19/11/2020
ইংরেজী ভাষায় একটা প্রবচন আছে – “The whiter the bread, the sooner you’re dead”, অর্থাৎ রুটি (প্রকারান্তরে ভাত) যত সাদা হবে আপনি তত তাড়াতাড়ি মারা যাবেন। ভাত সাদা হবে না-তো কী লাল হবে? ভ্রূ কুচকে গেলেও প্রস্তাবটা তেমনই। কিছু কিছু দেশে লাল ভাতের কদর সাদা ভাতের চেয়ে বেশী। চীনদেশে ও থাইল্যান্ডে লালভাতের চাহিদা আছে। শ্রীলঙ্কায় পাঁচতারা হোটেলেও ভাত চাইলে মণ্ডের মত লালভাতই পাওয়া যাবে। অন্যান্য তৃণভোজী প্রানীরা ঘাসপাতা বেছে খেলেও শস্যদানা এযাবৎ আস্তই খেয়ে এসেছে, এখনও তাই খায়। বেশী বুদ্ধিমান প্রানী হিসেবে মানুষ প্রথম কি করেছিলো জানা নেই। কালের বিবর্তনে মানুষ ক্রমশঃ ঘাস জাতীয় গাছের বীজ অর্থাৎ ধান ও গমের খোসা ছাড়িয়ে খাবারের স্বাদ পেয়ে গেল। এতে যদিও খাবার চিবানো আর হজম করা সহজ হল আর শস্যবীজের খোসার মধ্যে থাকা তেল জাতীয় পদার্থের বর্জনের ফলে শস্যবীজের অধিক সময়ের জন্য সংরক্ষনের সুবিধা হয়ে গেল। তেল জাতীয় পদার্থ মিশ্রিত শস্যদানার গুঁড়ো হাওয়ার সংস্পর্শে এলে বেশীদিন অবিকৃত থাকে না। একবিংশ শতাব্দীর উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী মানুষের খাবারের টেবিলে ৫০ থেকে ৮০ শতাংশই শস্যবীজের দখলে। প্রাতরাশের রুটি, পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, স্যান্ডউইচ বা গ্রামবাংলার পান্তা; মধ্যাহ্নভোজের ভাত বা রুটি; বিকালের জলখাবারের মুড়ি, বাদাম, চপ, কাটলেট, পিৎজা, পাস্তা; আর রাতের খাবারের রুটি বা ভাত — এই গুলোই খাবারের প্রধান অংশ। সঙ্গের পদগুলো বৈচিত্র্যময় হলেও পরিমাণের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাধান্য পায় না। ভাত বা রুটি আমাদের প্রধান খাবার; যদিও পৃথিবীর কোন কোন জনগোষ্ঠীর খাবারের থালায় মাঝেমধ্যে প্রধান খাদ্য হিসেবে আলুর দেখা মেলে। তা সে চালই হোক বা গমই হোক, ঘাস জাতীয় শস্যদানার অবিকৃত গঠন একই রকম।
বর্তমানে প্রচলিত ধান থেকে চাল বানানোর মেশিনে ধানের বাইরের খোসা (ব্রান) আর মধ্যবর্তী অংকুর বা বীজযুক্ত আবরণ (জার্ম) ছাড়িয়ে ভেতরের সাদা (এন্ডোস্পার্ম) অংশটি মানুষের খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের জন্য আলাদা করা হয়। চাল ও আটার সওদাগরেরা প্রায় ২৫ ধরণের রাসায়নিকের সন্ধান জানেন যার দ্বারা এরপরে একে আরও চকচকে, লোভনীয় ও সুস্বাদু বানানো হয়। কালো মেয়ের মুখে ক্রিম মেখে ফ্যাটফেটে সাদা হবার অপ্রয়োজনীয় প্রচেষ্টার মতই মুড়িতে ইউরিয়ার প্রলেপ মাখিয়ে আর লাল ও কালো চালের বাইরের আবরণকে ঘষে-মেজে রাসায়নিকের পলেস্তারা লাগিয়ে আমার আপনার কৃপাদৃষ্টির অপেক্ষায় শপিং মলে শোভা পায়।
ধান গাছের নিজের বংশবৃদ্ধির জৈবিক প্রয়োজনের অংকুরটি হল মাঝের “জার্ম” অংশটি। তাকে রক্ষা করার জন্য ও অঙ্কুরোদগমের সময় প্রয়োজনীয় ভিটামিন যোগায় বাইরের খোসাটি (ধানের তুষ) । ভেতরের সাদা যে অংশটি আমরা চাল হিসাবে বেছে নিই সেটা মামুলি ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টিগুণ বর্জিত নিছক শর্করা বা এম্পটি ক্যালোরি। ধানের তুষে বাইরের খোসার সাথে উপকারী ও ভক্ষনযোগ্য মাঝের প্রাক-অঙ্কুর (জার্ম) থাকে। চালকে দেখনদারী করার জন্য ও বেশিদিন সংরক্ষণ করার জন্য ধানের মাঝের প্রাক-অঙ্কুর অংশটি আধুনিক জনপ্রিয় ধান-ভাঙ্গার মেশিনে ছেঁটে ফেলে দেওয়া হয়। সৌভাগ্যের বিষয়, ঢেঁকি-ছাটা চালে এই উপায় থাকেনা। তাই ঢেঁকি-ছাটা চাল মহার্ঘ। এটা কে না জানে, মহার্ঘ জিনিস উত্তম হয়। ঢেঁকি-ছাটা চালে থাকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বর্ম হিসাবে ফাইবার, ভিটামিন আর প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ।
শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট অপেক্ষাকৃত সস্তা আর আসক্তি উদ্রেককারী খাবার। তাই সহজে আমাদের খাবারে বড় অংশের অংশীদার হয়ে পড়ে। যত চকচকে সুদৃশ্য লম্বাদানার পালিশ করা পরিশোধিত চালের ভাত হবে, পেট ভরানোর জন্য তত বেশী পরিমানের ভাতের প্রয়োজন হবে আর তাড়াতাড়ি হজম হয়ে আবার খিদে পাবে। শর্করা জাতীয় খাবারে আসক্তি আমাদের অগোচরে ঘটে যায়। মিষ্টির দোকানের প্রতি আকর্ষন একরকমের প্রাদুর্ভাবের মত আমাদের আগ্রাস করেছে যদিও এটা আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি নয়। ঘটনাচক্রে শর্করা জাতীয় খাবারের প্রতি এই আসক্তি সচেতন পশ্চিমী দুনিয়ার প্রতিপত্তিবান নাগরিকদের চেয়ে আমাদের মত গরিব দেশগুলোর (ধনী দরিদ্র সবার) মধ্যে বেশী পরিমানে দেখা দেয়। আমাদের মত গরিব গুর্মোর দেশে “ভিক্ষার চাল কাড়া না আকাড়া” এই ধরণের তর্কের অবকাশ আছে। সস্তার খাবার হিসাবে শর্করা আমাদের প্রয়োজন, মুস্কিল হয় এতে আসক্তি জন্মে গেলে। শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ার জন্য খাদ্যে অন্যান্য খাদ্যাংশের মত নির্দিষ্ট পরিমাণে শর্করাও প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যকর আর সুষম শর্করা জাতীয় খাবার নির্বাচনের সময় আমাদের দুটো বৈশিষ্ট্যের কথা মনে রাখতে হবে।
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (Glycemic index, GL):
শর্করা জাতীয় খাবারের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম অনুযায়ী শর্করা জাতীয় খাবার মানুষের পৌষ্টিকতন্ত্রের অন্ত্রের মধ্যে সরল শর্করায় পরিণত হওয়া ও রক্তে শোষিত হবার ক্ষমতা কম বা বেশী হয়। গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স তারই এক মাপকাঠি। বিশুদ্ধ গ্লুকোজের রক্তে শোষিত হবার ক্ষমতাকে ১০০% ধরে অন্যান্য শর্করার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বোঝানো হয়ে থাকে। পূর্ণদানার (whole grain) বার্লি, ওট, রাই ইত্যাদির মত অধিক পরিমানে ফাইবার বা “হজম না হওয়া” শর্করা সমৃদ্ধ খাদ্যের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। সাদা চালের ভাতের চেয়ে লাল ও কালো চালের ভাতেরও গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। চিনি, সাদা আটা, ময়দা, চকচকে সাদা পালিশ করা সরু চাল ইত্যাদির গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স ৮৫ শতাংশের কাছাকাছি হলেও লাল ও কালো চালের ভাতেরও ক্ষেত্রে সেটা যথাক্রমে ৫৫ ও ৪২ শতাংশ। গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স খাবার অব্যবহিত পরে রক্তে শর্করার মাত্রা নির্ধারণ করে, কিন্তু মোট শর্করা শোষিত হবার পরিমাণ নির্ধারণ করে না। সেটা নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন হয় “গ্লাইসেমিক লোড” নামে আরেক মাপকের।
