03/06/2026
গরিফা রেল জমির প্রায় ৫০০ পরিবারের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা
পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয় - আইনি ও গণআন্দোলন জোরদার করছে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন
গরিফা রেল স্টেশন সংলগ্ন রেলের জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী প্রায় ৫০০ পরিবারের ওপর উচ্ছেদের খাঁড়া নেমে এসেছে। এই বসতি নৈহাটি পৌরসভার ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড জুড়ে বিস্তৃত। এলাকায় ছোট ছোট ঘরবাড়ির পাশাপাশি রয়েছে ক্লাব, মন্দির, মসজিদ, আইসিডিএস কেন্দ্র, একটি বৃদ্ধাশ্রম এবং কিছু ছোট দোকানঘর।
বাসিন্দাদের দাবি, এই বসতির অধিকাংশ পরিবার ৪০-৫০ বছর, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ৬০-৭০ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এই জনবসতিতে বর্তমানে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ বসবাস করেন। এলাকাটি রেললাইন ও স্টেশন থেকে যথেষ্ট দূরে অবস্থিত হওয়ায় রেল চলাচল বা যাত্রীদের যাতায়াতে কোনো বাধা সৃষ্টি হয় না।
অধিকাংশ বাসিন্দাই গরিব ও ভূমিহীন শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দিনমজুর, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, হকার, রিকশাচালক, টোটোচালক, গৃহশ্রমিক, জুটমিল শ্রমিক, দোকান কর্মচারী প্রমুখ। এলাকার বহু মহিলা বাড়িতে বসে রবার ছাড়িয়ে সুতো তৈরির কাজে যুক্ত। এছাড়া এখানে বহু শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী এবং অন্তঃসত্ত্বা মহিলা বসবাস করেন। এলাকার পড়ুয়ারা স্থানীয় স্কুলগুলিতে পড়াশোনা করে। উচ্ছেদ হলে তাদের শিক্ষা ও জীবিকা উভয়ই বিপর্যস্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা।
বাসিন্দাদের অনেকের কাছেই ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ড, বিদ্যুৎ বিল, স্কুলের নথি, ইএসআই কার্ড এবং পরিবারের মৃত সদস্যদের মৃত্যুসনদসহ বিভিন্ন সরকারি নথি রয়েছে। বহু পরিবারের নাম একই ঠিকানায় বছরের পর বছর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এমনকি ২০০২ সালের ভোটার তালিকাতেও বহু বর্তমান বাসিন্দা অথবা তাঁদের পিতা-মাতার নাম ওই ঠিকানায় নথিভুক্ত রয়েছে।
সম্প্রতি Eastern Railway, Howrah Division-এর নামে একটি ‘Special Notice’ এলাকায় টাঙানো হয়েছে। ওই নোটিশে ১৩ জুনের মধ্যে জমি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অন্যথায় উচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে। তবে বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনো পরিবারকে ব্যক্তিগতভাবে নোটিশ দেওয়া হয়নি। নোটিশে কোনো ব্যক্তির নাম, ঘর নম্বর, কেস নম্বর, Estate Officer-এর নাম, শুনানির তারিখ বা Public Premises (Eviction of Unauthorised Occupants) Act, 1971-এর কোনো ধারা উল্লেখ করা হয়নি।
বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রায় সাত-আট বছর আগে রেল কর্তৃপক্ষ ওই অঞ্চলে জমি মেপে সীমানা নির্দেশক খুঁটি পুঁতেছিল। কিন্তু তখন বা পরে কখনও উচ্ছেদের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি বিদ্যুৎ ও জলের সংযোগ নেওয়ার সময়ও কোনো আপত্তি তোলা হয়নি।
বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, কোনো পরিবারভিত্তিক সমীক্ষা করা হয়নি এবং পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়নি। তাঁদের বক্তব্য, বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে স্বল্প সময়ের মধ্যে উচ্ছেদ করা মানবিক ও সামাজিক দিক থেকে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করবে।
রেলের নোটিশ প্রকাশের পর থেকেই সিপিআই(এমএল) লিবারেশন উদ্যোগে বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। শুরু থেকে পাশে দাঁড়িয়েছেন নৈহাটি নাগরিক উদ্যোগের বন্ধুরা।
বর্তমানে রেল ও প্রশাসনের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে গণস্বাক্ষর-সম্বলিত স্মারকলিপি প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাসিন্দাদের নথিপত্র সংগ্রহের কাজও শুরু হয়েছে। “পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়” এই দাবিতে ইতিমধ্যে সভা, মিছিল ও প্রচার কর্মসূচি সংগঠিত হয়েছে এবং বিভিন্ন বামপন্থী দলগুলিকে সাথে নিয়ে নাগরিক কনভেনশনের প্রস্তুতিও চলছে।
এই পরিস্থিতিতে ৩ জুন গরিফা রেল জমির চারজন বাসিন্দাকে আবেদনকারী করে কলকাতা হাইকোর্টে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অবিলম্বে উচ্ছেদ স্থগিত এবং পুনর্বাসনের দাবিতে আবেদন জানানো হয়েছে। মামলায় আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করছেন বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামিম আহমেদ।
সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ রুখতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি গণআন্দোলনও আরও জোরদার করা হবে।