11/08/2021
*" ১১ ই আগস্ট ১৯০৮ সালে যখন রাত্রি শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটছে, তখন হল ক্ষুদিরামের ফাঁসি...*
*আমি কাঁদতে পারিনি। দেশের লোক হায় হায় করে উঠলো। দেশের লোকে গান বাঁধল আমার ক্ষুদিরামকে নিয়ে। বছরের পর বছর গেছে, একের পর এক ক্ষুদিরামের নাম নিয়ে এগিয়ে গেছে দেশের ছেলেরা— যে যেমন বুঝেছে তেমনি করে এগিয়ে গেছে। যে দারোগা নন্দ ব্যানার্জী ক্ষুদিরামকে গ্রেপ্তার করেছিল— ৯ নভেম্বর পিস্তলের গুলি খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করল সে। কলকাতা, বাংলা, সারা ভারতে শুরু হলো বোমা পিস্তলের যুগ... মাত্র অল্প কয়েকটা বছর। মেলব্যাগ লুটের পর যখন প্রথম টের পেলাম ঝাঁকড়া চুল, পায়ে লোহার বেড়ি পরা সেই মা মরা ছেলে চিরকালের জন্য ক্রমশ আমার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে— তখন থেকে অস্পষ্ট ভয়ে লক্ষ্য করে চলেছি তার গতিবিধি। খোঁজ করেছি রাজ্যের উৎকণ্ঠা নিয়ে। যখনই যতটুকু জেনেছি, যক্ষের ধনের মত তা আগলে রেখেছি বুকের মধ্যে, পুলিশের চোখ এড়িয়ে।*
*... ক্ষুদিরাম বলেছিল আগুনেই তার বুকের আগুন নিভবে। হয় ইংরেজের চিতার আগুনে, নয় তার নিজের চিতার আগুনে। ইংরেজের চিতার আগুন দেখে যায়নি ক্ষুদিরাম, নিজের চিতায় রচনা করেছিল সে। কিন্তু আজ তো দেখছি, সেই আগুনই ধিকি ধিকি করে ইংরেজকে পুড়িয়ে মারছে...*
*তিনমুঠো খুদ দিয়ে ক্ষুদিরামকে কিনেছিলাম আমি— মনে মনে লোভ ছিল ক্ষুদিরামকে একা ভোগদখল করব। কিন্তু কখন যে আমার অগোচরে সে দেশের লোকের কাছে বিকিয়ে গেছে, জানতেও পারিনি। তিনমুঠো খুদ দিয়ে আমি কিনেছিলাম। দেশের ছেলেরা তাকে কিনলো আঁজলা আঁজলা রক্ত দিয়ে।"*
*— অপরূপা দেবী*(ক্ষুদিরামের বড়দি)
*"উৎসাহ না পেয়েও যারা দেশের কাজ করে তারাই তো যথার্থ দেশপ্রেমিক।"*
*— ক্ষুদিরাম বোস*
*" সত্যিই আমি পাগল হয়ে যাই এই দেখে— যে দেশের রাস্তার দু'পাশে কঙ্কালসার কাঙালীর দল শীতের হাওয়ায় গরম কাপড়ের অভাবে থর থর করে কাঁপছে —সেই দুর্ভাগা দেশে তাদের সামনে দিয়ে বড়লোকের ছেলেরা বুক ফুলিয়ে শাল গায়ে দিয়ে সিগারেট টানতে টানতে পথে চলেছে।"*
*— ক্ষুদিরাম বোস*
*"আমি আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু বলতে চাই না এবং শাস্তি এড়ানোর কোন ইচ্ছাও আমার নেই। ওরা যদি আমাকে জেলে পাঠায়, আমি আনন্দিত হবো। যে ব্যক্তি শাস্তি, জেল বা ফাঁসির ভয়ে ভীত, সে মাতৃভূমির সেবা করার যোগ্য নয়।"*
*— ক্ষুদিরাম বোস*
*" আমার বাবার দেনার দায়ে যে সম্পত্তি নিলাম হয়ে গেছে, তার বদলে অন্য সম্পত্তি আমি চাই না। এছাড়া আমি সংসারের থেকে লেখাপড়া শিখতেও চাই না। আমি দেশের কাজ করার জন্য লেখাপড়া ছেড়েছি। যদি সংসারে থাকি তাহলে বাবু হয়ে যাব, দেশের কাজে মন লাগবে না।"*
*— ক্ষুদিরাম বোস*
১৯০৫ সালের শেষ দিকে অতিরিক্ত পরিশ্রম ও অনিয়মিত আহারের জন্য ক্ষুদিরাম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় তাঁর শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে বিশ্রামের পরামর্শ দিলে...
