17/09/2024
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দূর্গাপূজা। নীল আকাশে ইতিউতি মেঘের ভেলা উঁকি দিতে শুরু করেছে, আকাশে কাশ ফুলের দোলা, বাগানে শিউলির কুঁড়ি জানান দিচ্ছে পুজো আর বেশি দূরে নেই। মা আসছেন, এখন বাঙালির আনন্দে মেতে ওঠার সময়, উৎসবের আনন্দে গা ভাসিয়ে দেওয়ার সময়। অথচ আমরা কোথাও যেন থমকে দাঁড়াচ্ছি! যেন পেরেও পেরে উঠছি না! বার বার চেতনে অবচেতন ৯ ই আগস্ট ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ নৃশংসতা র আমাদের মানবিকতা কে তীব্রভাবে আঘাত করেছে। শুধু মনে হচ্ছে কি দোষ ছিল তার?
একটিবারের জন্য চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো সেই সময়ের কথা, মেয়েটি কত ই না যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, চিৎকার করেছিল, একটু সাহায্য প্রত্যাশা করেছিল, চেয়েছিল হয়ত একটু মিরাকল, বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে শুনেছি চোখ দিয়ে নাকি রক্ত ও গড়িয়েছিল! সন্ত্রাসের মুখোমুখি হয়ে তিলোত্তমা তীব্রতম যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন হয়ে শান্ত হয়ে দৃষ্টি তার স্থির হয়ে গিয়েছিল, মানুষ এরকম ও করতে পারে! নিজেকে রাখুন তো সেই বাবা মা এর জায়গায়, সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে নিজেদের একমাত্র মৃত মেয়েকে চোখের দেখা পর্যন্ত দেখতে পারেনি। ভুল বললাম, দেখতে দেওয়া হয়নি, তাঁদের মতামত কে গ্রাহ্য না করে তড়িঘড়ি শরীরটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল। তিলোত্তমা পুড়েছে, এক অসহায় কন্যা পুড়েছে, এক মা পুড়েছে, মনুষ্যত্ব পুড়েছে, পুড়েছে মানবিকতা। মানুষ হিসাবে নিজেকে ঘেন্না লাগছে, রাগ হচ্ছে.... আর ভয় করছে।
অনেকে প্রশ্ন করবে, এরকম ঘটনা কি আগে হয়নি না আর কোথাও হচ্ছে না! তখন তো প্রতিবাদ করিস না। হ্যাঁ ঠিক, এই নারকীয় আদিম যুগীয়, মধ্যযুগীয় বর্বরতা অতীতে ও হয়েছে, এখনও হচ্ছে। করি অথবা না করি তাতে এই ঘৃন্যতম জঘন্য কাজের জন্য কোনো নিন্দা ই যথেষ্ট নয়! কিন্তু এক্ষেত্রে এই ঘৃন্যতম কাজের সাথে সাথে যুক্ত হয়েছে অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য প্রমাণ লোপাটের ঘৃণ্য চক্রান্ত। আর এখানেই দরকার প্রতিবাদ, এখানেই দরকার We Want Justice বলে তারস্বরে চিৎকার! ঘটনাস্থল কারা দাপিয়ে বেরিয়েছিল আর কারা কারা প্রমাণ লোপাট করেছিল তা ধীরে ধীরে সামনে আসছে, হয়ত ভবিষ্যতে আরো আসবে। কিন্তু যতদিন না পুরো ঘটনা সামনে আসবে, যতদিন না অপরাধীদের শাস্তি হবে, বিচারের দাবীতে রাজপথ, গলিপথ, আলপথে "We Demand Justice" আন্দোলিত হবেই হবে। জানি, অনেকেই মেনে নিতে পারে নি আমাদের। বাঙালি কাঁকড়ার জাত, বাঙালিয়ানা ঘুচে গিয়েছে - বলা মানুষজন বুঝতে পারেনি কোকোকোলার গ্লাসে সিপ্ দেওয়া বাঙালি হঠাৎ জ্বলে উঠবে, তারা ভুলে গিয়েছিল এ জাতি নেতাজী, বিদ্যাসাগর, রামমোহন, বিবেকানন্দের উত্তরসূরি, যেভাবে হেসে আলিঙ্গন ও করে আবার সেভাবেই গর্জে ওঠে নিজের স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণায়, নিজের স্বাধীনতার চেতনে, স্বকীয়তায়। তাঁরা জানত না মৃত হয়েও তিলোত্তমা বাঙালিকে আবার জাগিয়ে দিয়ে যাবে, দলাদলি হানাহানি চেয়ার দখলের লড়াইয়ের মধ্যেও বেঁচে উঠবে আপনার আমার চোখের জল, বিনিদ্র রজনী আর তোমার স্বর, আমার স্বর - আর জি কর, আর জি কর!
আর আমরা খুব ভালোভাবেই জানি, এই সময়টা কিছু মানুষের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বড় ছোট ব্যবসায়ী থেকে প্রচুর প্রচুর খেটে খাওয়া গরীব মানুষ এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। এই সময়ে অর্জিত আয় তাঁদের ভবিষ্যতের সুখ দুঃখ নির্ধারণ করে। আমরা তাঁদের পাশে আছি, সর্বতোভাবে। আমাদের দুঃখের জন্য আমাদের বাড়ীর বয়স্ক আর বাচ্চাদের জামা কাপড় কিনে দেব না, তাঁদের বেলুন কিনে দেব না, মন্ডপে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে গিয়ে রোল চাউমিন খাওয়াব না এত টা অমানুষ আমরা হয়ে যাইনি। আর আসুন না, আমরা প্রত্যেক পাড়ার অথবা ক্লাবের পুজোয় একটু আড়ম্বর কমিয়ে, প্যান্ডেল - আলোকসজ্জায় খরচ বাঁচিয়ে ওই সমস্ত মানুষদের জন্য কিছু করি। আসুন না, আমাদের মাঠে জিনিসপত্র বিক্রি করার জন্য তাঁদের কাছ থেকে এবারের মত চাঁদা নেওয়াটা না হয় বাদ ই দি। মানুষ হিসাবে এটুকু তো করা যেতেই পারে, তাই না!
আর রইল মা দূর্গার কথা! যিনি মা, যিনি অন্তর্যামী তিনি আমাদের মনের কথা জানবেন না, হতে পারে কি! কোনো মা কি আড়ম্বর পছন্দ করবেন নিজের সন্তানদের মন:কষ্ট দেখে! আমরা, সন্তানেরা তাঁর আশায় বসে আছি, কে বলতে পারে স্বয়ং মা হয়ত আমাদের আশাতেই বসে আছেন!
তাই আসুন না, অন্তত এবারের মত আমরা না হয় আড়ম্বর, জাঁকজমক কে একটু দূরে সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র মা-য়ের আরাধনায় রত থাকি, প্রার্থনা করি তিলোত্তমা র সুবিচারের সেই দিনটির জন্য, যে দিনটিতে স্বয়ং মা ও যেন তিলোত্তমার কোলে মাথা দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যেতে পারেন।
- মানবিক - BHS '97 Friends Forever
বন্ধুত্বের বন্ধনে, ভালোবাসার আলিঙ্গনে..
সবাইকে করি আহ্বান 🙏🙏