03/12/2023
শেখ ফজলুল হক মণি (পর্ব-১)
শেখ ফজলুল হক মণির পড়াশোনা
মধুমতী নদীর তীরভূমি টুঙ্গিপাড়ার সবুজ-শ্যামল গ্রামে শৈশব স্মৃতির মোহমায়া ছেড়ে শেখ ফজলুল হক মণি লেখাপড়ার সুবাদে ঢাকায় আসেন একবুক স্বপ্ন নিয়ে। অধ্যয়ন শুরু করেন নবকুমার ইনস্টিটিউটে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে এবং ১৯৫৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৬০ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হয়ে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৬২ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময় তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। এ ছাড়া কারাবন্দি থাকা অবস্থায় ১৯৬৭ সালে আইনশাস্ত্রে এলএলবি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন বাংলার এই সূর্যসন্তান।
৬২'র শিক্ষা আন্দোলনের নায়ক শহীদ শেখ ফজলুল হক মণি:
ছাত্রজীবন থেকেই শেখ মণি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬০-১৯৬৩ সালে তিনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি গ্রেফতার হন এবং ছয় মাস কারাভোগ করেন।
১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ধর্মঘট ও সামরিক আইন অমান্য করে রাজপথে মিছিল বের করলে পুলিশ লাটিচার্জ-টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করে।
৭ ফেব্রুয়ারি কার্জন হলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনজুর কাদের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে এলে ছাত্র সমাজ কর্তৃক বাধাগ্রস্ত ও চরমভাবে লাঞ্ছিতসহ তার গায়ে থু থু ছিটিয়ে দেয় ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পর ছাত্ররা হল ত্যাগ করছে না দেখে পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করে ছাত্রদের জোর করে বের করে দেয়। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে পুলিশবেষ্টনির মাঝে আটকা পরেছিল আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। এদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা আগেই জারি হয়েছিল। যা বহুদিন পর্যন্ত বহাল ছিল।
৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২৯ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে।
সকল বন্দী রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের মুক্তিদান, বাংলা হরফের রদবদলের বন্ধের দাবী জানিয়ে ছাত্র সমাজ সরকারকে ৭ দিনের চরমপত্র দেয়ায় ৩১ মে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় পুনঃ বন্ধ ঘোষণা করে।
দেশব্যাপী এই শিক্ষা আন্দোলনকে গতিময় করে তুলতে ৬২-র ২ আগস্ট তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণি, ডাকসুর সহ-সভাপতি শ্যামা প্রসাদ ঘোষ ও জি.এস. এনায়েতুর রহমান সহ বাম সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে জেলাসমূহে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি গ্রেফতার হন।
১৯৬২’র দ্বিতীয়ার্ধে সরকার ঘোষিত শিক্ষানীতির প্রতিবাদে আন্দোলন আবার বেগবান হয়ে ওঠে।প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর ১০ আগস্ট ঢাকা কলেজের ক্যান্টিনে বিভিন্ন কলেজ প্রতিনিধিদের নিয়ে একসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভা থেকে ১৫ আগস্ট দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট ও ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ছাত্র সমাজের দাবী পূরণে স্বৈরাচার সরকারের অনীহার প্রতিবাদে ১৫ আগস্ট সমগ্র দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয় এবং ২৮ তারিখ পর্যন্ত ধর্মঘট ও মিছিল অব্যাহত থাকে।
বরাবরের মতোই সেই দুঃস্বপ্নের সময়ে বাংলার দিশেহারা লাখো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের সারথি হয়ে রাজপথে নামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া এই ছাত্র সংগঠনটি ইতোপূর্বে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে সফলতা অর্জন করে গণমানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়। ফলে, কুখ্যাত শরীফ শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছাত্রলীগ হয়ে উঠে ছাত্র-জনতার দুর্দিনের কান্ডারী।
সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। পূর্ব বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ কর্মসূচী চলতে থাকে। আন্দোলনের দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল শিক্ষানীতিতে প্রস্তাবিত তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স এবং উচ্চ মাধ্যমিক ইংরেজির অতিরিক্ত বোঝা বাতিল করার বিষয়টি।
