13/07/2020
কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তের ১১১তম জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ:-
কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত ১৩ জুলাই, ১৯১০ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার পালং থানার কুঁয়োরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঐ গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শুরু করে চিকিৎসক পিতা মতিলাল দাশগুপ্তের চাকরি স্থলে বদলি হবার সূত্রে ১৯২৫ সালে বরিশাল জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৯২৮ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতায় আসেন এবং ক্যালকাটা টেকনিক্যাল ইনস্টিউটে ভর্তি হন।
ছাত্র অবস্থাতেই অসহযোগ আন্দোলনের আবহে সভা-সমিতি, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হন এবং কমরেড নিরঞ্জন সেনের সংস্পর্শে এসে অনুশীলন পার্টিতে যোগ দেন। ১৯২৯ সালে তাঁর নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারী হয়। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি কাজ করতে থাকেন। ১৯৩১ সালে বগুড়ায় তিনি গ্রেফতার হয়ে বহরমপুর, বক্সার, দেউলি জেলে ছয় বছর বিনা বিচারে বন্দী থাকেন। জেলখানায় তিনি মার্কসবাদ অধ্যয়ন করেন এবং কমিউনিস্ট কনসোলিডেশনের সভ্য হন। ১৯৩৭ সালে মুক্তি পেয়ে কলকাতায় এসে কমরেড মুজফফর আহমেদের সঙ্গে দেখা করলে তাঁকে ডক শ্রমিকদের মধ্যে ইউনিয়ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৩৮ সালের ১লা মে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪০ সালে কাকাবাবু গোপন সভায় প্রাদেশিক পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। সেই সময় কলকাতা জেলার সম্পাদকও গোপন কেন্দ্রে চলে গেলে প্রকাশ্য কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রমোদ দাশগুপ্তকে। ১৯৪২ সালে "জনযুদ্ধ" প্রকাশিত হলে তার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন। ২৫শে ডিসেম্বর, ১৯৪৫ "স্বাধীনতা" পত্রিকা প্রকাশিত হয় এবং সেই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সোমনাথ লাহিড়ী এবং ম্যানেজার ছিলেন প্রমোদ দাশগুপ্ত। ১৯৪৭ সালে প্রাদেশিক সম্মেলনে কমরেড দাশগুপ্ত রাজ্য কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২৬শে মার্চ,১৯৪৮ কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনী ঘোষিত হলে অনেকে আত্মগোপন করেন। কাকাবাবুসহ ৩০০ নেতা ও কর্মী কারারুদ্ধ হন। ১৯৫০ সালে প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতি বসু, আব্দুল হালিম প্রমুখ গ্রেফতার হন। ১৯৫১ সালে পার্টি আইনী ঘোষিত হলে সবাই কারামুক্ত হন। ১৯৬০ সালে বর্ধমান রাজ্যসম্মেলন থেকে কমরেড দাশগুপ্ত রাজ্য কমিটির সম্পাদক এবং ১৯৬১ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন । ১৯৬৪ সালের পর সি. পি.আই. (এম) গঠিত হলে রাজ্য কমিটির সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবে আমৃত্য দায়িত্ব পালন করেন।
কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত অনেক বাঁক ও মোড়ে পার্টির আন্দোলন, সংগ্রাম ও সংগঠন পরিচালনায় সুদক্ষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ সালে দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন ও পরিচালনা এবং পরবর্তীকালে আধা ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাস ও জরুরী অবস্থায় পার্টি ও গণআন্দোলনকে রক্ষা ও বিকশিত করার কাজে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
১৯৭৭ সালে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহারের পর প্রথমে লোকসভা নির্বাচনে স্বৈরাচারী শক্তিকে পরাস্ত করতে যে কৌশল গ্রহণ করেছিলেন তার ফলে কংগ্রেস মাত্র দুটি আসন ছাড়া সবকটিতেই পরাজিত হয়। কেন্দ্রে মোরারজী দেশাইয়ের নেতৃত্বে প্রথম অকংগ্রেসী সরকার গঠিত হয়।। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় ১১ই জুন, ১৯৭৭ বিধানসভা নির্বাচন ঘোষিত হয়। কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তের নেতৃত্বে কংগ্রেসকে পরাজিত করার লক্ষ্যে জনতা পার্টিকে বেশি আসন ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এমন কি প্রফুল্ল সেনকে মুখ্যমন্ত্রী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রফুল্ল সেন, ডি. এন. লাহিড়ী প্রমুখ জনতা পার্টির নেতৃত্ব এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে প্রায় ২০০ আসন দাবী করেন। কয়েক দফায় বৈঠক হলেও ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের উদ্যোগ প্রফুল্ল সেন প্রমুখের বিরোধিতায় সফল হলো না। তখন ছয় পার্টির ( সি.পি.আই.এম., ফরোয়ার্ড ব্লক, আর. এস. পি., আর. সি.পি. আই., মার্কসবাদী ফরোয়ার্ড ব্লক এবং বিপ্লবী বাংলা কংগ্রেস ) বামফ্রন্ট স্বৈরাচারী কংগ্রেস ও ঐক্যবিরোধী জনতা পার্টিকে পরাস্ত করে বামফ্রন্ট প্রার্থীদের জয়ী করার আহ্বান জানালেন কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত। রাজ্যের নির্বাচকমন্ডলী বিপুলভাবে রায় দিলেন বামফ্রন্টের পক্ষে। জনতা পার্টি ২৯টি এবং কংগ্রেস ২০টি আসনে জয়ী হয়। সি. পি.আই. এম. একাই ১৭৮টি আসনে জয়ী হয় । বামফ্রন্ট পেল ২৩৮টি আসন। ২১শে জুন, ১৯৭৭ জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হল।
এরপর ৩৬ দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে বামফ্রন্ট সরকার জনস্বার্থবাহী কাজের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। দ্বিতীয় দফায় ১৯৮২ সালের নির্বাচনে বামফ্রন্টের চেয়রম্যান হিসাবে প্রথম দফার সাফল্যকে সংহত করে কেন্দ্র- রাজ্য সম্পর্কের বিষয়টিকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইস্তাহারে কেন্দ্রের কাছে দাবী এবং কর্মসূচী দুটোই অন্তর্ভুক্ত করেন। সেই নির্বাচনেও বামফ্রন্টের বিপুল সাফল্য সূচিত হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ছয় পার্টির সাথে আরও ৩টি পার্টি ( সি.পি.আই., ডি. এস. পি. ও ডব্লিউ. বি . এস.পি.) যুক্ত হয়।
কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকান্ডে গণ-আন্দোলন ও গণসংগ্রামে এবং বামফ্রন্ট পরিচালনায় অনেক অবদান রেখেছেন। এই কাজ করতে গিয়ে শারীরিক অবস্থাকেও গ্রাহ্য করেননি। পরে দীর্শাঘমেয়াদী শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য ১৯৮২ সালের ২৬শে অক্টোবরে চীনে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ১৯৮২ সালের ২৭শে নভেম্বর তাঁর অবস্থার অবনতি সংবাদ পেয়ে কমরেড এম.বাসবপুন্নাইয়া বেজিংয়ে যান। কিন্তু ডাক্তারদের অনেক চেষ্টা সত্বেও কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত বাঁচানো গেল না।২৯শে নভেম্বর ভারতীয় সময় ১১-১৫ মিনিটে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যে ত্যাগ, তিতিক্ষা, আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা, পার্টিসংগঠনের বিকাশ ও যুক্তফ্রন্টকে কার্যকরী রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা পালন করেছেন তা অবিস্মরণীয়।
কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত লাল সেলাম।