17/11/2016
ঘরে্র বাঁশি
নয়ন ঘোষ একজন বিবাহিত তরুণ দুধওয়ালা । সেই কাকভোরে বাড়ি থেকে বেরোয় । নানা বাড়ি আর দোকানে দুধ দিয়ে দুপুর একটার পর বাড়ি ফিরে আসে । তারপরেই নয়নের মুখ-ভার । মুখ দিয়ে আর কথা বেরোতে চায় না । স্বামীকে দেখে খুব অবাক হয় মালতী ।
জিজ্ঞেস করে নয়নকে,''কী হল গো ? অমন করে আছো কেন ?''
নয়ন খুব কষ্টে উত্তর দেয়,''কিছু ভালো লাগে না গো ।''
অথচ সেই সকালে নয়ন যখন বাড়ি থেকে বার হয়,তখন ওর এক-মুখ হাসি থাকে । দেখে খুব খুশী হয় মালতী ।
বলে হেসে,''সারাদিন আমাকে মনে রেখো কিন্তু ।''
নয়ন ওর চিবুক ধরে মিষ্টি হেসে বলে,''আরে,পাগলী । ভুলি কখনো ?''
তারপর নয়ন বলে মালতীকে স্মিত হেসে,''আসলে ঘরটা একটা গণ্ডী । কত আর কথা হয় । কতকিছু জানি বাইরে গেলে । কত মানুষের সাথে পরিচয় হয় । তাই ফিরে এলে মনটা খুব খারাপ লাগে ।''
ওর কথা শুনে মালতী মৃদু হেসে বলে,''তাই বুঝি ? আমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না তোমার ফিরে এলে ? বেশ তো । আমাকেও শুনিয়ো বাইরের কথা । আমিও কিছু শিখতে চাই । জানতে চাই ।''
কিন্তু নয়ন বাইরের কোন কথা কখনো বলেনি মালতীকে । একথা ভেবে মালতী খুব কষ্ট পায় ।
নতন বলে মালতীকে,''সব কথা কি বলার মতো তোমাকে ?''
মালতী তখন বিষণ্ণ-মুখে,''যেদিন বলার মতো হবে,সেদিন বল ।''
কিন্তু সে বলা আর নয়নের হয় না । দিন বয়ে যায় দিনের নিয়মে ।
এমন করেই চলছিলো নয়ন-মালতীর দিন । মালতী শান্ত-প্রকৃতির মেয়ে । কখনো ওকে রাগেতে বা উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না কখনো । তাতে নয়ন খুব খুশী ।
প্রায় বলে,’’তোমার মতো বৌ এখন দেখাই যায় না ।‘’
শুনে মৃদু-মৃদু হাসে মালতী । কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় ও ।
সেদিন দুপুরের পর নয়ন বাড়ি ফিরল । ওর অশ্রু-সজল চোখ সেদিন । দেখে মালতী যারপরনাই বিস্মিত ।
জিজ্ঞেস করলো,’’কী হয়েছে তোমার ? চোখে জল কেন ? এমন তো হয় না ।‘’
শুরুতে নয়ন কিছুই বলতে চাইলো না । কিন্তু মালতী সেই প্রথম ওকে চেপে ধরল ।
বেশ মেজাজের সঙ্গে বলল নয়নকে,’’আমি কিছুই শুনতে চাই না তোমার কাছে । আজ কিন্তু তোমাকে বলতেই হবে ।‘’
তার কিছু পরে নয়ন গামছা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলতে থাকলো,’’আমি তো রোজ কথা বলি সুনীল চৌধুরীর বৌয়ের সঙ্গে । সেও আমার সাথে হেসে-হেসে কথা বলে অনেক সময় ধরে । কিন্তু আজ সুনীল চৌধুরী তার বৌকে এমন বকে দিলো যে সে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে চলে গেলো । আমার দিকে সুনীল চৌধুরী কটমট করে তাকাতেই আমি দুধ না দিয়েই সাইকেল নিয়ে ছুট দিলাম । বাচ্চাটা আজ দুধও পেলো না । আমি তারপর আর কোথাও যাইনি । একদম তোমার কাছে চলে এলাম ।‘’
নয়নের কথা শুনে মালতী তখন হেসে আর বাঁচে না । হাসিও থামে না ওর । তা দেখে নয়ন ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলে ।
তখন মালতী ওর হাত দুটো ধরে বেশ শান্ত-গলায় এক-মুখ হেসে বলে নয়নকে,’’তুমি বাইরে সবার কাছে দুধওয়ালা । তার বেশী কিছু নিজেকে ভেবো না । আজ থেকে বুঝতে পারলে তো ? শুধু আমার কাছে তুমি প্রেমিক । তুমি ঈশ্বর । তুমি আমার সারাপথের সঙ্গী । এরপর আমার আর কিছু বলার নেই । ঘরে এসো । সব কষ্ট ভুলে নতুনভাবে জেগে ওঠো । আর একটা নতুন সকাল আসুক তোমার জীবনে । একেবারে অন্যরকম হোক সে সকাল ।‘
’
অভিভূত-আপ্লূত নতন তখন মালতীকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোর-ধারে কাঁদতে থাকলো । সে দৃশ্য দেখে বুঝি অন্তরীক্ষ থেকে কে অচিনপুরুষ তখন পুষ্পের মতো বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ঝরাতে শুরু করে দিলো ।