গ্লাইসেমিক লোড ( Glycemic load, GL):
শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ করার পরে, রক্তে মোট শর্করা বৃদ্ধির পরিমাণ নির্ভর করে খাবারে হজমযোগ্য শর্করার পরিমাণ ও তার গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্সের ওপর। খাদ্যের শর্করা জাতীয় খাবারের আনুপাতিক পরিমাণের সংগে গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স গুণ করে গ্লাইসেমিক লোড নির্ণয় করা হয়। এটা সহজবোধ্য, সাদা চকচকে পালিশ করা চালের ভাতের চেয়ে লাল আর কালো চালের ভাতের গ্লাইসেমিক লোড যথেষ্ট কম। এটা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, সুগারের রুগীদের পক্ষে খুব উপকারী। আক্ষেপের কথা, বিজ্ঞাপনের প্রভাবে বিদেশী ও দামী ওট-মিল সহজেই কিনে নিয়ে আসেন, ছাপোষা হরিপদ কেরানি। কেবল প্রধান খাদ্য শস্যের বেলায় চিঁড়ে, মুড়ি, ছাতু আর ঢেঁকি ছাঁটা লাল ও কালো বাদামী চাল ব্রাত্য হয়ে যায়। যদিও বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, অতীতে চিনের রাজবংশের একচেটিয়া অধিকার ছিল যথেষ্ট কম, ৪২ শতাংশের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ওয়ালা, ফাইবার ও ভিটামিন সমৃদ্ধ কালো চালের ভাতে। সাধারণ মানুষ তার নাগাল পেতনা। কালো চালের ভাতে বোনাস হিসাবে থাকে কোভিড অতিমারির কারণে জ্ঞাত হওয়া প্রয়োজনীয় জিঙ্ক আর ভিটামিন হিসাবে রাইবোফ্ল্যাভিনের উপস্থিতিতে।
এক বা দুই পুরুষ আগেও খাবারের থালায় ঢেঁকিছাঁটা চাল থাকতো, প্রাতরাশে চিড়ে, মুড়ি, থাকতো। স্বাস্থ্যহানিকর বিস্কুট, পাউরুটি ও অজস্র বেকিং করা খাবার, চটজলদি খাবার, মেশিনে ছাঁটা সুদর্শন সুঘ্রাণযুক্ত চালের ভাত আমাদের খাবারের মূখ্য অংশ। ইদানিং কালে যে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগের বাড়বাড়ন্তের কথা শোনা যাচ্ছে তার প্রধাণ কারন বিকৃত খাদ্যাভ্যাস। আঠারোশো খ্রিস্টাব্দে বিদেশে যন্ত্রচালিত ধান ও গম ভাঙা কলের আবিষ্কার হয়েছিলো। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে সেই প্রযুক্তি আমাদের গ্রাস করে আমাদের খাদ্যাভ্যাস পালটে দিয়ে। বংশ পরম্পরায় আমাদের রোগ সৃষ্টিকারী জিনের পরিবর্তন করে আমাদেরকে দুনিয়ার সবচেয়ে হৃদরোগের ও ডায়াবেটিসের মত মারণ রোগের উপযোগী করে তুলেছে। আরও কারণ আছে, তবে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা মূখ্য। আমরা পেটে যা ঢোকাচ্ছি, তাই দিয়েই তৈরী হচ্ছে আমাদের পার্থিব এই শরীর। কখনো কখনো পরিশোধিত শস্যদানা বা তার থেকে প্রস্তুত খাদ্যবস্তুতে অতিরিক্ত ভিটামিনের অন্তর্ভুক্তির (enriched, fortified) কথা বলা হয়ে থাকে। সেটা পরিমাণে প্রাকৃতিক পরিমাণের চেয়ে কম ও মানের দিক দিয়ে সেগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের।এখন বাজার ব্রাউন পাউরুটিতে ছেয়ে গেছে, তারমধ্যে অধিকাংশই কেবল রঙ করা সাদা পাউরুটি মাত্র।
লিখেছেন ডাঃ গৌতম মিস্ত্রি।