23/01/2023
পুকুর ঘাট, কলতলা ও নিত্য ঝামেলা অশান্তি; একটি দীর্ঘ বিশ্লেষণ
আজ ২৩ শে জানুয়ারি। নেতাজির জন্মবার্ষিকী। সকালে প্রভাত ফেরীর কুচকাওয়াজের কনসার্ট শুনে নয়, ঘুম ভাঙলো বাইরের রাস্তার কলতলায় ঝগড়াঝাঁটির ঝনঝনানি শুনে। কলতলায় এই ঝামেলা আজকের নতুন নয়। প্রায় প্রতি সপ্তাহের। কলতলার ব্যবহার নিয়ে লোকেদের ঝামেলা পুলিশ থানা এবং কোর্ট কাছারি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তাই আজকে এই নিয়ে কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করলাম।
আমাদের পাড়াতে পৌরসভার ট্যাপের লাইন যখন ছিল না, তখন পৌরসভার পক্ষ থেকে বসানো ৫-৬ টি টিউবওয়েল ছিল। সিলিন্ডার কলে বালতি করে জল ভরে মানুষ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তা ব্যবহার করত। তখন সাধারণত খাবার জলটাই নেওয়া হতো। আর গা ধোওয়া, বাসন মাজা, কাপড় কাচা ইত্যাদি কাজগুলো কমল সায়র পুকুরে করা হত। তখন পুকুরের চারপাশে খোলা পাড় থাকায় ঘাট ছিল অসংখ্য এবং যত্রতত্র। যাদের গরু ছিল তারা গরুর গাও ধোয়াত পুকুরে। খাটাল পাড়ার মোষ নামত পূর্ব পাড় দিয়ে। ধীরে ধীরে পুকুরপাড় গুলো কেনা বেচা হতে লাগলো। মানুষ নিজের নিজের পুকুরপাড়ের সীমানা ঘিরে নেওয়ার ফলে ঘাটের সংখ্যা গেল অতিমাত্রায় কমে। যার বাড়ির সীমানা তার ঘাট। পাড়ার রাস্তার পশ্চিম দিকের ঘর গুলি (যারা পুকুরপাড় কিনতে সুযোগ পায়নি) ঘাটে নামার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো। ধীরে ধীরে পাড়ার বেশিরভাগ বাড়িতেই ক্রমে ক্রমে টিউবওয়েল তারপর মোটরপাম্প তারপর জেটপাম্প তারপর সাবমারসিবল হয়ে গেল। এদিকে পুকুরে অবৈজ্ঞানিকভাবে মাছ চাষ, পাড়ার দুটি মূল ড্রেন নামা, পুকুর পাড়ে মলমূত্র ত্যাগ, গ্যারেজের বর্জ্য-তেল, গৃহস্থালির ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি পড়ে পুকুরের জল গেল পঁচে। সেই পুকুরে গা ধোওয়া এবং অন্যান্য কাজে পুকুরের জলের ব্যবহার একেবারে গেল কমে। মানুষ ধীরে ধীরে পুকুরের ঘাট পরিত্যাগ করল এবং রাস্তার ধারের পৌরসভার কলের মুখাপেক্ষী হয়ে গেল।
সিপিএম আমলের শেষদিকে পাড়ার বিভিন্ন অংশে প্রায় দশ জায়গায় ট্যাপ লাইন বসানো হয়েছিল। তখন মানুষের মনে একটি ধারণা পুঞ্জিভূত হয়েছিল যে এই জলে জীবাণুনাশক ওষুধ মেশানো আছে এই জল পান করা খুবই সাস্থ্যকর। সেই কারণে পারার অধিকাংশ মানুষ কল তলায় ভিড় জমাতো খাওয়ার জল নিতে। যাদের সামর্থ্য ছিল তারা বাড়ির ভিতর ট্যাপের লাইন নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সংখ্যা তখন ছিল নেহাতই কম। কলতলার প্রচন্ড চাপ এবং সেই নিয়ে মানুষের মধ্যে ঝামেলা দেখে তৃণমূলের আমলে কল গুলোর গ্যাপে গ্যাপে আরও দশটি বাড়তি কল লাগানো হলো। সব একনলা কলগুলিকে দুই নলা কলে পরিণত করা হলো। ড্রেনের স্লাবের উপর কলতলা বানানো হলো। ভাবা হয়েছিল কলের লাইনে এবার ভিড় কম হবে।
রাস্তার কলের উপভোক্তাদের কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে। ১. বাড়িতে সাবমারসিবল থাকলেও কারেন্ট পুড়বে বলে বাইরের কল ব্যবহারকারী মানুষজন। ২. বাড়িতে টাইপের লাইন থাকলেও রাস্তার লাইনটি সরকারি, তাই আমিও সেটা ব্যবহার করতে পারি এই ধরনের মানসিকতার লোকজন। ৩. যাদের বাড়িতে এখনো পর্যন্ত সত্যিই কল বা সাবমারসিবল নেই। ৪. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও খরচ হওয়ার ভয়ে ট্যাপলাইনের কানেকশন না নেওয়া মানুষ। ৫. পাড়ার এমন কিছু বাসিন্দা যাদের সংসার বেড়ে যাওয়ার কারণে পাড়ারই অন্যান্য বিভিন্ন ঘরে ভাড়া রয়েছেন। ৬. বহিরাগত ভাড়াটিয়া।
