20/03/2024
#গুরু_ও_শিষ্য
২০২০ সাল থেকে মার্চ মাসটা আর মেনে নিতে পারিনা। ইংরেজিতে মার্চ'টাই যে বাংলায় বসন্ত সেটা আর মানতে পারিনা। ২০২০ সাল থেকে আর কোনো মাসে রঙ মাখিনি। হোলি খেলিনি। খেলতেও পারিনা কারন মার্চ মানে আমার ঈশ্বরের দেহ ত্যাগের মাস। ২০২০ সালের ১৫ ই মার্চ আমার ঈশ্বর, স্যার সুদীপ পান্ডা এই পৃথিবীকে দেহটা উপহার দিয়েছিলেন। প্রতি বছরের মতো এক অদ্ভূত কর্কশ বিষণ্ণতা আমাকে চুবিয়ে রেখেছে কোনো এক গুটখা খোরের ঝাঁঝালো জিভের মতো। শুধু মনে পড়ছে স্যারের কথা। এক অতি ছাপোষা মধ্যবিত্ত ঘর থেকে বাংলার রাজধানীর কোনায় কোনায় পরিচিত হবার কোনরকম সহজাত বা অর্জিত যোগ্যতা আমার ছিলোনা স্যার ছাড়া। এই বিষণ্ণ বসন্ত বিকেলে মনে পড়ছে সেই দিনের কথা যেদিন স্যার ফোন করে বললেন, " বাঁকুড়া, বর্ধমান - এইসব মফঃস্বলে তুমি থাকবে না। কলকাতা যেতে হবে তোমায়।" শুধু ছাত্র বাদ দিয়েও নিকট রক্তের সম্পর্কের ভাই বলেই হয়ত পেয়েছিলাম এই সান্নিধ্য। কলকাতায় চলে এলাম। স্যার ফোনে বলতেন, " টাকা ও ব্যক্তিগত সম্মান নয়। সর্বোচ্চ পেশাগত সম্মান ও মর্যাদা অর্জন করতে হবে সুদীপ।" একথা ঠিক যে ইতিহাস পুরুষকে প্রেমিক, স্বামী বা বাবা হিসেবে মনে রাখেনা বা রাখেনি। এরপর সালটা ২০১৭-১৮ এর দিকে। আমার কাছে ১৫০+ ইংলিশ অনার্সের ছাত্র ছাত্রী পড়ছে। এরকম এক বসন্তের বিকেলে স্যারের ফোন - " কালকের মধ্যেই বাঁকুড়া চলে এসো। আমার কাজ আছে।" ঈশ্বরের এই ডাককে আমার ফেলে দেবার সাধ্য নেই। তাই পৌঁছে গেলাম বাঁকুড়া। সন্ধ্যে বেলায় অনাময় নার্সিং হোমের পিছনে আমাদের পড়ানোর বাংলোতে স্যার নিজের হাতে মাংস রান্না করলেন স্যার সুদীপ পান্ডা, থুড়ি -- ইশ্বর। লক্ষাধিক যার ছাত্র ছাত্রী, যার জ্ঞানের বিপুলতা ও শিক্ষকতার উপস্থাপন অদ্বিতীয় সেই স্যার সুদীপ পান্ডা রান্না করতে করতে তার ছাত্র সুদীপ ষন্নিগ্রহীকে বলছেন, " লেগ পিস টা আগে টেইস্ট করে দেখবে তো।" আমি, শান্তনু, প্রলয়দা, তাপস - এই জনাচারেক ব্যক্তি উপস্থিত। ফোন করলে প্রথমেই জানতে চাইতেন কোন ব্যাচে কোন টপিক টা এই মুহূর্তে পড়াচ্ছি। কোন রেফরেন্স বইটা নিজে পড়ছি, পড়ানোর জন্য। ফোনে কথা হলে কোনোদিন ৩০ মিনিটের নীচে কল'টা কাটা হয়নি। পড়ানোয় কোনো সমস্যা, ব্যক্তিগত জীবনে কোনো সমস্যা এলেই সোজা ফোন করতাম। ফোনটা ধরেই ওই - "হ্যালো"টাই ছিলো যে কোনো রোগের অর্ধেক প্যানাসিয়া। ফোনে বলেছিলেন, " ভুলভাল সম্পর্কে জড়িও না সুদীপ। বিয়েটা জীবনে obviously significant কিন্তু important নয়।" ২০১৯ সালের ৫ ই সেপ্টেম্বর ফোনে অনেকক্ষণ কথা হলো। গলার তেজটা কম লাগছিলো। বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম - " স্যার শরীর ঠিক আছে তো?" বারবার তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। এরপর, আবার এক বিষণ্ণ বসন্তের বিকেলে দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালে ১২-ই মার্চ বিকেল ৪ টে'র সময় স্যারের বেডের সামনে দাঁড়াতেই স্যার ভাই সৌরভের ( যে সৌরভ শেষ মুহূর্ত অবধি আমাদের ঈশ্বরের দেহের দেখা শোনা করেছিল) দিকে তাকিয়ে বললেন, " দেখছো সৌরভ, আমার তৈরী মডেল সুদীপ এসেছে।" তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন - " এতো দেরি করলে যে আসতে!" আমি বলতে পারিনি সেদিন কিছুই। আমি শুধু সেদিন দেখেছিলাম, ঈশ্বর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকলে কেমন দেখতে লাগে! ফোন নং টা যে আজও ঠোঁটে মুখস্থ স্যার কিন্তু কোনো সমস্যাতেই ফোনের ওপারে আর "হ্যালো" টা শুনতে পাবোনা। অনেক অনেক কিছুতে যে প্রয়োজন পড়ছে আপনার পরামর্শ। বাবা মা বেঁচে আছেন ঠিকই কিন্তু আপনার উপদেশ ছাড়া যে অনাথ লাগে স্যার প্রতিটা সেকেন্ডের কাঁটায়। ভয়ংকর মন খারাপের দিন বা রাত গুলোতে কিশোর প্রেমিকের মতো আপনার এই ছবিগুলির দিকে তাকিয়ে থাকি। পেশাগত জীবন, সংসার জীবন, ব্যক্তিগত জীবন - অগাধ সব লড়াইয়ের মাঝে আপনার শব্দগুলোকে অবলম্বন করে বেঁচে আছি স্যার। আপনি বলেছিলেন, " অন্যের হাতে হেরে না গিয়ে, পুরুষের ম্যাকবেথের মতো মৃত্যু শ্রেয়।" অনেক দিয়েছেন আপনি আমাকে। আপনার জন্যই, এই বৃহত্তর কলকাতার গলিতে গলিতে আপনার ভাই তথা ছাত্র সুদীপকে লোকে সাহিত্যের মাস্টার বলে চেনে। জীবনের বেলা বয়ে যাচ্ছে স্যার। গোধূলিতে দেখতে পাচ্ছি আপনার মত হয়ে যাচ্ছি এক স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবিতে।আজীবন চেয়ে গেছি শুধু। শেষ এটুকুই আশীর্বাদ করবেন, আপনার মতো যাতে সমাজ , সভ্যতা ও চারপাশের ন্যাকা সম্পর্ক গুলিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেহত্যাগ করতে পারি। ঠিক আপনার মতই।
সুদীপ ষন্নিগ্রহী (Asst. Teacher, Founder of Dream Educare Academy Barasat, Kol - 700126)