11/07/2023
ভগৎ সিং মার্কসবাদী বিপ্লবীতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। তার চিন্তার এই বিকাশধারাটি মোটেই সরলরৈখিক ছিল না।
নানা ভাবনা, তত্ত্ব ও ঝোঁকের বিরুদ্ধে লড়াই করেই এই পরিণতিতে আসা।
মার্কসবাদী হয়ে ওঠার আগে তাঁর চিন্তায় নানা ধরনের মতাদর্শের ছাপ পড়েছিল।
শাসকের দমবন্ধ করা শাসনব্যবস্থার শৃঙ্খলে ভারতীয়রা তখন ছটফট করছিল। এই শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের অবাধ স্বাধীনতা ও বিকাশ ছিল তাদের কাছে একান্ত প্রয়োজনীয়।
ফলে যে মতাদর্শ ও চিন্তায এই স্বাধীনতা ও যুক্তির কথা বলেছে— তার প্রতিই প্রকাশিত হয়েছে ভগৎ সিংয়ের আগ্রহ।
বামপন্থী নেতৃত্বে যে যুক্তিবাদী ও নাস্তিক্যবাদী আন্দোলন দক্ষিণ ভারতে শুরু হয়েছিল, সে খবর ভগৎ সিং রাখতেন।
ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে এমন একটা সময়ে যখন মানুষের জানা-বোঝার পরিমাণ ছিল খুবই কম, এবং প্রাকৃতিক-অপ্রাকৃতিক বহু বিষয়কেই তারা ভীষণভাবে ভয় পেত। তারা ছিল আত্মবিশ্বাসহীন।
নিজেদেরকে কীটের থেকেও অধম বলে মনে করত।
ছোটবেলা থেকে মানুষকে শেখানো হত ঈশ্বরই সব, তিনিই সৃষ্টিকর্তা, সর্বক্ষমতাসম্পন্ন, ইত্যাদি।
আর অকিঞ্চিৎকর মানুষ হল হীন, নগণ্য। এভাবেই মানুষের আত্মবিশ্বাসকে ধর্ম ধ্বংস করে দেয়। মানুষ ভাবতে শুরু করে সে দুর্বল। আর এই দুর্বল মানুষ সবসময় অকারণে ভয়ে ও আতঙ্কে দিন কাটায়।
যতদিন এই ভীতিজনক অবস্থা তার মনের মধ্যে থাকবে, ততদিন সে কখনওই প্রকৃত সুখ ও শান্তি পাবে না।
প্রাচীন ভারতে বুদ্ধদেবই প্রথম ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছিলেন।
ভগৎ দেখালেন যে, প্রকৃতপক্ষে পুঁজিপতিরা ধর্মকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে।
ভগৎ সিং সঠিকতার সঙ্গে লক্ষ করেছিলেন যে দুই-একটা বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও কমিউনিস্টদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই অ্যানার্কিস্টদের সাদৃশ্য রয়েছে।
কমিউনিজমের ধারণা অনুযায়ী সমাজ বিবর্তনের একটি পর্যায়ে রাষ্ট্র একটি ভূমিকাহীন অবস্থানে চলে যাবে, শুধু তাই নয় তার বিলোপও ঘটবে। অনন্তকাল ধরে রাষ্ট্র ছিল না। তাই রাষ্ট্র অনন্তকাল ধরে থাকবেও না।
ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে শ্রেণিবিভাজনের আবির্ভাব ঘটে।
অর্থাৎ জন্ম নেয় সম্পত্তিবান ও সম্পত্তিহীন শ্রেণি। আর এরই পরিণতিতে জন্ম নেয় সম্পত্তিবান শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের। মার্কসবাদীদের মতে রাষ্ট্র হল শ্রেণিশোষণ ও অত্যাচারের হাতিয়ার।
অ্যানার্কিস্টদের সঙ্গে মার্কসবাদী চিন্তার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলেও, রাষ্ট্র যে সামাজিক বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখে এবং মানুষের স্বাধীনতাকে খর্ব করে— এ নিয়ে কোনও মতপার্থক্য নেই।