একের পর এক ধর্মঘট সমাবেশের কর্মসূচি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন অচলাবস্থার সৃষ্টি করে, তেমনি ক্রমেই এই আন্দোলনের শ্রমজীবী ও পেশাজীবী বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ, আন্দোলনটিকে ‘গণ-আন্দোলনে’ রূপান্তরিত করে।
কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবী সম্বিলিত এক চরমপত্র পেশ করে। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবীসমূহ হল :
১) শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিল, (২) ৩ বছরের পাস ডিগ্রি কোর্সকে ২ বছর করা, ৩) দ্বাদশ শ্রেণি প্রবর্তন বন্ধকরণ, ৪) বর্ধিত ছাত্র বেতন ও পাঠ্য পুস্তকের মূল্য হ্রাস, ৫) কলা ও বিজ্ঞান বিভাগ হতে যথাক্রমে বিজ্ঞান ও কলা বিষয় বাদ দেয়া, ৬) দ্বাদশ শ্রেণির ৭টি ইংরেজি বইয়ের স্থলে ২টি করা, ৭) উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগকে ডিগ্রী কলেজের সাথে পুনঃ একত্রীভূতকরণ, ৮) জনগণের গড়পড়তা আয় অনুপাতে শিক্ষার ব্যয় হ্রাস করা, ৯) বন্দী ছাত্রদের মুক্তিসহ হুলিয়া ও বহিস্কারাদেশসহ রুজুকৃত মিথ্যা মামলাসমূহ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা, ১০) কলেজ শিক্ষকদের মর্যাদা সি.এস.পি অফিসার পদের সমমর্যাদাকরণ ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধিকরণ এবং ১১) পূর্ব পাকিস্তানে প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূর করে অবিলম্বে জনসংখ্যা ভিত্তিতে ন্যায্য অধিকার দেয়া।
কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবি ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মেনে নেয়ার সময় বেঁধে দেয়, কিন্তু পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুল কাদের চৌধুরী দাবী সমূহকে অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করে ১০ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে।
১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ের সামনে অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি বাতিল করে। তবে তার পরিবর্তে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে।
১০ সেপ্টেম্বর সরকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। সরকারের প্রত্যাশা ছিল সোহরাওয়ার্দী মুক্ত হলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়বে। কিন্তু এই আশা-দুরাশায় পরিণত হয়।
১১ সেপ্টেম্বর সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবীর প্রতি সমর্থন করে তা মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অন্যথা এর পরিণতি কঠোর হবে বলে হুঁশিয়ারী জ্ঞাপন করেন।
১৭ সেপ্টেম্বর সারাদেশে অভূতপূর্ব হরতাল ও ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। রাজপথে নেমে আসে রাজধানী ঢাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ। সকাল ১০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার মানুষ সমাবেশে উপস্থিত হয়। সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয়ে যায়। জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছে এ গুজব শুনে মিছিল দ্রুত নবাবপুরের দিকে ধাবিত হয়। হাইকোর্টে পুলিশের সাথে সংঘাতে না গিয়ে মিছিল আব্দুল গনি রোড ধরে যেতে থাকে। পুলিশ তখন পিছন থেকে মিছিলে হামলা চালায়। লাঠি চার্জ, কাঁদুনে গ্যাস ও গুলি চালায়। পুলিশের সাথে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ বাঁধে ঢাকা কোর্টের সামনে। এখানেও পুলিশ ও ইপিআর গুলি চালায়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হন বাবুল এবং বাস কন্ডাক্টর মোস্তফা। গৃহভৃত্য ওয়াজিউল্লাহ গুরুতর আহত হয় এবং তিনি ১৮ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর কার্যত ছাত্রসমাজের অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ঐ দিনের বিক্ষোভ মিছিলে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই প্রধান হয়ে ওঠে।ওই দিন শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে মিছিলের উপর পুলিশ হামলা চালায়। টঙ্গিতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে হত্যা করে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিককে।
