24/05/2024
সধবার চরিত্র : ছোটগল্প
লেখক- চুরুট।
গল্পের শুরু ভিন্ন বিষয় হলেও আসল গল্প অন্য। ছেলেটির নাম পবিত্র। পরিবার খুবই গরীব। কিন্তু আর্থিক কষ্টের মধ্যেই পড়াশুনায় মনোযোগী বাড়ির আদরের সন্তান পবিত্র। স্কুল কলেজ কষ্ট করে পার করলেও বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। তবে মায়ের আশীর্বাদে ও বাবার দোয়ায় টিউশনি পরিয়ে কোনোভাবে কলেজের সেরা ছাত্র পবিত্র বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে। তারপর বি.এড করে স্কুলের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে। অন্যদিকে কলেজের শিক্ষক হওয়ার আশায় বার কয়েক নেট সেট পরীক্ষায় বসলেও আশানুরূপ ফল আসেনি। তাই হতাশাগ্রস্ত পবিত্র এখন টেট পাস করা একজন বেকার শিক্ষিত যুবক।
স্কুল জীবনে পড়াশোনায় এতই আগ্রহী ছিল যে, অন্য বিষয়ে ভাবার সময় হয়ে ওঠেনি। তবে কলেজের গণ্ডিতে ঢুকলে চনমন স্বভাবের পবিত্র একটি সুন্দরী মেয়ের প্রতি ভালো লাগার লুকোচুরি খেলায় মেতে ওঠে। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস- সে খবর বাড়িতে জানাজানি হলে তার দাদা সেই রাস্তায় কাটা হয়ে দাঁড়ায় এবং প্রারম্ভিক যৌবনের মাতলামি বন্ধ করে দেয়। ফলে পড়াশুনার ধারা পাতে একটা বছর নষ্ট হয়ে যায় পবিত্রের।
কিন্তু রোবাট ব্রুশের কবিতায় অনুপ্রাণিত পবিত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশ করে। সেখানে প্রথম দিক ভালো ভাবে কাটলেও শেষ পর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় কোনো রকমের সম্মানসূচক ফলাফল করে। অন্যায় ও নোংরামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা কলেজ জীবনে এস.এফ. আই করে আসা পবিত্র জেদের বসে আজ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ দেখতেও যায়নি।
ভালোলাগার পূর্বরাগ কলেজ জীবনে শুরু হলেও ভাঙ্গা গড়ার বেদনায় দুই বছর প্রেম ভালবাসা জীবন থেকে বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু বয়সের ধর্মে বারবার জেগে ওঠা কিন্তু চেপে রাখা সুপ্ত প্রেম এবার নিজের জেলা ছাড়িয়ে দক্ষিণবঙ্গে গিয়ে শুরু হয় বি .এড করার সৌজন্যে! স্বপ্ন দেখে এস.এস.সির আর ভবিষ্যৎ অর্ধাঙ্গিনীর। মুর্শিদাবাদ থেকে কোচবিহার ফল্গুধারা'র মতো প্রেম প্রবাহিত হলেও বর্তমান সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের কু-চক্রে পড়ে আজও পবিত্র বেকার…. বেকার..... বেকার। আর এই বেকারত্বই ধীরে ধীরে অভিসারে আগমনীত প্রেমের মরীচিকা হয়ে ওঠে।
গল্পের শুরু বেকার পবিত্র আজ অসহায় । মানুষ আজ তাকে বারবার খেলনার পুতুল হিসেবে ব্যবহার করছে। এম.এ, বি.এড পাস পবিত্র না পারছে জমিতে থাকতে না পারছে প্রতিষ্ঠিত হতে। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই বর্তমান সমাজের কিছু লোভী স্বার্থান্বেষী মানুষ কখনো ব্যবসার নামে, কখনো শিক্ষার নামে, কখনো ধর্মের নামে, কখনো প্রেমের নামে ভদ্রতার বেশে তার জীবনটাকে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। এমন কি অভিসারযাত্রায় চলমান প্রেমকেও ধ্বংস করতে মুখোশের আড়ালে অসভ্যতামি নোংরামি চরম স্থানে নিয়ে গেছে। কু-চক্রের ফাঁদে ফেঁসে পবিত্র আজ নির্লিপ্ত এবং অনুতপ্ত।