আগে কল থেকে বালতিতে জল ভরে নিজের নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তা ব্যবহার করা হতো। এখন এই কলগুলিতে তিন বেলা জল আসে। সকালে, দুপুরে এবং বিকালে। সকাল থেকে কলতলায় বসে লোকেদের ব্রাশ করা দিয়ে শুরু হয়, কেউ অনেকগুলো বোতলে খাবার জল ভরেন, কেউ কেউ কলতলাতে দাঁড়িয়ে বা বসে গা ধোন। সেই সকাল ছ'টা থেকে কলতলাগুলোতে হাঁড়ি বাসন মাজার এবং কাপড় কাচার আওয়াজ শুরু হয়। সেই সহ কলতলার লোকজনদের ক্যাঁচরম্যাঁচর। প্রতিবেলাতেই কলতলা গুলিতে বাসন মাজা এবং কাপড় কাচার ভিড় লেগেই থাকে। কেউ এই জল নিয়ে রাস্তায় ছেটান, কেউ গাড়ি বা বাইক ধোওয়ার কাজ করেন, কেউ আবার কলে পাইপ বেঁধে ফিক্স করে রেখে দেন। কেউ প্রয়োজনবশতঃ সেই পাইপ খুলে দিলে শুরু হয় গালাগালি। কুরবানির দিনে গরু-ছাগলকে গা ধোয়ান অনেকেই। গোবর এবং ল্যাদারি পড়েই রয়ে যায় রাস্তায়।
পাড়ার পার্টি অফিসে বেশিরভাগ অশান্তির খবর আসে কলতলা নিয়ে। কলতলাতেই কেউ মাছ বাছে। সেই নিয়ে অশান্তি। কলতলাতে গুয়ের ট্যানা ধোওয়া নিয়ে অশান্তি। কলতলাতে আমার ৩০ টা বোতল ভরা হলে তোমাকে ১ টা বোতল ভরতে দেবো এই নিয়ে অশান্তি। আগের রাত থেকে বালতি অথবা গামলা লাইন দিয়ে রাখা অথবা ঝুলিয়ে রাখা নিয়ে অশান্তি। আমার বালতি রাখা ছিল তাও সেটা সরিয়ে দিয়ে জল নিয়েছে কেন এই নিয়ে অশান্তি। আমি খাবার জল নিচ্ছিলাম ও কাপড় কাচছিল, খাবার জলে নিরমা জল লেগে গেল, অথবা ধোওয়া বাসনে ময়লা জল লাগিয়ে দিল এই নিয়ে অশান্তি। কলে পাইপ লাগিয়ে রেখে দেওয়া নিয়ে অশান্তি। কলতলায় জোয়ান মহিলাদের সামনে জোয়ান মরদদের ভেজা লুঙ্গিতে নির্লজ্জের মত অর্ধ উলঙ্গ হয়ে গা ধোওয়া নিয়ে অশান্তি। কে আগে জল নেবে, কে আগে কাপড় ধোবে, কে আগে বাসন মাজবে এই নিয়ে নিত্য ঝগড়া ও মারামারি। থানা পুলিশও হয়েছে এ নিয়ে। দক্ষিণ পাড়ার দুটো কলতলাতেই ঝামেলা। কোনের কলতলাতে নিত্য ঝামেলা। মাঝের পাড়ায় দুটি কলতলাতে প্রায়ই ঝামেলা। পাড়ার মোড়ের কলতলাতেও তাই। এই নিয়ে কলতলার আশেপাশের বাড়িওয়ালারা খুবই সমস্যায় রয়েছেন। হাঁড়ি বাসনের ঠোকাঠুকি শুনে ঘুম ভাঙ্গে তাদের। এই কাজগুলো বাড়িতে করতে বললে তারা বলে যে আমাদের বাড়িতে ড্রেন নেই, বাড়ির জল কোন দিকে যাবে? কলের জলের দখল নিয়ে কিছুদিন পরপরই উচ্চগ্রামে চেঁচামেচি করে ঝগড়া ঝামেলা। এর কি কোন সমাধান নেই তবে?
একবার আমাদের উন্নয়ন কমিটির ব্যানারে নিয়মাবলী লিখে চেষ্টা করেছিলাম। পাড়ার গ্রুপে কয়েকবার লিখেও কিছু হয়নি। ক্লাবে একবার ক্লাবের ব্যানারে কলতলার কাছাকাছি পোস্টার দিতে পরামর্শ দিয়েছিলাম। কাজ হয়নি। পার্টির পক্ষ থেকে বলেও কিছু কাজ হয় না। তাহলে কি কলতলা নিয়ে এই বিশৃঙ্খলা চিরকাল অব্যাহত থাকবে? এবার কি তাহলে কলতলার ব্যবহার নিয়ে গ্রামসভা ডাকতে হবে? মানুষের প্রয়োজনে বাড়তি কতগুলো জায়গায় এই কল বসিয়েছিলাম আমরা। কলতলার আশপাশের লোকেরা এই নিয়ে হয়তো আমাদেরকেই অভিসম্পাত করে চলেছে!
লিখনে: নুরুল ইসলাম