28/02/2024
১৯১০ সালের এক শীতের দিনে রক্ষণশীল সমাজের যাবতীয় রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রবি ঠাকুর বিধবা প্রতিমা দেবীর সাথে পুত্র রথীন্দ্রনাথের বিবাহ দিয়ে হৃদয়হীণ সমাজের অনুশাসন ভাঙার বার্তা দিলেন ৷
১৯ শতকের নারীদের গৃহবন্দি জীবনের শিকল কেটে মহিলাদের মুক্ত আকাশ চিনিয়েছিলেন যে সব নারী, তাঁদের মধ্যে অবশ্যই প্রথম সারিতে নাম থাকবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর।
অকালেই চলে গিয়েছিলেন মৃণালিনী৷ সৌদামিনীর ফুটফুটে নাতনিকে দেখে মনে ধরেছিল কবিপত্নীর এমন কি সেইসময় তিনি নিজের ঘনিষ্ঠদের বলেছিলেন ছোড়দি দি তাঁর নাতনিকে আমায় দেবেন,এই সুন্দর মেয়েটি হবে আমার পুত্রবধূ৷ রবীন্দ্রনাথ অবশ্য কিশোর পুত্রের বিয়ে দেবেন না জানিয়ে দিলে প্রতিমার বিবাহ হল কুমুদিনীর ছোট নাতি নীলানাথের সাথে৷ তখন তাঁর বয়স মাত্র এগারো৷ শ্বশুরবাড়ি থেকে অপয়া অপবাদে প্রতিমাকে ফিরতে হয়েছিল গঙ্গায় সাঁতার কাটতে গিয়ে জলে ডুবে মারা গেলেন তাঁর স্বামী নীলানাথ৷
১১বছরের ছোট্ট প্রতিমা মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সধবা থেকে বিধবা হয়ে দেখলেন রক্ষণশীল সমাজের অনুশাসন ৷ সেদিনের সমাজ মাত্র ১১বছরের নাবালিকাকে বাধ্য করেছিল বিধবার কঠোর জীবনযাপনে৷ প্রতিমা বিধবা হয়েছেন দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা বছর অতিক্রান্ত৷ওদিকে রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ বিদেশ থেকে কৃষিবিদ্যায় বড় ডিগ্রি অর্জন করে স্বদেশে ফিরে এসেছেন।রবীন্দ্রনাথের সহধর্মিণী মৃণালিনী দেবীর ইচ্ছা ছিল প্রতিমাকে পুত্রবধূ করবেন৷যদিও তাঁর অকাল প্রয়ানে মৃণালিনী দেবীর সেই ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়নি৷
রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে বাল্য বিধবা কিশোরী প্রতিমার জন্য তখন অনেকখানি স্নেহের পরশ৷ প্রতিমাকে নিজের পুত্রবধূ করার প্রস্তাব দিলেন৷ কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ প্রতিমাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে আনন্দে উচ্ছল হয়ে চিঠি লিখলেন বন্ধু নগেন্দ্রকে' ভাই নগেন,তোমাকে অনেকদিন লিখতে পারিনি কেন বোধহয় বুঝতে পারছ-বিয়ের গোলমালে ব্যস্ত ছিলুম৷আজ কী পরিপূর্ণ আনন্দ নিয়ে তোমায় লিখতে বসেছি৷প্রতিমা এখন আমার —সে আমার ঘরে এসেছে—সে কী চমৎকার মেয়ে তোমাকে কী করে লিখি৷আমি যদি তার গুণের বর্ননা করতে যাই তো সব কথা বিশ্বাস করবে না বা আমাকে Lunatic ভাববে'৷
রবীন্দ্রনাথ পুত্রবধূ সম্পর্কে লিখেছেন 'বৌমা চলে গেলে দিনগুলি শ্রীহীন হয়ে পড়ে,ভালো লাগে না,তিনি থাকলেও দেখাশোনা বিশেষ হয় না,তবু তাঁর প্রভাবতা থাকে হাওয়ায়'৷ পুত্রবধূ হয়ে আসার পর প্রতিমা যখন যেখানে থেকেছেন,সে জোড়াসাঁকো হোক বা শিলাইদহ অথবা শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখাপড়ার জন্য সর্বদা উপযুক্ত ব্যবস্থা করেছেন৷বিয়ের অল্প কিছুদিন পরে যখন শান্তিনিকেতনে এসে থাকেন তখন তার ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়৷আবার তিনি যখন জোড়াসাঁকোয় এসে বসবাস শুরু করেছেন তখন তিনি বিশ্বকবির বাড়ির পারিবারিক গৃহবিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেছেন৷ রবীন্দ্রনাথের পরিবারের ইতিহাসে প্রতিমাদেবী এক বহুমুখী প্রতিভার নারী, রবীন্দ্রনাথের স্নেহে,অনুপ্রেরণায় যার বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ হয়েছিল,তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন সে'যুগের অনেক নারীর অনুপ্রেরণা৷ কবির জীবনের অনেকটা সময় প্রতিমা দেবী নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর সেবা করেছেন,সেই ভার তিনি নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায় নিজের সংসার এবং শান্তিনিকেতনের আশ্রম দেখাশোনার ভার নিজের হাতে নিয়ে হয়ে প্রতিমা দেবী হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের স্নেহময়ী অভিভাবিকা৷
ঠাকুর বাড়ির বধূ হয়ে আসার পর প্রতিমা দেবীর বহুমূখী প্রতিভার প্রকাশ হতে সময় লাগেনি৷ রবীন্দ্রনাথ তার ছদ্মনাম ঠিক করে দিয়েছিলেন।কল্পিতাদেবী ছদ্মনামে প্রবাসী পত্রিকাতে অনেক কবিতা লিখেছেন৷
কবির সাথে প্রতিমা দেবীর সম্পর্কে ছিল স্নেহমিশ্রিত সম্মানের অনবদ্য রসায়ন৷ 'দ্বারিক' তখন ছাত্রী আবাস৷ এক দিন অদ্ভুত খেয়াল চাপলো প্রতিমাদেবী, সুধীরাদেবীদের মাথায়৷যখন 'দ্বারিকে'মেয়েরা ঘুমাচ্ছে, হঠাৎ সেখানে 'ডাকাত' পড়ল। ডাকাতের দল মেয়েদের অলঙ্কার নিয়ে টানাটানি করল। মেয়েদের চিৎকারে ছুটে এসেছেন আশপাশের সবাই। কিন্তু আশ্চর্য! শিক্ষক সন্তোষচন্দ্র মজুমদার সবাইকে বলতে লাগলেন, ‘কিছু না কিছু না, কিচ্ছু হয়নি।’কে শোনে তাঁর কথা!অবশেষে সন্তোষচন্দ্র কালি-মাখা কমলাদেবীকে এনে দেখালেন, সবই নকল ডাকাত। এর কিছু দিন পরে ভুবনডাঙায় জগদানন্দ রায়ের বাড়িতে আসল ডাকাত পড়েছিল৷ রবীন্দ্রনাথ পরের দিন প্রতিমাদেবীকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, - 'বৌমা, তোমাদের দল নয় তো'! পুত্রবধূর সঙ্গে রবি ঠাকুরের এই রসিকতায় প্রমাণ হয় কেমন ছিল তাদের স্নেহ-সম্মানের সম্পর্কের কেমিস্ট্রি।
১৯১২-তে রবীন্দ্রনাথ যখন ইংল্যান্ড ও আমেরিকা যান,পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীও তাঁর বিদেশ যাত্রায় সঙ্গী হন ।বৃহত্তর পৃথিবী এইভাবে উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল প্রতিমা ঠাকুরের কাছে৷ শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বহু নাটক অভিনয় করিয়েছেন। কেবলমাত্র মেয়েদের অভিনয়-উপযোগী নাটক লেখার অনুরোধ জানান কবিকে, এবং এইভাবে রচিত হয়েছিল 'লক্ষ্মীর পরীক্ষা'৷অভিনয় শেখানোর পাশাপাশি অভিনেতাদের সাজগোজ আর মঞ্চসজ্জার দায়িত্ব সামলাতেন৷ রবীন্দ্রনাথের জীবনের অন্তিম বছরের চমৎকার বিবরণ লিপিবদ্ধ প্রতিমা ঠাকুরের লেখা 'নির্বাণ'গ্ৰন্থে।অবনীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথের কথা আছে 'স্মৃতিচিত্র' বইয়ের পাতায়৷'নৃত্য' বইয়ে প্রতিমা ঠাকুর লিখেছেন শান্তিনিকেতনের নৃত্যধারার বিষয়৷ 'চিত্রলেখা' প্রতিমা দেবী রচিত কবিতা এবং কথিকার অনবদ্য সংকলন।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর নৃত্যনাট্যগুলোতে নৃত্যের সুচারু ব্যবহার, নৃত্য প্রয়োগের সম্ভাবনার কথা সম্ভবত ভাবেনই নি! প্রতিমা দেবীর কৃতিত্ব হল তিনিই প্রথম রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য সমূহের নিবিড় নৃত্যমুদ্রা উদ্ভাবন করে পরিবেশন করেছেন।আজ আমরা রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখে তার নান্দনিককতায় আপ্লুত হই, তার পেছনে অবশ্যই প্রতিমা ঠাকুরের রবীন্দ্রনৃত্যের প্রায়োগিক ভাবনা..
♦️তথ্যসূত্রঃ ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল (চিত্রা দেব), আনন্দবাজার পত্রিকা