21/10/2025
উৎসবের আবহ আর আলোর রোশনাই দেখা দিলে দীপাবলির পূণ্য লগ্নে মনে পড়ে "আলোর ঠিকানা" টাকে......
(পূর্বপ্রকাশিত)
"আলোর ঠিকানা"
কলমে:- অধম
বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে, জীবন থেকে অনেক কিছুই খুইয়ে- আজ রিধান খোলা আকাশের নীচে, দীপাবলির আলোর রোশনাইটায়- এক পরমতৃপ্তি অনুভব করছে। সত্যিই, আঁধারভূবনে "আলোর ঠিকানা"টার কোনো তুলনাই হয় না।
এতটাও সহজ ছিলনা, এই আলোর ঠিকানার পথটা।
কতই বা বয়স হবে, ওই কচিকাঁচা মুখগুলোর? সকলের বয়সই তো, আট-দশ-বারো বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আজ, ওরাও কত্ত উৎফুল্ল! ওদের মুখগুলো আজ কতই না উদ্ভাসিত, আলোকিত। ওদের উল্লসিত হাসিগুলোও তো, আজ এক-একটা ভূবন ভোলানো আলোর ঠিকানা।
অথচ, ওই মুখগুলোই তো, একদিন রুক্ষ শুষ্ক পাংশুবর্ণ, মলীন হয়ে, এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় নির্মম বাস্তবের গহীন আঁধারে নিমজ্জিত হয়ে ছিল।
কম কাঠখড় পোহাতে হয়নি রিধানকে, ওদের ওই নির্দয় সমাজ থেকে বার করে নিয়ে আসতে গিয়ে! ওদের স্বার্থপর পৃথিবীটার কতরকম কটুকথা, কতরকম চোখ রাঙানি, কত গ্যাঁটের কড়ি খরচা করে, তবেই রিধান পেরেছে- ওদের তুলে আনতে, নিজেরই বানানো এই আলোর ঠিকানায়।
ওদের মধ্যে বেশ কয়েক জনের জন্য তো, রিধানকে বহু ঝামেলা ঝঞ্ঝাটে জড়াতে হয়েছে, বারংবার। কয়েকবার, ঝামেলা এতোটাই বেড়ে গেছিলো যে, থানাপুলিশ, কোর্টকাছারী পর্যন্ত গড়িয়েছিল। দুবার তো তাকে, বেশ কিছুদিনের জন্য হাসপাতালের বিছানায় বিশ্রাম পর্যন্ত নিতে হয়েছে! তবুও এক অদম্য জেদেই, রিধান কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়নি কোনোদিনই।
আজ তার প্রতিদানটা, এই স্বর্ণালী সন্ধ্যায় রিধান পরতে পরতে অনুভব করতে পারছে- ওই কচিকাঁচাগুলোর সাথে বাজি পোড়ানোর অবাধ খুশী ও হুল্লোড়ে মেতে।
এবার বাজি পোড়ানোয়- নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, ভয়াবহতাটা জানা সত্ত্বেও, ওই কচিকাঁচা গুলোকে একটু খুশী উপহার দেওয়ার জন্যই- রকমারী প্রদীপ, ঝিকঝাক লাইটের সঙ্গেই, কিছু বাজিও রিধান- ঠিক ব্যবস্থা করে নিয়ে এসেছে। যতই হোক, সে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে; তাও আবার, এমনি সেমনি নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক পদেই কর্মরত ছিলেন। তাই, তার পক্ষে ঘুরপথে বাজি জোগাড় করাটা- তেমন কিছুই নয়। সমাজের পিছন পথটা তো, তার ভালো মতোই জানা আছে।
হয়তো, তার এই চাকুরী সূত্রটাই- অনেকটা সাহায্য করেছে, আজকের ওই জনা বিশেক নিষ্পাপ শৈশবকে- আলোর পথে, আলোর ঠিকানায় পৌঁছে দিতে।
রিধানের জীবনটাও ছিল- আর পাঁচটা সাদামাটা বাঙালীর মতোই। চাকুরী সূত্রে দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত নিয়মিত বদলি, আর প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষগুলোকে বগলদাবা করে- ঘরের খেয়ে দুধেভাতে আয়েশ করা নিদ্রাসুখ। কোনদিনই রিধান, সেভাবে ওই পথশিশু বা শিশুশ্রমিক দের নিয়ে, সেরকম কিছু ভাবতোও না।
কিন্তু, বিধাতার বোধহয় ইচ্ছাটা ছিল অন্যরকম। তাই এক নিষ্ঠুর স্বার্থের খেলায় মেতে, রিধানের সবচেয়ে কাছের মানুষটাই, যখন এক গভীর ক্ষত এঁকে দিয়েছিল বুকে; একজন দুঁদে অফিসার হয়েও রিধান সেদিন- নিজের জীবনটাকে ব্যর্থ মনে করেই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার এক জঘন্য পরিকল্পনা করে নিয়েছিল!
তখন তার পোষ্টিং বিহারে। সেই পরিকল্পনা মাফিকই, কোনো এক রাতে বিহারের নাম করা এক দুষ্কৃতী আখড়ার আশপাশে নিরিবিলি এক ধাবায় বসে- তার নিজেরই সার্ভিস রিভলবারটা বার করে, নির্মম পরিণতির কথা ভেবে, সাতপাঁচ চিন্তা করতে করতে নাড়াচাড়া করছিল….