ভগৎ সিং যখন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের পীড়ন, শোষণ এবং স্বাধীনতা হরণকারী ভূমিকাটি মুখোমুখি হন, তখন অ্যানার্কিস্টদের রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানটি যে তাঁর কাছে আকর্ষণীয় হবে তা বলাই বাহুল্য।
কমিউনিস্ট সমাজবাদীরা এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিরোধিতা করে। ফরাসি চিন্তাবিদ প্রুঁধোর ভাষায় “সম্পত্তি হল ডাকাতির ফল।” অ্যানার্কিস্টদে ভাবনায় সম্পত্তি সঞ্চয়ের ধারণা মানুষকে লোভী করে তোলে। তার অন্যের প্রতি সহানুভূতি চলে যায়। হৃদয় হয়ে পড়ে ক্ষমাশূন্য পাষাণহৃদয়।
এই সম্পত্তিকে নিরাপদ করতে রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আর এই লোভ বাড়তে বাড়তে পরিশেষে সাম্রাজ্যবাদে রূপান্তরিত হয় এবং ফল হয় যুদ্ধ।
*যদি সবকিছু সহযোগিতা ও সমবায়ের ভিত্তিতে হত তাহলে লোভের আবির্ভাব ঘটত না।
মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করত। ঘটত না ডাকাতি, প্রয়োজন পড়ত না পুলিশ, জেল, আদালত বা সৈন্যবাহিনির।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন সম্ভব হত, তেমনি মানুষ সহজেই শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারত।
আর এর ফলেই তাদের জীবন হয়ে উঠত সুখ ও সমৃদ্ধিপূর্ণ।
অ্যানার্কিস্টদের এই সব যুক্তির উল্লেখ করে ভগৎ সিং ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান চেয়েছিলেন। তিনি আরও বলেছেন যে, এই সম্পত্তি অর্জিত হয় খারাপ পথে আর তাকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন হয় আইনপ্রণেতা রাষ্ট্রের।
এগুলিই সমস্ত কিছুর উৎস। তাই খারাপ ব্যাপারগুলিকে উচ্ছেদ করতে হলে এই ব্যক্তিগত সম্পত্তিকেই উচ্ছেদ করতে হবে।
মার্কসবাদ অ্যানার্কিজমের মতই ব্যক্তিগত সম্পত্তির উচ্ছেদ চায়। অ্যানার্কিজমের আবেগপূর্ণ ব্যাখ্যার বদলে মার্কসবাদীরা ব্যক্তিগত সম্পদের আবির্ভাবের একটি বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা দেন।
ঐতিহাসিক বস্তুবাদ দেখায় যে মানবজাতির ইতিহাসে মানুষ প্রথম যে সমাজ স্থাপন করে তা হল আদিম সাম্যবাদী সমাজ।
পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উত্তরণের পর্বটি হল সমাজতন্ত্র— যেখানে রাষ্ট্র ক্ষয় পেতে শুরু করবে এবং একটা সময় অপ্রয়োজনীয় হয়ে উবে যাবে। মার্কসবাদের তুলনায় অ্যানার্কিজমের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অনেকটাই ভাসা-ভাসা, অস্পষ্ট ও অগভীর।
বন্দিজীবনে ভগৎ সিং এই দুর্বলতাগুলি বুঝতে পেরে আকর্ষিত হয়েছিলেন মার্কসবাদে।
প্রথমত, ভারতীয় বিপ্লবের পথে ধর্ম একটি বিরাট বাধাস্বরূপ। তাই বিপ্লবীদের বস্তুবাদী ও সেকুলারবাদী পথ গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রথম দিকে তিনি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, সরকার ও আইনব্যবস্থার প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণ করতেন।
কিন্ত ক্রমে ক্রমে রাষ্ট্রের সার্বজনিক চরিত্রটিকে বুঝতে পারেন।
তবে মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের ধারণা আরও সুস্পষ্টরূপে তার চিন্তায় বিকশিত হতে শুরু করে বন্দিজীবনে।