কিন্তু কলেজে রাজনীতি করা পবিত্র বাবা-মায়ের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে কোন এক সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ করে বিশ্বাসী এক ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করে। ঈশ্বরের কৃপায় সেই ব্যবসা পবিত্র কে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করলেও বিঘা খানেক জমি, বাড়ি বানানোর জায়গা এবং হাতে কয়েক লক্ষ টাকা ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। কারণ আবার সেই প্রেম। বারবার প্রেমের ভাঙ্গা করার খেলায় অতিষ্ঠ পবিত্র এবার না চাইলেও প্রেমের মায়াজালে মোহিনীর টানে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। অনিচ্ছাকৃত প্রেম এবার অন্যরূপে নিয়ে যায় পবিত্র কে। পরিপক্ক অভিজ্ঞ প্রেমিক নারীর রহস্যময়ী চালে দুর্বল হয়ে আবার এক নতুন করে স্বপ্ন দেখতে থাকে। যেন মরা কোটালেও জোয়ার ভেসে ওঠে পবিত্রের জীবনে। শপিংমলে গিয়ে শপিং করে দেওয়া, ঈদে পাঞ্জাবি কিনে দেওয়া, চুড়িদার কুর্তি উপহার হিসেবে দেওয়া থেকে শুরু করে প্রেমের মায়াজালে গভীরভাবে আকৃষ্ট করতে আরো অনেক ছলাকলা অবলম্বন করে। তারপর চলতে থাকে অবিরাম ভাব বিনিময় এবং সুখ-দুঃখের বারো মাসের কাহিনী। চন্ডীমঙ্গলের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর আঁকা ফুল্লরার মতো নানা অত্যাচারের কাহিনী শোনাতে থাকে পবিত্রকে। ভাতের থালা মুখে চেপে দেওয়া, বিনা কারণে বাবা-মায়ের নির্লজ্জ গালিগালাজ, নির্ভরশীল লোকের অক্ষমতা তুলে ধরে পবিত্রের জীবনে বিশ্বাসী হয়ে ওঠতে থাকে।
বিশ্বাসের এই সুযোগে আজ যা ঘটেছে তা খুবই নিদারুণ এবং বেদনাদায়ক। বাড়ীর কাজের জন্য সেলফ হেল্প গ্রুপের লোন তোলার নাম করে এই নারী বিশ্বাসী পবিত্রের আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে বসে। বকেয়া টাকা শোধ করে লোন নেওয়ার গল্প ফেঁদে বাড়ির সকলকে অন্ধকারে রেখে এমনকি, পবিত্র জানাতে চাইলেও বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে প্রায় দেড় লক্ষাধিক এর উপরে টাকা ১৫ দিনে শোধ দিবে এই কথা বলে শহরের একটি নামিদামি রেস্তোরায় গিয়ে নিয়ে বসে। বিশ্বাসের বেড়াজালে পড়ে পবিত্র দিতেও বাধ্য হয় এবং অন্ধ প্রেমের মোহে এভাবেই নিজেকে নিঃস্ব করে ফেলে। পূর্বের স্বার্থন্বেষী মানুষদের মতো এই নারীর রুপও যে "এক" সেদিন সহজ সরল পবিত্র হয় বুঝতে পারেনি না হয় ভাগ্যে তাই লেখা ছিল। আজ প্রায় মাস কয়েক হয়ে গেল, দু-জনের অভিমানী প্রেমের ইতি হয়ে গেছে। একটাই অপরাধ টাকা ফেরত দিতে বলা এবং এক নতুন কাহিনী।
এরই মাঝে আরেকটি নতুন কাহিনীর অবতরণ হয়েছে। এই নারীর জীবনে পাশাপাশি আরেকটি নতুন পুরুষের শুভাগমন ঘটেছে। জানিনা, এবার কোন কলা কৌশলে আবার এক নতুন ফাঁদ পেতেছে। জানিনা, এই নারী এইভাবে কত পুরুষের জীবনে লিপ্ত হয়েছে এবং কামাসক্ত জালে ফেলে কত মানুষকে পথের ভিখারী করেছে। তবে আজ পবিত্র কঠিন মানসিক দ্বন্দ্বে অন্তরঘাতে অবসাদে ভুগছে। কবে এই আত্মঘাতী জীবন সংগ্রাম থেকে পবিত্র মুক্তি পাবে পৃথিবীর কেউ জানে না। অর্থ যশ খ্যাতি সবই ধ্বংস করতে পবিত্র আজ পাগল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন থেকে প্রিপারেশন নেওয়া স্টেট পরীক্ষার কথা ভুলে শুধু আত্মবিলাপ আর সিগারেটের ধোঁয়া বের হচ্ছে।
তবে আজ পবিত্র চিনিতে পেরেছে, জীবনে কেউ কাহারোই নয়। এবং বুঝতে পেরেছে, জীবনে কত ভুল সে করেছে। সন্তানের মাথায় হাত দিয়ে যে নারী মিথ্যা বলে একদিন সত্য ছিল, সেই নারী জগৎ সৃষ্টির কারিগর হলেও আজ তার কাছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধাত্রী দেবতা উপন্যাসের বাইজি বা সভ্য সমাজের বেশধারী "বেশ্যা" বলে মনে হচ্ছে।
সন্তানের আবেদন করে যে নারী নতুন পুরুষের জীবনে দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে কথা বলছে, সন্ধ্যা রাতে গোপনে দুরভাষ যোগাযোগ করছে, সে নারী যে "কাল সাপ" হয়ে আরও একটি সুন্দর পুরুষের জীবন ধ্বংস করবে এটা সমস্ত পাঠক সমাজ গল্পটা পড়লেই বুঝতে পারবে। তবে এখান থেকে পরিত্রাণের রাস্তা যে নেই সেটা ঠিক, কিন্তু পাঠকের কাছে লেখকের আবেদন, সময়ের চেয়ারে বসে না থেকে পবিত্রের জীবনের মঙ্গল কামনা করে নতুন পুরুষকে প্রয়োজনে গয়া-কাশি গিয়েও বাঁচাবেন।