12/08/2026
“মুসলিমরা শিক্ষায় পিছিয়ে, চাকরিতে পিছিয়ে”—এই কথাটা শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত। এখনও শুনতে হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন পিছিয়ে?
যেটুকু পিছিয়ে থাকা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম মাধ্যম ছিল OBC সংরক্ষণ। এই সংরক্ষণের সুযোগের মাধ্যমে বহু পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর ছেলে-মেয়েরা শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সামনে আসার সুযোগ পেয়েছিল।
তারপর এল ৭৭টি জনগোষ্ঠীকে OBC তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়। সেই ৭৭টির মধ্যে ৭৫টি মুসলিম জনগোষ্ঠী। আদালতের রায়ের পর অবশ্যই বিষয়টি আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সমাধান হওয়া উচিত। কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন—
যদি বলা হয়, নতুন করে সমীক্ষা করে প্রকৃত সামাজিক ও শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা যাচাই করা হবে, তাহলে সেই সমীক্ষা কোথায়?
আমার বিশ্বাস, সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে সমীক্ষা হলে ওই ৭৫টি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই আবার OBC-এর যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। কারণ তাদের সামাজিক, শিক্ষাগত ও আর্থিক অবস্থার বাস্তব চিত্র এখনও এমন নয় যে সংরক্ষণের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।
আগের সরকার যে সমীক্ষা করেছিল, সেই প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে বহু জনগোষ্ঠী OBC তালিকায় জায়গা পেয়েছিল। নতুন সরকার সেই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেনি—এটাও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যদি নতুন করে সমীক্ষাই না হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই সাধারণ মানুষগুলো, যাদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
একদিকে বলা হবে—
“মুসলিমরা শিক্ষায় পিছিয়ে।”
“মুসলিমরা চাকরিতে পিছিয়ে।”
“মুসলিমদের আরও এগিয়ে আসতে হবে।”
অন্যদিকে যখন তারা এগিয়ে আসার জন্য সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত একটি সুযোগ পায়, তখন সেই সুযোগটিই যদি কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং নতুন করে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করার উদ্যোগও না নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—
তাহলে পিছিয়ে থাকা মানুষগুলো এগোবে কীভাবে?
পিছিয়ে থাকার কারণ নিয়ে বক্তৃতা হবে, পরিসংখ্যান দেখানো হবে, বিভিন্ন রিপোর্টের কথা বলা হবে। কিন্তু পিছিয়ে থাকা মানুষকে এগিয়ে দেওয়ার বাস্তব সুযোগগুলো যদি একে একে সংকুচিত করা হয়, তাহলে সেই পিছিয়ে থাকাটাই তো স্থায়ী হয়ে যাবে।
পিছিয়ে থাকার অভিযোগ থাকবে,
এগিয়ে যাওয়ার পথটাও বন্ধ থাকবে—
এ কেমন দ্বৈতনীতি?
আর একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার—
এখানে কেউ হিন্দু-মুসলিমের চশমা পরে বিষয়টি দেখবেন না।
আমি বর্তমান পরিস্থিতির একটি সামাজিক ও নীতিগত প্রশ্ন তুলছি। যে জনগোষ্ঠীই সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে থাকুক, তাদের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে সংবিধানসম্মত সুযোগ দেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আজ যদি কোনও মুসলিম জনগোষ্ঠী পিছিয়ে থাকে, তার পিছিয়ে থাকাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করে তাকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নতির সুযোগ দিতে হবে। একইভাবে কোনও হিন্দু, আদিবাসী, দলিত বা অন্য কোনও জনগোষ্ঠী পিছিয়ে থাকলেও তাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
সংরক্ষণ কারও দয়া নয়।
এটি সামাজিক ও শিক্ষাগত বৈষম্য কমানোর একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা।
তাই আমার প্রশ্ন খুব সাধারণ—
৭৫টি মুসলিম জনগোষ্ঠী যদি সত্যিই পিছিয়ে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করে তাদের যোগ্যতা যাচাই করতে আপত্তি কোথায়?
যোগ্য হলে OBC-তে ফিরবে।
যোগ্য না হলে ফিরবে না।
কিন্তু সমীক্ষাই না করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া—এটা কি সত্যিই পিছিয়ে থাকা মানুষকে এগিয়ে দেওয়ার নীতি?
যারা বলেন, “মুসলিমরা পিছিয়ে আছে”, তাঁদের কাছে বিনীত প্রশ্ন—
তাহলে তাদের এগিয়ে আসার পথটুকুও বন্ধ করে দেবেন কেন?
পিছিয়ে থাকার দায় দেখিয়ে যদি বারবার তাদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, অথচ উঠে দাঁড়ানোর সিঁড়িটা সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে একদিন প্রশ্ন করতেই হবে—
“পিছিয়ে থাকা মানুষকে এগিয়ে দিতে চান, নাকি শুধু পিছিয়ে থাকার অভিযোগটাই বাঁচিয়ে রাখতে চান?”
লিখেছেন মুজতবা হাসান দাদা