17/02/2024
কমরেড সীমা হাঁসদা, SFI কর্মী, এ বছরের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। গতকাল সন্ধ্যায় তার বাবা, তার রাজনৈতিক প্রথম কমরেড সোম হাঁসদা'কে আকস্মিকভাবে হারিয়েছে। তার সহযোদ্ধারা সমস্ত ব্যবস্থা করে বর্ধমান হাসপাতাল থেকে যখন তার বাবার মৃতদেহ বাড়ি পাঠালো তখন আউশগ্রামের শোকাডাঙায় ঘড়ির কাঁটাতে রাত্রি ৮ টা ছুঁই ছুঁই। আদিবাসী নিয়ম অনুযায়ী রাত্রে মৃতদেহ শশ্মানে নিয়ে যাওয়া যায়না, স্বাভাবিকভাবেই পরেরদিন সকাল মানে আজ সকালে দাহ করা হয়েছে। বাড়িতে বাবার মৃতদেহ আসার সাথে সাথেই সীমা, তার মা ও দুই ছোট ছোট বোন যেভাবে কান্নায় যন্ত্রণায়, পরিবারের একমাত্র অবলম্বনকে হারানোর বেদনায় যেভাবে মাটিতে লুটিয়ে যাওয়ার কথা তেমনই লুটিয়ে পরছিলো। মুর্ছা যাচ্ছিলো ঘনঘন। বাবার মৃতদেহতে ফুলের মালা দিতেও দিচ্ছিলো না।
পাশে ডেকে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলাম- "হ্যাঁ রে পরীক্ষা দিবি তো কাল?? " প্রথমবার উত্তর দিলো -"দাদা বাবা আমার সাথে প্রথমদিন যাবে বলেছিলো, আজ বাবা চলে গেল, কী করে পরীক্ষা দেব দাদা, আমি পরীক্ষা দিতে পারবো না।" দ্বিতীয়বার আবারও কাচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করলাম -"তোর বাবা চেয়েছিলো তুই ভালো করে পড়াশোনা কর, বড় হ, চাকরি কর," আজ বাবা চলে গেছে বলে বাবার সেই স্বপ্নটা পূরণ করবি না? পরীক্ষা তোকে দিতেই হবে, আমি কাল সকালে নিয়ে যাবো তোকে," (আমি জানি কথাগুলো বলে দেওয়া যতটা সহজ, কথাগুলো গ্রহণ করা আর বুকের প্রতিটি পাঁজর দুমড়ে যাওয়া একই ব্যাপার), তবে জানিনা মেয়েটি কি বুঝলো, চোখের জল মুছে বললো -"ঠিক আছে দাদা পরীক্ষা আমি দেব।"
তারপর সারারাত বাবার মৃতদেহ পাহারা দিয়েছে আর হাউহাউ করে কেঁদেছে, খাবার বলতে দু এক গ্লাস জল। সকালে উঠে স্নান করে নিয়েছে, বইয়ের ব্যাগে গুছিয়ে নিয়েছে প্রয়োজনীয় পেন, স্কেল, পেন্সিল, রেজিস্ট্রেশন, অ্যাডমিট কার্ড। ৯ টায় রিপোর্টিং টাইম, স্বাভাবিকভাবেই ৭ঃ৫০ এ বাড়ি থেকে বেরোয় সীমা। তখনও বাবার মৃতদেহ মাটির উঠোনে শুয়ে, আসার সময় বাবার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে হাউহাউ করে কেঁদে নেয়। পরীক্ষা হলে পৌঁছোয়, পরীক্ষা দিতে বসে। তারপর জানতেও পারেনা বাবার মৃতদেহ কখন শশ্মানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, মা এর জ্ঞান ফিরেছে কি'না, ছোটবোন কোথায় কাঁদছে, কি করছে, কিচ্ছু জানতে পারেনা সীমা। প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে খাতায় উত্তর লিখতে থাকে। হয়তো বাবার বাম হাত যখন পুড়ছিলো সীমা তখন রবীন্দ্রনাথের কোন ছোট গল্পের উত্তর লিখছিলো, বাবার নাভিকূন্ড যখন পুড়ছিলো তখন লিখছিল জীবনানন্দের কোন অকাল শ্রাবণের কবিতার লাইন। পরীক্ষা শেষ হয়, সীমা বেরিয়ে আসে, মুখচোখ বিধ্বস্ত, জিজ্ঞেস করি কেমন হলো? ঠোঁটের কোণে একফালি হেসে বলে -"সাহিত্যের ইতিহাস থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর শুধু পারিনি দাদা।"
সীমা খুব ভালো সংগঠক, এক ডাকে পাড়ার মেয়েদের জড়ো করার অসাধারণ দক্ষতা তার। অসাধারণ রবীন্দ্রনৃত্যে পারদর্শী, তেমনই কবিতা পাঠ করে। এমনিই এ লেখাটি আজ লিখতে ইচ্ছে হলো, সীমার এই গল্প আমাদের সকলের কাছে শিক্ষণীয় হতে পারে, আমরা যারা প্রেম হারিয়ে, স্বপ্ন হারিয়ে, অর্থ হারিয়ে ভাবি জীবনে আমাদের সব শেষ, আমরা কিছু পারবো না আর। তাদের জন্য সীমা হাঁসদার লড়াই মাইলফলক হয়ে থাক....
লাল সেলাম কমরেড
লাল সেলাম 🌹🥰
অতনু🌿
লিখেছেন অতনু ঘোষ।