ঠিক তখনই, ওই বছর দশেকের শেখ রাজু (নামটা অবশ্য পরিচয়পত্র হীন) বলে বাচ্চাটা- হয়তো, বিধাতার ইচ্ছেতেই রিভলবারটার দিকে আঙুল দেখিয়ে রিধানকে এসে জিজ্ঞাসা করেছিল,
" ও কাকু, এইটা দিয়ে কী হয় গো? মাঝে মাঝে দেখি আরো সব হোমড়াচোমড়া কাকু গুলোও- এই রকমই কিছু একটা দিয়ে সব্বাইকে খালি ভয় দেখায়; আর সবাইই কেমন ভয়ে জড়সড় হয়ে কাঁপতে থাকে। এইতো সেদিনও, আমি যখন এক কাকুকে চা-এর পয়সা চাইতে গেলাম, তখন ঐ কাকুটা আমাকেও ঐটা দেখিয়ে কত্ত ধমকাচ্ছিল। আমি কিন্তু ভয় পাইনি একটুও! আমার মালিক ঐ বুড়োবাবা- যে আমাকে কুড়িয়ে নিয়ে এসে মানুষ করেছে, সে কিন্তু ভয়ে জড়সড় হয়ে কত কাকুতিমিনতি করে- আমাকে খুব বকতে বকতে ওদের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছিল। আচ্ছা কাকু, এইটা দিয়ে কি মানুষকে মারা যায়? তাহলেতো, তোমরা খুব বাজে, খুব খারাপ লোক, তাই না! তোমরা কেন সব্বাইকে মেরে ফেলো? বলো না কাকু! আমাকেও কি, তোমরা কোনোদিন মেরে ফেলবে, ওই আমার বন্ধু, কয়লা গুড্ডুর মত? জানো তো কাকু, আমার বন্ধু 'গুড্ডু' কিচ্ছু জানতো না, শুধু ওই পড়ে থাকা কয়লা কুড়িয়ে- এই আমাদের দোকানের মতো, সব দোকানে দোকানে দুটো পয়সার জন্য বিক্রি করে যেত। তাই ওর নাম হয়ে গেছিল কয়লা-গুড্ডু। কিন্তু ওরা, ওই গুন্ডাগুলো, ওকেও ছাড়েনি! একদিন শুনলাম, খাদানের পাশেই ওকে মেরে ফেলে রেখেছে। আমার বন্ধু কিন্তু খুব ভালো ছিলো কাকু, ও কিচ্ছু করেনি। ও কাকু! আমাকে একবার দেবে এই খেলনাটা? ঐ যে দেখছো, বদমাশ লোকটা বসে আছে, ওই ওদিকে! ওকে একটু ভয় দেখিয়ে আসি। সব্বাই বলে, ও'ই নাকি আমার বন্ধুকে মেরেছে। বন্ধু নাকি, কিছু একটা দেখে ফেলেছিল বলে। দাও না কাকু, একবার এই খেলনাটা"।।
সেদিনই রিধান, ওই ফুটফুটে শৈশবের অব্যক্ত যন্ত্রণাটা অনুভব করে, নিজেকে শেষ করার ঘৃণ্য প্রবণতা তো- বাতিল করেইছিলো; সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল, এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজের বুকে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া বিপন্ন শৈশবগুলোকে- সে তার নিজের জীবনের পারোয়া না করেই তুলে নিয়ে যাবে আলোর পথে। গড়ে তুলবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর এক নতুন আলোর ঠিকানা।
আজ অবসরের বেশ কয়েক বছর পরে, তার জমানো সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে গড়ে তুলেছে- এক অবাধ খুশীতে ভরা উদ্দাম শৈশবের নিশ্চিৎ আলোকিত ভবিষ্যতের এক নতুন ঠিকানা।
চার দেওয়ালের স্থায়ী আচ্ছাদনের সাথে- জ্ঞানের মন্দির বিদ্যালয়, এবং বিকশিত শৈশবের ক্রীড়াঙ্গনের যুগলবন্দিতে রিধান- তার নিজের তৈরি আশ্রমটারই নাম রেখেছে "আলোর ঠিকানা"।
চাকুরী জীবনের শেষ কয়েকটা বছর- সে যেখানে যেখানে গেছে, সেখান থেকেই ঠিক কোনো না কোনো বিপন্ন শৈশবকে আলোর পথ দেখাতে, তুলে নিয়ে এসেছে তার নিজের সাথে; এই আলোর ঠিকানায়।
একাকী রিধান, আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আলোর উৎসব দীপাবলির স্বর্ণালী সন্ধ্যায়- উত্তাল শৈশবগুলোর পানে চেয়ে এক অলীক কল্পসুখে- গহীন মনের অন্ধকার যন্ত্রণাটাকে, চরম ধিক্কারে সিগারেটের ধোঁয়ায় বাতাসে নিক্ষিপ্ত করে, এবার হয়তো খুঁজে চলেছে- তার নিজস্ব জীবনের পরমশান্তির শেষ আলোর পথটাকে, আর এক অন্য কোনো আলোর ঠিকানায়......
ক্রমশ.......
হ্যাঁ , আবারও ঠিক এই পূণ্য আবহে রিধানের হাত ধরেই আসতে চলেছে 'আলোর ঠিকানা'র দ্বিতীয় সমারোহ...... ঠিক দীপাবলির পরেই....
আশার আলো সাথে নিয়ে মুখপুস্তিকা-সমস্ত-বন্ধুসকলকে জানাই আলোর শুভেচ্ছাসহ #শুভ_দীপাবলি 🪔🙏🙏
#ছোট_গল্প
#আলোর_ঠিকানা(প্রথম_পর্ব)
#রচনা_ও_চিত্রায়ণ_নিজস্ব (কোনো এক আলোর পৃথিবী ঘুরে)
বি দ্রঃ:- রচনাকাল অনেকটা আগের বলেই পূর্বপ্রকাশিত স্বরূপ
everyone