১৭ সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড দমন-পীড়ন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও ছাত্রসমাজ আন্দোলন অব্যাহত রাখে। একপর্যায়ে সরকার নমনীয় হতে বাধ্য হয়। ছাত্রসমাজ ও আন্দোলনকারী জনগণের পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর গোলাম ফারুকের সাথে আলোচনায় বসেন।
২৪ সেপ্টেম্বর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বপ্রথম পল্টন ময়দানে জনসভা আহ্বান করে। ঐ জনসভা থেকে সরকারের প্রতি ‘চরমপত্র’ দেওয়া হয়।
ইতোমধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে গভর্নর গোলাম ফারুকের কয়েক দফা বৈঠক হয়। ছাত্রসমাজের এই ‘চরমপত্র’ দেওয়ার তিন দিন পর, সরকার শরীফ কমিশন রিপোর্ট স্থগিত ঘোষণা করে। ডিগ্রি কোর্সের ছাত্রদের, যাদের দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল এবং তৃতীয় বর্ষে উঠেছিল তাদের বিনা পরীক্ষায় সবাইকে পাস ঘোষণা করা হয়। গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের মুক্তি দেওয়া হয়।
অবশেষে বিজয়ের ভেতর দিয়ে বাষট্টির গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে।
১৯৬৩ সাল থেকে ছাত্রসমাজ ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটিকে প্রতিবছর ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
১৭ সেপ্টেম্বর জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শেখ ফজলুল হক মণি সহ অন্যদেরকে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর এর আন্দোলনের শহীদ বাবুল, মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহ কে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে।
ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকা নির্মাণে শেখ ফজলুল হক মণির অবদান।
১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশন আন্দোলনের ফলে স্বৈরাচার আইয়ুব সরকার মার্শাল ল প্রত্যাহার করে মৌলিক গণতন্ত্র ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
এ সময় ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনি আবার সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি আধুনিক চিন্তাধারার সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের প্রতিবাদী কৌশল অবলম্বন করে ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম এবং পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। যে কারণে ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকা তৈরির ইতিহাসে শেখ ফজলুল হক মণি'র আকণ্ঠ দেশপ্রেম ও বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রতিবাদী কল্পকাহিনি গচ্ছিত রয়েছে।
১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের জাতীয় কাউন্সিল আহ্বান করে নতুনভাবে ছাত্র রাজনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ছাত্রলীগের দলীয় পতাকা এবং মনোগ্রাম প্রকাশের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলার অর্থ-সম্পদ, ন্যায্যতা লুণ্ঠনের প্রতিবাদে সংগ্রামের প্রতীকী বার্তা দেন শেখ ফজলুল হক মণি।
তাঁর অনুরোধেই দেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকার মৌলিক ধারণা প্রণয়ন করেন। এ কাজে সহযোগী হিসেবে যুক্তি-পরামর্শদান করেন বিখ্যাত বাংলা লৌকসাহিত্য শিল্পী অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন।
শেখ ফজলুল হক মণির দেশপ্রেমে সংগ্রাম ও প্রতিবাদের কৌশলগত রূপরেখায় চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক ও চিরায়িত বাংলার ঐতিহ্য নৌকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছাত্রসংগঠনের মনোগ্রামের মধ্যাংশে নৌকার আকৃতি ব্যবহার করেন। তৎকালীন পূর্ব বাংলার সোনালি আঁশ ছিল ‘পাট’। যেহেতু পূর্ব বাংলার কৃষি খাতের স্বর্ণালি ফসল পাটের রপ্তানীকৃত লাভজনক অর্থের বেশির ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা অন্যায্যভাবে নিয়ে যেত; সেই প্রতিবাদে ছাত্রলীগের মনোগ্রামের দুই পাশে পাট পাতা আকৃতির ব্যবহার করা হয়েছে এবং শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির উদ্দেশ্য সামনে রেখে তিন তারকা চিহ্ন এবং স্পষ্ট বাংলা অক্ষরে ওপরে পূর্ব বাংলা ও নিচে ছাত্রলীগ লিখে চিরায়িত বাংলার ঐতিহ্য গাঢ় সবুজ রঙের পটভূমি ব্যবহারে করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম প্রস্তুত করা হয়েছিল।
