08/12/2021
"হয়তো বা হাঁস হবো – কিশোরীর – ঘুঙুর রহিবে লাল পায়
সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে"
হয়তো জীবনানন্দ ফিরে এলেও তাঁর বাংলা কে তিনি চিনতে পারতেন কি সন্দেহ।
কারন উন্নয়নের প্রগতির গুঁতোয় বাংলা দশকের পর দশক জুড়ে আড্ডা খেলা র নিশ্চিন্ত স্থান। বাংলার সবুজ মাঠ গুলো আজ নিয়ন ও তীব্র ফ্লাডলাইট এ ধূসর।যেটুকু বেঁচে আছে তার উপর প্রমোটার ও পুঁজিপতিদের শ্যেন দৃষ্টি সর্বক্ষণের।হাওড়া র ডুমুরজলা যা হাওড়া র ফুসফুস নামে পরিচিত তা এই সবুজ নিধন যজ্ঞের নবতম সংযোজন।নবতম বলা টা হয়তো ঠিক নয়।ডুমুরজলা এলাকায় গত তিন দশক ধরেই চেষ্টা চলেছে এই জাতীয় উন্নয়ন যজ্ঞের।তিন দশক আগে ডুমুরজলায় আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম তৈরি করার পরিকল্পনা করে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই মাঠের একটা অংশে গড়ে ওঠে হাওড়া ইন্ডোর স্টেডিয়াম, উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক খেলার আয়োজন দেখা যায়নি কোনো সময়েই। এর সাথে আন্তর্জাতিক মানের কোনো ক্রিকেট বা ফুটবল স্টেডিয়ামও গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে কমে এসেছে এই অঞ্চলের সবুজ।
সরকার পরিবর্তন হলে ২০১৩ সালে হাওড়া উন্নয়ন সংস্থা এইচআইটির থেকে জমি চলে যায় আর্বান ডেভলপমেন্ট করপোরেশনের হাতে। তারপর শেষমেশ এই জমি তুলে দেওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গ হাউজিং ইনফ্রাসট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশান বা হিডকোর হাতে।
মাঝে ২০১৫ সালে রাজ্যের তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী মদন মিত্র দফায় দফায় ডুমুরজলায় এসে এলাকা পরিদর্শন করেন এবং এখানে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহী হন। সেই অনুযায়ী মাস্টার প্ল্যানও তৈরি হয়। মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ঠিক হয় ওই ৫৫ একর জমিতে পাব্লিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মোডে ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প হবে। সেখানে স্টেডিয়াম তৈরির পাশাপাশি আয়ের জন্য জন্য গড়ে তোলা হবে বহুতল আবাসন ও শপিং মল।
গত তিন দশকে গঙ্গায় পলি জমেছে যেমন,তার চেয়েও বেশি দ্রুত হারে কমেছে হাওড়া থেকে সবুজ এর সমারোহ।একের পর এক মাঠ-জলায় উঠেছে বড় বড় হাউসিং কমপ্লেক্স।হাওড়া হয়ে ওঠে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল।নির্বিচারে উন্নয়নের নামে গাছ কাটা চলতে থাকে।২০১৫ সালে সরকারের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠে এবং সরকার পরিকল্পনা স্থগিত রাখে।কিন্তু ডুমুরজলা আবার শিরোনামে আসে যখন ২০১৯ সালে কোনো আলোচনা ছাড়াই মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য হেভিওয়েট নেতাদের যাতায়াত শুরু হয় তখন থেকে।এর জন্য মাঠের উত্তর দিকে তৈরি হয় হেলিপ্যাড।বন্ধ হয়ে যায় ওই স্থানে হওয়া এথলেটিক্স প্র্যাকটিস এবং নিরাপত্তা র অজুহাত দেখিয়ে মাঠ থেকে মানুষকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও নতুন নয়।সরকারী সূত্র অনুযায়ী ২০১৫র পিপিপি মডেলে গড়ে তোলা হবে খেলনগরী অর্থাৎ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ, তাতে পাবলিক এর মর্জি কতখানি থাকবে?যারা গত কয়েক দশক ধরে ভারত উপমহাদেশের নানা পিপিপি মডেল এর প্রজেক্ট পর্যবেক্ষণ করেছেন তাদের নতুন করে বলার নেই।সরকারী মতে এখানে ক্রিকেট ফুটবল হকি খেলার স্টেডিয়াম এর পাশাপাশি ৬০ তলার শপিং কমপ্লেক্স,হাউসিং কমপ্লেক্স,পার্কিং প্লট,ওয়াটার বডি সুইমিংপুল তৈরি করা হবে।ইতিমধ্যেই সিএবি অর্থাৎ ক্রিকেট এসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল কে ১৪ একর জমি পাইয়ে দেওয়ার বরাত দেওয়া হয়েছে।
আবার সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে বা বলা ভালো সরকার এর মাথায় বসে থাকা সংস্থা রা পরিকল্পনা নিয়েছে হাওড়া ডুমুরজলা কে খেলনগরী করে তোলার।
