13/09/2021
Thanks
আজ আলোচনা করব সনাতন ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ " মহামন্ত্র" কোনটি?
👉বেদের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামন্ত্র হলো " গায়ত্রী মন্ত্র " ।
সনাতন আইনশাস্ত্র তথা মানবজাতির প্রধান ধর্ম গ্রন্থ বেদ এবং অবশ্যপাঠ্য । কয়েকশতক আগেও বেদ শব্দটি ছিল প্রতিটি সনাতনিদের প্রাত্যাহিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত ।
কিন্তু সময়ের বিবর্তনে,অজ্ঞান তার করালগ্রাসে, ঔপনিবেশিকদের চক্রান্তে, তথাকথিত ধর্মপ্রচারক তথা ধর্মব্যবসায়ীদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে আমরা আজ মহান বেদের পথ থেকে দূরে সরে গিয়েছি । ফলস্বরূপ আমরা আজ জাতি হিসেবে এক ক্রান্তিলগ্নে দাড়িয়ে । জ্ঞানের অভাবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে অপমানের স্বীকার তো বটেই, নিজেদের প্রতিদিনকার জীবনযাপনেও অজ্ঞতার গ্লানিবয়ে নিয়ে চলেছি নিরন্তর
যেখানে পরমাত্মা বেদে বলেই দিয়েছেন -
★অংতি সন্তং ন জহাত্যন্তি সন্তং ন পশ্যতি।
দেবস্য পশ্য কাব্যং ন মমার ন জীর্যতি।
(অথর্ববেদ ১০.৮.৩২)
#সরলার্থঃ মনুষ্য সমীপবর্ত্তী পরমাত্মাাকে দেখেও না, তাহাকে ছাড়িতেও পারে না। পরমাত্মাার কাব্যকে (বেদকে) দেখ, তাহা মরেও না, জীর্ণও হয় না।
অর্থাৎ বেদ সকল যুগ ও কালের জন্য প্রযোজ্য । এর বাণী কখনো অপ্রাসঙ্গিক হয়না,অচল হয়না । বেদ মন্ত্র কলিযুগে নিষ্ক্রিয়-এ ধরনের অহেতুক প্রলাপ অনর্থক ।
বেদ সর্বযুগেই সমানভাবে প্রযোজ্য এবং তা সর্বদা আধুনিক । যেখানে বেদ বলছে এটা সব যুগের জন্য প্রযোজ্য সেখানে কতিপয় অজ্ঞানীদের এহেন আচরন হাস্যজনক ।
👉তেমনি বেদের মহামন্ত্র "গায়ত্রী মন্ত্র "
গায়ত্রী মন্ত্র বা গুরুমন্ত্র,একমাত্র মহামন্ত্র।
গায়ত্রী মন্ত্রের নামই গুরুমন্ত্র।'গুরু' অর্থ শ্রেষ্ঠ। মনুসংহিতা বলছে-
ওঙ্কারপূর্বিকাস্তিস্রো মহাব্যাহৃতয়েহিব্যায়াঃ
ত্রিপদা চৈব সাবিত্রী বিজ্ঞেয়ং ব্রহ্মণো মুখম।।
(মনু ২/৮১)
অর্থঃ পূর্বে ওঙ্কার এবং অবিনাশী মহাব্যাহৃতি(ভূঃ,ভুবঃ,স্বঃ) উচ্চারণপূর্বক ত্রিপদী গায়ত্রী হল ব্রহ্ম প্রাপ্তির একমাত্র উপায় বলে জানবে।
মনু ২/৮৩ বলছে সাবিত্র্যাস্ত পরং নাস্তি... অর্থাৎ গায়ত্রীর চেয়ে উৎকৃষ্ট মহামন্ত্র আর কিছুই নেই।
পবিত্র বেদের ৪ টি ভাগেই পরমাত্মা গায়ত্রী জ্ঞান প্রদান করেছেন এমন ই এই মহিমা।
সকল সনাতনীধর্মালম্বীদের জন্যেই এই মন্ত্রে উপনয়ন-দীক্ষা নেয়া নিয়ম বলে ঘোষণা করেছে বৈদিক সকল শাস্ত্র।
👉গায়ত্রী মন্ত্র-
তৎসবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি।
ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।।
তৈত্তিরীয় আরণ্যক (২। ১১। ১-৮) অনুযায়ী, গায়ত্রী পাঠের আগে ওঁ-কার, মহাব্যাহৃতি(ভূঃ,ভুবঃ,স্বঃ) উচ্চারণ করতে হয়।তাই একে পড়া হয় এভাবে-
ওঁ ভূ র্ভু বঃ স্বঃ
তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি।
ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।।
অনুবাদ - (ওঁম)পরমাত্মা (ভূঃ) প্রাণস্বরূপ (ভূবঃ)দুঃখনাশক ও (স্বঃ) আনন্দস্বরূপ। (সবিতুঃ) জগদুৎপাদক (দেবস্য) দিব্য গুণযুক্ত পরমাত্মার (তৎ) সেই (বরেণ্যম) বরণীয় (ভর্গঃ) শুদ্ধ স্বরূপকে (ধীমহি) ধ্যান করি।(য়ঃ) যিনি (নঃ) আমাদের (ধিয়ঃ) নির্ম্মল বুদ্ধি (প্রচোদয়াৎ) প্রেরণা দান করেন।
