27/09/2025
আজ দুপুর বেলায় লাদাখের প্রতিবাদী মুখ থ্রি ইডিয়টস এর র্যাঞ্চো, সোনম ওয়াংচুক কে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা আইন, ইউ এ পি এ তে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, জানা যাচ্ছে তাঁর বিরুদ্ধে হিংসায় উসকানি দেওয়া আর আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। থ্রি ইডিয়টস এর ফুনসুক ওয়াংড়ু কে মনে আছে? হ্যাঁ এই সোনম ওয়াংচুক কে মাথায় রেখেই এই চরিত্র তৈরি করা হয়েছিল। আজ দুপুর ২.৩০ এ উনি সাংবাদিক সম্মেলন করার কথা জানিয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই ওনাকে গ্রেপ্তার করা হলো। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ কখন সরকার বাহাদুর জানতে পারলেন এই দূর্নীতির কথা? যখন জেন জি ঝড়ে কাঁপছে লদাখ, পুড়ছে বিজেপির দপ্তর। ভগৎ সিংয়ের সেই বিখ্যাত কথাটি আমরা সবাই জানি। "If the deaf have to hear, the sound has to be very loud" তিনি বলেছিলেন, "কালাদের শোনানোর জন্য খুব জোরে শব্দ করতে হয়।" পরাধীন ভারতে এই কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আজ স্বাধীন ভারতের লাদাখেও এই কথাটাই সত্যি হয়ে উঠেছে। বহু বছর ধরে সেখানকার মানুষ চুপচাপ, শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানিয়ে এসেছেন। কিন্তু দিল্লি সেই আওয়াজ শোনেনি। তাই আপাত শান্ত লাদাখেও এখন অশান্তির আগুন জ্বলছে। জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুক প্রায় তিন বছর ধরে অনশন করছেন, ধরনা দিচ্ছেন, পদযাত্রা করছেন। কিন্তু তার কথা কেউ কানে তোলেনি। তাই অবশেষে লেহ-এর তরুণ প্রজন্ম, যারা ‘জেন জি’ নামে পরিচিত, তারাই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তারা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, রাস্তায় নেমে এসেছে। পুলিশের গুলিতে কয়েক জন যুবক মারাও গেছে। তাদের দেহে একটা নয়, অনেকগুলো গুলি লেগেছে। লাদাখের এই ক্ষোভ একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। ২০১৯ সালে হঠাৎই জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরি করা হয়। জম্মু ও কাশ্মীরকে বিধানসভা দেওয়া হলেও, লাদাখকে এক বিধানসভা-বিহীন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে রেখে দেওয়া হল। ফলে লাদাখের মানুষ সরাসরি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনে চলে আসে। তাদের নিজস্ব কোনো নির্বাচিত সরকার বা জনপ্রতিনিধি রইল না, যারা তাদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে পারে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনই যা আসলে এক নির্ভেজাল গণতন্ত্রহীনতা, তাই তাদের মনে গভীর হতাশার জন্ম দিতে শুরু করে। টানা তিন বছর ধরে লাদাখের রাজ্য মর্যাদার দাবির প্রতি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কর্ণপাত করেনি। লাদাখের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায়নি। বহুদিন ধরে সরকারের বঞ্চনা আর প্রতারণার শিকার হয়েছেন এই অঞ্চলের মানুষ। তাঁদের মধ্যে যে ব্যাপক পরিমাণে ক্ষোভ জমেছে, তারই বিস্ফোরণে বুধবার কেঁপে ওঠে লে, লাদাখের ও কার্গিলের একের পর এক শহর। পুলিশ প্রশাসনের বেপরোয়া মারধর ধরপাকড় চলছে। নিহত ৪, আহত অন্তত ৮০। লে'তে কারফিউ জারি হয়েছে। কার্গিল সহ আশেপাশের অন্যান্য জায়গায় জাময়েতে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়েছে। এখন দৃশ্যত শান্ত হলেও, বৃহস্পতিবার লাদাখ জুড়ে এক অদ্ভুত চাপানউতোরের চলেছে, আছে চাপা টেনশন। টানা একদিন ধরে গোটা উপত্যকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। লে শহরের অলিতে