03/05/2026
বরগুনার আমতলীর সবুজে ঘেরা গ্রাম ঘোপখালী। সেই গ্রামে ঢুকলে হঠাৎ চোখে পড়ে বিশাল এক পুরোনো বাড়ি। গাছপালা আর নীরবতার আবরণে ঘেরা, যেন প্রকৃতির সঙ্গে লুকোচুরি খেলে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি।
বাড়িটির স্থাপত্যে ব্রিটিশ আমলের প্রভাব সুস্পষ্ট। খিলানযুক্ত বারান্দা, কারুকার্যপূর্ণ থাম ও অলংকৃত জানালাগুলো যেন সময়কে আটকে রেখেছে। বাড়িটির নিচতলার খিলান, মাঝের গম্বুজধর্মী কাঠামো এবং ওপরের জানালায় ব্যবহৃত কলামগুলো থেকে অনুমান করা যায়, এটি ব্রিটিশ আমলের।
ইট-চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত ভবনটির দেয়ালগুলো ২৪ ফুট চওড়া। ভবনটির প্রতিটি তলায় সুষমভাবে গঠিত খিলান ও জানালা আছে। নিচতলায় আছে ৭টি খিলান (অর্ধবৃত্তাকার), যা একটি দীর্ঘ বারান্দা তৈরি করেছে। এই খিলানগুলো রোমান-গথিক ধাঁচের, যা ব্রিটিশ আমলে প্রচলিত ছিল। প্রতিটি খিলানের ওপর রুফ-কার্নিশে ছোট ছোট অলংকরণ আছে
বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন ফটিক হাওলাদার নামের একজন। ফটিকের বাবা ঝরু হাওলাদার আঠারো শতকে পটুয়াখালীর বাউফল থেকে এই এলাকায় আসেন। সঙ্গে ছিলেন ফটিক। তখন এই এলাকা ছিল বনজঙ্গলে ভরা। ঝরু তা সাফ করে বসতি গড়েন
এরপর তিনি প্রচুর জমি ‘হাওলা’ (ঊনবিংশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় কৃষিজমির মালিকানা সম্পর্কের ক্ষেত্রে সৃষ্ট মধ্যস্বত্ব) করেন। বাবার মৃত্যুর পর জমির মালিকানা পান তাঁর ছেলে ফটিক হাওলাদার। তাঁর আমলে পরিবারটি আরও বিত্তশালী হয়। ‘ফটিক হাওলাদার তালুক’ (জমিদারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত করে নেওয়া ভূসম্পত্তি) অর্জন করেন। এরপর পরিবারটির পদবি হয়ে যায় তালুকদার।
ফটিক হাওলাদার তালুক অর্জনের পর উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নির্মাণ করেন। ফটিক হাওলাদারের কমপক্ষে এক হাজার একর ফসলি জমি ছিল। সেসব জমি তিনি ওয়াক্ফ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে তাঁদের এস্টেটের ৯১ একরের মতো সম্পত্তি আছে। বর্তমানে এই এস্টেটের মোতোওয়ালি তিনি।
ফটিক হাওলাদারের তিন ছেলে ছিলেন। এই তিন ছেলের ১২ ছেলে ছিলেন।
বাড়ির উত্তরে পুরোনো মসজিদ, দক্ষিণ পাশে বিশাল কাছারিবাড়ি। মসজিদের পাশেই ফটিক হাওলাদার, তাঁর বাবা ঝরু হাওলাদারের কবর। বাড়ির উত্তর পাশে এক একর আয়তনের বিশাল পুকুর। তাতে শানবাঁধানো পুরোনো ঘাট। বাড়িটির সব জায়গাই যেন স্থাপত্যের অনন্য ছোঁয়া লেগে আছে।
কলকাতা থেকে মিস্ত্রি এনে এই ভবন নির্মাণ করেছিলেন। এর আসবাবসহ সবই কলকাতা থেকে আনা হয়েছিল। ভবনটি পরিত্যক্ত হয়ে গেছে বহু আগে। এটিকে স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণ করা হলে পরের প্রজন্ম জানতে পারত।’