে আমি চমকে গেলাম 😲
একটা ট্রেনে ই নাকি কমবেশি ১০০ জন। ১২ কামরার ট্রেনে গড়ে ৮ জন হকার 🙄 তা হয়ে যাবে।
এর জন্যই তো কাটোয়া লোকালের একটা আলাদা নাম
খায় খায় লোকাল, চলন্ত রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি।।
এরপর উনি বললেন এই লাইনে প্রায় হাজারেরও বেশি লোকে নাকি কাজ করে।
মানে এই কাটোয়া লোকালই হলো আলাদা একটা কর্মসংস্থানের জায়গা।
ঝালমুড়ি থেকে মিষ্টি সবই পাওয়া যায় কাটোয়া লোকালে।
উনি বললেন অল্প ট্রেন,একই ট্রেনে অনেক হকার কম্পিটিশন বেশি,তারপর আবার ভীড়, আর ব্লক 🥲 দিন দিন বেচাকেনা বারার বদলে কমছে।
আগে এক ট্রেনেই মাল সব শেষ হয়ে যেত, এখন এই দেখো কি অবস্থা অর্ধেক পরেই আছে।
উনি উঠে পড়লেন পূর্বস্থলী নামবেন মনে হয়।
গেটের কাছে দাঁড়িয়েই বললেন ট্রেন আর কটা বাড়লে মানুষও শান্তিতে যাবে, আমরাও ঠিক মত বেচাকেনা করতে পারবো, আরও নতুন ছেলেও কাজের জন্য এ লাইনে আসবে।
সত্যি বলতে কি এ লাইনের লোক খায় খুব, বেচাকেনা ভালোই হয়। বাইরে গিয়ে মুনিষ খাটার চেয়ে বাড়িতে নিজের রাজ্যে থেকে ২০০/৩০০ টাকা ইনকাম করেও শান্তি 🥹 রাতে অন্তত বউ বাচ্চার মুখ্ তো দেখতে পারি।
কিন্তু এভাবে চললে জানিনা কদিন এই লাইনে থাকবো, শেষে বাইরেই যেতে হবে।।
উনি নেমে পড়লেন, কিছু কথা বলে গেলেন অত্যান্ত বাস্তব কথা।
এই কাটোয়া লোকাল শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই, নয় অনেকের কর্মসংস্থানের অবলম্বন।
ট্রেন বাড়ুক এই লাইনে যাত্রীদের সাথে সাথে এই খেটে খাওয়া মানুষ গুলো মুখে হাসি ফুটুক।
আমাদের সবার ভোগান্তি নয়, গর্বের কারণ হোক
কাটোয়া লোকাল🚉🚉