ক্ষুদিরাম বলেন — *" কামার, কুমোর, তাঁতিদের পেট ভরে দুবেলা দুটো অন্নের সংস্থান যতদিন না হয় ততদিন শরীরটাকে কোন নিয়মই রাখতে পারব না।"*
১৯০৭ সালের শরৎকাল। ক্ষুদিরামের বড়দিদি অপরূপা দেবী ক্ষুদিরামকে সংসারিক বন্ধনে আবদ্ধ করার আয়োজন করেছিলেন। স্বামী অমৃতলালের এক জ্ঞাতি খুল্লতাত অঘোরচন্দ্র রায়ের ১১ বছরের মেয়ে বিদ্যুৎপ্রভাকে পাত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। পাত্রী দেখে ক্ষুদিরাম অপরূপা দেবীকে বললেন, *" দিদি! বিয়েটা এখন থাকুক, আগে সাদা পঙ্গপালগুলোকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিই, তারপর তোমার কথা মত বিয়ে করব।"* অপরূপা বললেন, "পঙ্গপাল আবার কারা?" ক্ষুদিরাম বললেন, *" দেশের লোক খেতে পায় না ওদিকে ফিরিঙ্গির দল দেশের সমস্ত চাল নিয়ে জাহাজ বোঝাই করে ম্যানচেস্টারে কাপড়ের মাড় দেওয়ার জন্য সমুদ্র পাড়ে চালান দিচ্ছে।"*
অপরূপা বুঝলেন, ক্ষুদিরাম বিয়ে করবে না।
১৯০৬ সাল।
জেলহাজতে বিচারাধীন থাকার সময় সত্যেন্দ্রনাথ বসু ক্ষুদিরামকে দেখার জন্য একদিন জেলহাজতে গিয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ ক্ষুদিরামকে বললেন, "যদি জেলখানার খাবার খেতে তোমার কষ্ট হয়, তাহলে তোমার ভাগ্নে (ললিতমোহন রায়) তোমার জন্য বাড়ি থেকে খাবার এনে দেবে। এ ব্যবস্থা আমি জেল সুপারকে বলে করে দেব। এখন তোমার কি ইচ্ছা?"
ক্ষুদিরাম বললেন, *" বাড়ি থেকে খাবার আনবার দরকার নাই, সত্যেন দা! দেশ উদ্ধারের ব্রত যারা নিয়েছে, ভাল-মন্দ খাবার নিয়ে তাদের এত মাথা ব্যথা করলে চলবে না। এই জেলখানার ভাত কয়েদিরা সবাই খাচ্ছে, আমিও খাচ্ছি। দু–এক বেলা একটু কষ্ট হয়েছিল এখন আর কষ্ট হয় না।"*
নীল কুঠির কয়েকজন সাহেব ক্ষুদিরামের বিচার দেখতে কোর্টে আসতো। ক্ষুদিরামের জ্বলন্ত দেশপ্রেম ও নির্ভীকতা দেখে বিচারের শেষে এক সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বাঙালি যুবককে জিজ্ঞাসা করলেন, *' যুবক, তুমি কি বাঙালি?'* যুবকটি বলল, *'হ্যাঁ'*। তখন সাহেব তাকে বললেন, *' তাহলে তোমার ওই ভাইয়ের (ক্ষুদিরাম) পদাঙ্ক অনুসরণ করার চেষ্টা করো।'*