একই চিন্তাধারায় শেখ ফজলুল হক মণির পরামর্শক্রমে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে শান্তির রং সাদা পটভূমিতে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে তিনটি অগ্নিশিখা চিহ্নের ওপর শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির মন্ত্রে লাল রঙের তিন তারকা চিহ্নের রূপ দিয়ে ছাত্রলীগের দলীয় পতাকার আকৃতি নিরূপণ করেছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন।
অবশ্য শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের এই রূপকল্প অনুযায়ী ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকা তৈরির শিল্পকর্মে শেখ ফজলুল হক মণির সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের প্রতিবাদী বার্তায় বাঙালির ন্যায্য অধিকার লুণ্ঠনের চিত্রকর্ম চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুললেন তাঁরই ছাত্র তখনকার নামকরা চিত্রশিল্পী হাশেম খান যা আজও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এভাবেই বাঙালি জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী পথচলায় ছায়াসঙ্গী হয়ে স্বাধীনতাসংগ্রামের বীজ বপনে ধারাবাহিকভাবে অবদান রাখেন শেখ ফজলুল হক মণি।
৬ দফা আন্দোলন ও শেখ ফজলুল হক মণি
মুজিববাদ একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক মতবাদ। এ মতবাদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রচারিত রাজনৈতিক দর্শন ও মূল্যবোধের সমষ্টি, যার প্রতিটি স্তরেই রয়েছে সুখী-সমৃদ্ধ, মানবিক বাংলাদেশ গড়ার কথা। মুজিববাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ‘সোনার বাংলা’ কায়েম করা। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা মুজিববাদের চার স্তম্ভ।
১৯৭২ সালের সংবিধানে মুজিববাদের চার স্তম্ভ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি হিসাবে গৃহীত হয়েছে। ৪ নভেম্বর ১৯৭২ জাতীয় সংসদে সংবিধান (গৃহীত) বিল অধিবেশনের ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুজিববাদের চার মূলনীতির প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট করেছেন।
মুজিববাদের বীজ রোপিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ছয় দফায়। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ছিল বাংলার কৃষক, শ্রমিক, মজুর, মধ্যবিত্ত তথা জনসাধারণের মুক্তির সনদ। বাঙালি জাতির স্বকীয় মহিমায় আত্মপ্রকাশ আর আত্মনির্ভশীলতা অর্জনের চাবিকাঠি ‘ছয় দফা’ শোষকের হাত থেকে শোষিতের অধিকার ছিনিয়ে আনারও হাতিয়ার।
ছয় দফার অন্যতম দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের সম্মেলনের পূর্বদিন সাবজেক্ট কমিটির সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করলে সম্মেলনের উদ্যোক্তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। পরের দিন পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় ছয় দফা সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসাবেও চিত্রিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু ওই সম্মেলন বর্জন করেন। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ছয় দফার পক্ষে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন দেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয়। জনমত আদায় ও আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হিসাবে ‘আমাদের বাঁচার দাবি-ছয় দফা কর্মসূচি’ শীর্ষক পুস্তিকাও প্রণীত হয়।
শেখ ফজলুল হক মণি ছিলেন এ আন্দোলনের একনিষ্ঠ ও সফল সংগঠক। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচিকে জনপ্রিয় ও সফল করতে তিনি রেখেছেন যুগান্তকারী ভূমিকা। ‘ছেষট্টির সাত জুন-প্রস্তুতি পর্ব’ নিবন্ধ পাঠে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু জেলে থাকায় এবং মওলানা ভাসানীর ন্যাপসহ আরও কিছু সংগঠনের আপত্তি থাকায় ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন আদায় এবং হরতাল সফল করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। ৭ জুন ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ওই নিবন্ধে শেখ মণি লিখেছেন, ‘...জেলখানা থেকে বঙ্গবন্ধু জানতে চেয়েছেন হরতালের প্রস্তুতি কতদূর কী হলো সেটি সম্পর্কে। গভীর রাতে পেছনের দেওয়াল টপকিয়ে ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গেলাম। মামিকে বিস্তারিতভাবে সবকিছু জানিয়ে বললাম রাতের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য। হরতাল হবেই।’ ‘মানিক মামার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি বললেন, ইত্তেফাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও তিনি পিছপা হবেন না। শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য তিনি সবকিছু করবেন।’