(ঋগ্বেদ ৩/৬২/১০।যজুর্বেদ ৩/৩৫,২২/৯,৩০/২, ৩৬/৩।
সামবেদ উত্তরার্চিক, প্রপাঠক ৩, অর্দ্ধপ্রপাঠক ৩, মন্ত্র ১০।)
ভাবার্থঃ হে পরমাত্মা। তুমি প্রাণস্বরূপ, প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তম এবং প্রাণের প্রাণ।সমস্ত প্রকারের দুঃখ বিনাশক এবং সুখস্বরূপ। সমস্ত জগতের অধিকর্তা এবং সর্বোত্তম বলে তুমিই একমাত্র বরণ যোগ্য। তোমার শুদ্ধস্বরূপ দিব্য জ্যোতিকে আমরা হৃদয়ে ধ্যান করি। হে ঈশ্বর! কৃপা করে অজ্ঞানতাজনিত পাপ দূর করে আমাদের হৃদয়ে নির্মল বুদ্ধির প্রেরণা প্রদান করো।
👉গায়ত্রী বেদের এবং সনাতন ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামন্ত্র। পরমাত্মার ধ্যানের জন্য গায়ত্রীই সিদ্ধ বৈদিক মন্ত্র। এই মন্ত্রের ঋষি বিশ্বমিত্র এবং দেবতা সবিতা।মহাঋষি বিশ্বামিত্র সর্বপ্রথম ধ্যানে এই মন্ত্রের মর্ম উপলদ্ধি করে প্রচার করেছিলেন। মন্ত্রের দেবতা বা বিষয় সবিতা অর্থাৎ জগৎ স্রষ্টা ব্রহ্ম। বেদারম্ভ সংস্কারে আচার্য এই মন্ত্রে ব্রহ্মচারীকে দীক্ষা দান করেন। এই মন্ত্রের ছন্দের নাম গায়েত্রী।
গায়ৎ--ত্রৈ (পালনে + ড কর্ত্তরি, স্ত্রীত্বে ঈপ্ = গায়েত্রী, "গায়ন্তং ত্রায়তে যস্মাৎ গায়ত্রী সা ততঃ স্মৃতা।" গানকারীকে ত্রাণ করে বলেই এর নাম গায়েত্রী। সমগ্র বেদের জ্ঞান সূক্ষ্ম ভাবে গায়েত্রী মন্ত্রে নিহিত আছে বলে একে বেদমাতা বলা হয়। গায়ত্রী মন্ত্রে দশটি শব্দ আছে ---- তৎ, সবিতুঃ, বরেণ্যম্, ভর্গঃ, দেবস্য, ধীমহি, ধিয়ঃ, য়ো, নঃ, প্রচোদয়াৎ।
গায়ত্রী ছন্দের তিন পাদ এবং তিনটি পাদই স্বতন্ত্রভাবে অর্থ প্রকাশ করে। তিন পাদে বিভক্ত করিলে মন্ত্রটি এরূপ হবে
১) তৎসবিতুর্বরেণ্যম। (২) ভর্গো দেবস্য ধীমহি। (৩) ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ। প্রত্যেক পাদে আটটি করে অক্ষর থাকবে কিন্তু প্রথম পাদে সাতটি অক্ষর আছে। মন্ত্রে মোট ২৪টি অক্ষরের স্থানে ২৩টি অক্ষর আছে। ইহাকে নিচৃৎ গায়ত্রী বলে। এক অক্ষর বেশী হইলে 'ভুরিক' গায়ত্রী বলা হত। তাই তিন-শব্দাংশযুক্ত "বরেণ্যং" কে "বরেণীয়ং" উচ্চারণ করতে হবে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গায়ত্রী মন্ত্রের নিম্নলিখিত অনুবাদ করেনঃ-
"যাঁ হতে বাহিরে ছড়ায়ে পড়িছে
পৃথিবী আকাশ তারা ,
যাঁ হতে আমার অন্তরে আসে
বুদ্ধি চেতনা ধারা—
তাঁরি পূজনীয় অসীম শক্তি
ধ্যান করি আমি লইয়া ভক্তি"।
ছান্দেগ্য উপনিষদ ঘোষণা করেছে-
গায়ত্রী বা ইদং সর্বং ভুতং যদিদং কিঞ্চ বাগ্বৈ গায়ত্রী।
বাগবা ইদং সর্ব ভুতং গায়তি চ ত্রায়তে চ।।
(ছান্দোগ্য উপনিষদ ৩/১২/১)
অনুবাদ-
এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যাহাই কিছু দেখা যায়, তাহার মধ্যে বাণীরাজ রাজেশ্বরী গায়ত্রীগুরু বাণীই সর্বশ্রেষ্ঠ। সমস্ত সংসারের সকলেরই একই মান্যতা। কেবল গায়ত্রী মন্ত্রই সকলেরই একমাত্র মুক্তির পথ।
তাই সবাই সর্বদা মহামন্ত্র গায়ত্রী জপ করুন,মনকে শুদ্ধ করুন ও ঈশ্বর ভাবনায় নিযুক্ত হোন।
ওম শান্তি শান্তি শান্তি
শেয়ার করে সমাজের মধ্যে সত্যকে পৌঁছে দিন