গলিতে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর টহল চলছে। তারই মধ্যে বিক্ষোভকারীদের ধরপাকড় চলছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অন্তত ৫০ জনকে বিভিন্ন অভিযোগে আটক করা হয়েছে। ষষ্ঠ তফসিলের দাবিতে লে অ্যাপেক্স বড়ির ডাকা হরতালে বুধবার এই শহর বিক্ষোভে উত্তাল হয়। লে'র থেকে বিক্ষোভ কার্গিলেও ছড়িয়ে পড়ে। কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স এই অঞ্চলে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে হরতালের ডাক দেয়। নির্লজ্জতার সীমা ছাড়িয়ে বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার “অশান্তির সব দায় লাদাখের সাধারণ মানুষের উপর ঝেড়ে ফেলতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। ৩৭০ ধারা বাতিল করে যে লাদাখকে 'মুক্ত' করার দাবি করেছিলেন বিজেপি নেতারা, হঠাৎ যেন তাঁদের কাছে সেখানকার সাধারণ মানুষ অনেকটা ঠিক কাশ্মীরের মতোই বিজেপি'র কাছে 'দেশদ্রোহী' হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার সারাদিন ধরে দফায় দফায় দিল্লিতে বসে বিজেপি'র শীর্ষ নেতারা নানা রকম হম্বিতম্বি করে গেছেন। লাদাখের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দুষ্কৃতীদের অস্ত্র দিয়ে হিংসার ষড়যন্ত্র করা, বিদেশের থেকে মদত নিয়ে হিংসায় উসকানি দেওয়া এবং দেশের অখণ্ডতা ভাঙতে চক্রান্ত করার মতো তাঁদের বিরুদ্ধে নানা ভিত্তিহীন আক্রমণ করা হয়েছে। লাদাখের সমস্ত বাসিন্দার যথেষ্ট 'দেশপ্রেম' রয়েছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন তুলে বসলেন বিজেপি'র এক মুখপাত্র। ওনারা ছাড়া তো দেশে আর কোনও দেশপ্রেমিক নেই। এক চরম হতাশাই জন্ম দিয়েছে এই বিক্ষোভের, হতাশার আরও অনেক কারণ আছে। লাদাখের মানুষ ভয় পাচ্ছে যে বাইরের মানুষ তাদের জমি, চাকরি এবং সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ করবে। তাদের আশঙ্কা, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার কারণে বাইরের বড় বড় কোম্পানি এবং ব্যবসায়ীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ও ভঙ্গুর পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। পরিবেশ কর্মী সোনম ওয়াংচুক নিজেই বলেছেন যে শিল্পপতিরা সেখানে খনি স্থাপন করতে চান। এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পও পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করছে। ২০২৩ সালে ৫ লাখেরও বেশি পর্যটক এসেছিলেন। তাই সেখানকার মানুষ সাংবিধানিক সুরক্ষার জন্য লড়াই করছে। এইসব রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত বিষয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক হতাশা আরও বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। লাদাখের যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্বের হার বিরাট। স্নাতকদের মধ্যে এই হার ২৬.৫%। জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। স্থানীয়দের জন্য চাকরি নিশ্চিত করতে কোনো পাবলিক সার্ভিস কমিশনও নেই। বছরের পর বছর ধরে চাকরি না পাওয়া এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার ফলে তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জমা হয়েছে। এই ক্ষোভের বিস্ফোরণই লেহ-তে দেখা গেছে। ২০১৯ সাল থেকে লাদাখের দুটি বড় রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন, Leh Apex Body (LAB) এবং Kargil Democratic Alliance (KDA), একজোট হয়ে আন্দোলন করে আসছে। এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ হলেন সোনম ওয়াংচুক। তাদের লড়াই ছিল সম্পূর্ণ অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ। কালেক্টেড।