১৯৬৬ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ মাজহারুল হক বাকি ও আব্দুর রাজ্জাক। শেখ মণি ঢাকা- নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের পথসভা ও গেট সভা করতে বললেন এবং সমস্ত ঢাকাকে ১১টা ভাগে ভাগ করে দায়িত্ব বণ্টন করে দিলেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে মুনিরুল ইসলাম, আলী আহমেদ (চুনকা ভাই), গোলাম মূর্শীদ (এস.সি.এ), আনসার সাহেব, চকবাজারের রিয়াজুদ্দিন ও নাজিরা বাজারের সুলতান সাহেব, ফজলুর রহমান, নিজাম সাহেব পুরাতন ঢাকার। নতুন ঢাকার কর্মীদের পরিচালনা জন্য আনোয়ার চৌধুরী, ময়েজউদ্দিন আহমেদ, নুরুল ইসলাম। মিসেস আমেনা বেগম ও গাজী গোলাম মোস্তফা সবকিছু দেখা শুনা করার দায়িত্ব দিলেন। ছাত্রদের ১১টা গ্রুপের সার্বিক নেতৃত্বের ভার দিলেন মিজান চৌধুরীকে।
৭ জুনের হরতালকে সফল করতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিকদের সংগঠিত করেছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি।
ওই হরতালে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে টঙ্গী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ কমপক্ষে ১১ জন বাঙালি শহিদ হয়েছেন। ইতিহাসবিদরা বলেন, ৭ জুনের হরতাল সফল না হলে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম পিছিয়ে যেত। ছয় দফা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকার কারণে শেখ মণির বিরুদ্ধে হুলিয়া জারিসহ আটটি মামলা করা হয়েছিল।এবারেও তাঁকে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ দুই বছর আট মাস কারান্তরীণ রাখা হয়।
‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘ছয় দফা প্রস্তাব জনগণের সামনে পেশ করার পর থেকে সরকার আমার ওপর অত্যাচার চালাইয়া যাচ্ছে। ...আমার ভাগনে শেখ ফজলুল হক মণি ও আরও অনেকে ১৯৬৬ সাল থেকে জেলে আছে এবং সবার বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কারারুদ্ধ থাকা অবস্থায় ১৯৬৯ সালে বাঙালির গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তিলাভ করেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বিভিন্ন প্রসঙ্গে শেখ ফজলুল হক মণি
বঙ্গবন্ধু ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থের ২০২, ২০৯, ২১০, ২১৩, ২২৩, ২৩৫, ২৪০, ২৮১, ২৪৮, এবং ২৬৩ নং পৃষ্ঠায় বিভিন্ন প্রসঙ্গে শেখ ফজলুল হক মণি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ছাত্র নেতৃত্ব দিতে গিয়ে, স্বাধিকার আন্দোলন সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার কারণে শেখ মণিকে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কারাভোগ করতে হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে ধারাবাহিকভাবে কারাজীবনের কথা তুলে ধরা হয় সেখানে দুটি খাতা ছিলো। প্রথম খাতাটা ১৯৬৬ সালে লেখা আর দ্বিতীয় খাতাটা ১৯৬৭ সালে। দ্বিতীয় খাতায় কারাগারের জীবনযাপন, ব্যক্তিগত ভাবনা, পারিবারিক কথা ছাড়াও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অনেক কথাই এ খাতায় লিখেছেন।
কারাবাসের নির্মম জীবনকথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন: “ন্যাপের হালিম, ভাগ্নে মণি পুরানা হাজত থেকে তারা এসেছে। এক জেলে থাকি আমার ভাগ্নে আমার সাথে দেখা করতে পারে না। কি বিচার!” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ.২০২)। ১৯৬৭ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বেগম মুজিব, শেখ রেহেনা ও শেখ রাসেল জেল গেটে জন্মদিনের কেক আর ফুল নিয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু বলেন, “রাসেলকে দিয়েই কাটালাম, আমিও হাত দিলাম। জেল গেটের সকলকে কিছু কিছু দেওয়া হলো। কিছুটা আমার ভাগ্নে মণিকে পাঠাতে বলে দিলাম জেলগেটে থেকে। ওর সাথে তো আমার দেখা হবে না, এক জেলে থেকেও।” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ২১০)।
‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘ছয় দফা প্রস্তাব জনগণের সামনে পেশ করার পর থেকে সরকার আমার ওপর অত্যাচার চালাইয়া যাচ্ছে। ...আমার ভাগনে শেখ ফজলুল হক মণি ও আরও অনেকে ১৯৬৬ সাল থেকে জেলে আছে এবং সবার বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে।’