হাওড়া ভৌগলিক ভাবেই একটি নিচু জলাভূমি অঞ্চল যা গাঙ্গেয় অববাহিকায় পলি পড়ে তৈরি।এবং প্রাকৃতিক কারণেই এখানে বিভিন্ন গাছ ও পাখির বৈচিত্র লক্ষ করা যায়।এখানে যেমন আছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, তেমনই আছে জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বাস্তুতন্ত্র। পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে সাইবেরিয়ান পাখি তাইগা ফ্লাই ক্যাচার বিশেষ উল্লেখ্য। এছাড়াও বেনে বৌ, শিকরা বাজ, কূবো, ঘুঘু, মাছরাঙা, টিয়া, বক, জাকাণা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি; সাপ, বেজি, বিভিন্ন প্রজাতির কীটপতঙ্গ, প্রজাপতি — এদের সবার অবাধ বিচরণক্ষেত্র এই অঞ্চল। এমনকি বিখ্যাত পরিযায়ী পাখি অ্যামর ফ্যালকম অবধি দেখা যাচ্ছে ডুমুরজলায়। এমনটা বলা বাড়াবাড়ি হবে না যে সাঁতরাগাছি ঝিলের পরে ডুমুরজলাই হতে চলেছিল হাওড়ার পরবর্তী পরিযায়ী পাখিদের জায়গা, ইকোলজিকাল হটস্পট।
এবং হাওড়া জেলায় ছোট্ট সবুজ বাটির মতো এই মাঠ কে নগরায়ন করে যে পরিবেশ ও জীব বৈচিত্রের শুধু বারোটা বাজানো হবে তাই নয় খেল নগরী হলে হাফ প্যান্ট, জার্সি গায়ে অবাধ যাতায়াত করা ছেলেমেয়েরা আর এখানে আসতে পারবে না। পারবে না ফুটবল, ক্রিকেট বা বাস্কেটবল খেলতে। কারণ ডুমুরজলা মাঠটাই আর থাকবে না। এর সঙ্গে হারিয়ে যাবে সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা, শরীরচর্চার অভ্যাস। বিভিন্ন বয়সের মানুষের প্রাতঃভ্রমণ, সান্ধ্যভ্রমণ, আড্ডা বন্ধ হয়ে যাবে। একাধিক ছোট ব্যবসায়ী কর্মসংস্থান হারাবেন, স্পোর্টস ক্লাবগুলি বন্ধ হয়ে যাবে।এবং আমরা বারবার শুনছি বিশ্বউষ্ণায়ন বিষয়ে রাজনৈতিক নেতা তথা দেশ ও রাজ্যের তাবৎ নেতা মন্ত্রী দের "সুচিন্তিত" মত!
কিন্তু যেখানে গাঙ্গেয় সমভূমি তে এই গত কয়েক বছরে কয়েক লক্ষ মানুষ নিজেদের সর্বস্ব হারিয়েছেন বারবার আসা ঘূর্ণিঝড়ে ও অকাল বর্ষণ এর জন্য বন্যায় সেখানে বছর এর পর বছর ধরে একের পর এক জলাভূমি বুজিয়ে লাখে লাখে গাছ কেটে নগরায়ন এর দায় সাধারণ মানুষকে আর কতদিন ভুগতে হবে।বারবার বর্ষায় হাওড়া র বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলের তলায় চলে যাওয়া স্বত্বেও সরকার এর টনক নড়ে না কারন হেলিকপ্টার থেকে দেখে আর নবান্নে মিটিং করে আর যাই হোক মানুষের দুর্ভোগ অনুভব করা যায় না।এবং ত্রাণের নামে রাজনীতি না করে বাংলার নানা অঞ্চলে জলাভূমি মাঠ কে রাতারাতি হাউসিং কমপ্লেক্স বানানো বন্ধ করা হোক।সেরকমই ডুমুরজলা।ডুমুরজলা র জমি নেওয়া হয়েছিলো শুধু খেলার জন্য সেখানে খেলার নামে কংক্রিট এর জঙ্গল এর বিরোধিতায় ইতিমধ্যে পথে নেমেছেন এলাকার সাধারণ মানুষ। লড়াইয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘সেভ ডুমুরজলা জয়েন্ট ফোরাম’। ফেসবুকে তৈরি হয়েছে ‘সেভ ডুমুরজলা’ নামের একটি গ্রুপ। নিয়মিত প্রচার, পদযাত্রা, কনভেনশনের মাধ্যমে সচেতনতা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া নিয়েছেন ফোরামের সদস্যরা। আইনীভাবে এই প্রোজেক্ট বন্ধ করার জন্যও নেওয়া হচ্ছে উদ্যোগ।"ডুমুরজলা থাক ডুমুরজলাতেই"স্লোগান এর গুরুত্ব বুঝুক সরকার।আমরা প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ছাত্র ছাত্রী ফেডারেশন ডুমুরজলা বাঁচানোর লড়াই এ থেকেছি ভবিষ্যৎ এও থাকবো।আমাদের মাঠ নিয়ে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না সরকারকে।সেটা সরকার যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন তত ভালো সরকারের উচিত শীঘ্র সেভ ডুমুরজলা জয়েন্ট ফোরামের সাথে আলোচনায় বসা এবং খেল নগরী প্রোজেক্ট বন্ধ করে স্থায়ী পরিবেশবান্ধব ডুমুরজলা প্ল্যানের দিকে যাওয়া। যদি কংক্রিটের জঙ্গলে বসবাস করে পোকামাকড়ের মত জীবন কাটাতে না চান, যদি খোলা হাওয়ায় বুক ভরে শান্তির শ্বাস নিতে চান, যদি ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দিতে চান তাহলে উন্নয়নের ভেকধারী রাষ্ট্র-ব্যাবস্থা ও পুঁজিবাদী সমাজের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগদান করুন।