30/03/2026
শিশুদের মৃত্যুর দায় কি এড়ানো যায়?
বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুদের মধ্যে হামের যে মহামারি ছড়িয়ে পড়ছে, তা নিয়ে প্রশাসনের অন্দরে এক অদ্ভুত ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে দাবি করা হয়েছে যে, দেশে নাকি গত ৮ বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে যখন আমরা এই দাবির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সরাসরি সরকারি ও আন্তর্জাতিক ডাটাশিটগুলো খুলি, তখন যে সত্যটা সামনে আসে তা কেবল বিস্ময়করই নয়, বরং বর্তমান নীতিনির্ধারকদের চরম ব্যর্থতা ও মিথ্যাচারকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দেয়।
রাজনীতি একপাশে সরিয়ে রেখে যদি আমরা স্রেফ সংখ্যার দিকে তাকাই, তবে দেখা যায় বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (EPI) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের (WUENIC) যৌথ ডাটা অনুযায়ী ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত দেশে হামের (MR) টিকার কভারেজ ছিল ঈর্ষণীয়। ২০১৮ সালে এই হার ছিল ৯৭%, যা ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালেও একই ধারাবাহিকতায় বজায় ছিল। এমনকি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই হার ছিল ৯৬%। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো দেশে ৯৫% বা তার বেশি কভারেজ থাকলে সেখানে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটা প্রায় অসম্ভব, কারণ এটি এক ধরণের 'হার্ড ইমিউনিটি' তৈরি করে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, গত আট বছর যদি টিকা না-ই দেওয়া হতো, তবে এই আন্তর্জাতিক ডাটাগুলো কি আকাশ থেকে পড়েছে? বাস্তবতা হলো, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগ পর্যন্ত দেশের টিকাদান কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। কিন্তু সংকটের শুরুটা হয়েছে ঠিক এরপর থেকেই।
সরকারি ইডিআই ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালে এসে এই সাফল্যের গ্রাফটি হঠাৎ করেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। যে টিকার কভারেজ ৯৬% ছিল, তা ২০২৫ সালে এসে অবিশ্বাস্যভাবে ৬০% এর নিচে নেমে গেছে। শুধু হাম নয়, যক্ষ্মার (BCG) টিকার 'লেফট-আউট রেট' বর্তমানে ১৩.২%, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। আমরা জানি, হাম অত্যন্ত সংক্রামক। যখনই কভারেজ ৯৫% থেকে কমে ৭০% এর নিচে নেমে যায়, তখন মহামারি ছড়িয়ে পড়া স্রেফ সময়ের ব্যাপার। আজ দেশের হাজার হাজার শিশু যে হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, তার সরাসরি কারণ হলো ২০২৫ সালের এই ভয়াবহ প্রশাসনিক গাফিলতি।
এই বিপর্যয়ের দায়ভার কার?
২০২৪-এর আগস্টের পর প্রথমে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং পরবর্তীতে বর্তমান তারেক রহমান সরকারের আমলেই স্বাস্থ্য খাতের মেরুদণ্ডটি ভেঙে পড়েছে। প্রশাসনিক রদবদলের নামে দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছে, তার খেসারত দিচ্ছে এখনকার নিষ্পাপ শিশুরা। মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মীদের নিয়মিত সেশনগুলো তদারকি করার মতো বর্তমানে কেউ নেই। কোল্ড চেইন মেইনটেন্যান্স থেকে শুরু করে লজিস্টিক সাপ্লাই—সবকিছুই গত এক বছরে অচল হয়ে পড়েছে।
দায় এড়ানোর জন্য "গত ৮ বছর টিকা হয়নি" এমন ডাহা মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো বর্তমান সরকারের একটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, কিন্তু ডাটাশিট কোনো পক্ষ নেয় না। যখন আপনার নিজের মন্ত্রণালয়ের ড্যাশবোর্ডই বলছে যে ২০২৪ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল এবং ২০২৫-এ এসে ধস নেমেছে, তখন সেই ব্যর্থতার দায়ভার অবশ্যই ইউনূস প্রশাসন এবং বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্যের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে রাজনীতির এই কুৎসিত খেলা বন্ধ হওয়া উচিত। অতীতের ওপর দায় চাপানোর চেয়ে বর্তমান প্রশাসনের উচিত নিজেদের অযোগ্যতা স্বীকার করা। ২০২৫ সালে টিকাদানের এই ৪০% পতন কোনো সাধারণ বিচ্যুতি নয়, এটি একটি জাতীয় অপরাধ। ক্ষমতার পালাবদলের ডামাডোলে শিশুদের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার জবাব কি বর্তমান প্রশাসন দিতে পারবে? রাজনীতি নয়, এখন সময় ডাটার জবাব ডাটায় দেওয়ার এবং এই প্রশাসনিক পক্ষাঘাতগ্রস্ততা কাটিয়ে দ্রুত শিশুদের জীবন রক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার।
সকল সংকট, সংগ্রাম ও মানবিকতায় সর্বদা জনগণের পাশে আছে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।
জয় বাংলা,
জয় বঙ্গবন্ধু।।