11/11/2019
অনুবাদকের কথা
যাহার উত্থান আছে তাহারই পতন
শূন্যেতে উত্থিত তির থাকে কি কখন?
সমাজবিশ্লেষক আল্লামা ইবনু খালদুন বলেন, ‘যখন কোনো সভ্যতা শিকড় থেকে শিখরে পৌঁছে যায় তখন তার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।’ মহাকালের ইতিহাস এ বক্তব্য সত্য বলে প্রমাণ দেয়। ইতিহাস আমাদের জানায়, পৃথিবীতে একসময় দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল ফারাও সভ্যতার, মায়া সভ্যতার, সেমেটিক সভ্যতার, জরথুস্ত্রীয় সাসানি সভ্যতাসহ রোমান বাইজেন্টাইন সভ্যতার; কিন্তু কালের অমোঘ থাবায় প্রতিটি সভ্যতা উন্নতির শীর্ষে পৌঁছার পর আশ্রয় নিয়েছে ইতিহাসের ভাগাড়ে।
মহাকালের নিয়মানুযায়ী পতনের এ ধারা থেকে রক্ষা পায়নি ইসলামি খিলাফত এবং সালতানাতব্যবস্থাও। কালের নির্মম থাবায় তার জায়গা দখল করে নেয় সেকুলার পাশ্চাত্য সভ্যতা। ইতিহাসের সূক্ষ্ম-সন্ধানী পাঠক নিশ্চয় স্বীকার করবেন, বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তিকে পশ্চিমা সভ্যতা নেতৃত্বের শিখর স্পর্শ করার পর ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে পতনের সূচনা। পতন পূর্ণতায় পৌঁছাতে হয়তো আরও অর্ধশতাব্দী কিংবা শতাব্দীকাল লাগবে; কিন্তু পতন যে শুরু হয়ে গেছে এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নাই।
পৃথিবীকে শাসন-করা একটা রাষ্ট্রশক্তি কীভাবে উন্নতির স্বর্ণ শিখরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শিকার হয় পতনের নির্মম থাবার, সে প্রসঙ্গে কথা বললে বলতে হয়—সভ্যতার উত্থানের নেতৃত্বে যারা থাকেন তারা হন নিজেদের দর্শনের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী। নিজেদের আদর্শ ও দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় থাকেন সক্রিয়। সভ্যতার গোড়ায় শক্তি জোগাতে জোগাতেই নিঃশেষ হয়ে যায় তাদের জীবন-পরিধি। তারপর আসে তাদের অনুসারী পরবর্তী প্রজন্ম। তারাও হয়ে থাকে বাপদাদার দর্শনের প্রতি আন্তরিক এবং প্রচার-প্রসারে সক্রিয়। কারণ, তারা অনুধাবন করতে পারে এই সভ্যতা ও শক্তি অর্জনে তাদের বাপদাদা ঝরিয়েছে কত রক্ত আর ঘাম। ফলে তাদের চেষ্টা-প্রয়াসের মাধ্যমে সভ্যতা হয়ে ওঠে সুশোভিত ও সুদৃঢ়।
তাদের পর আসে তৃতীয় প্রজন্ম। এরা কিন্তু অতীত প্রজন্মের মতো কর্মতৎপর ও আন্তরিক থাকে না। কারণ, মানব-প্রজাতির স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সুখসময়ে তাদের কর্মতৎপরতায় ভাটা পড়ে। এরা যেহেতু শৈশব থেকেই গড়ে ওঠে সুখী ও সমৃদ্ধ পরিবেশে, সেহেতু আন্দাজ করতে পারে না পূর্বসূরিদের প্রাণপাত প্রয়াসের বিষয়টা। এভাবে একসময় প্রজন্মটি হয়ে যায় বিলাসী ও ভোগ-কাতর। তাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়ে অবাধ যৌনতা। নারীরা হয় লাগামহীন স্বাধীন। ভবিষ্যতের চিন্তা থেকে তারা থাকে উদাসীন। শক্তি-কাঠামোর প্রতিটি অঙ্গে ছেয়ে যায় দুর্বলতা। আর পতনের এসব ঘুণপোকাগুলোই ক্রমান্বয়ে নিঃসার করে তোলে প্রবল পরাক্রান্ত শক্তি ও সভ্যতার কাঠামো। ধীরে ধীরে কালের নির্মম কষাঘাত আর অমোঘ বিধানে সভ্যতাটির জায়গা হয় ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে।
একটা সভ্যতা যখন উন্নতির শীর্ষে পা ঝুলিয়ে বসে, তখন তার অবস্থা কোন পর্যায়ে উপনীত হয়, এই সুস্পষ্ট চিত্রপাঠ আমরা কুরআন থেকেও নিতে পারি। কুরআনের সুরা ইউসুফে বর্ণিত ফারাও সভ্যতার আলোচনা আমাদের এসব জানিয়ে দিয়েছে। ইউসুফ আ.-এর যুগে পাশের কেনানি সম্প্রদায় যখন যাযাবর-জীবন কাটাচ্ছিল, তখন মিসরিরা তাদের মানমন্দিরে বসে চর্চা করছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান। কিন্তু একটা সময় তাদের সে আকাশস্পর্শী সভ্যতা গ্রাস করে নেয় ভোগ ও নারীবিলাস। নারীরা হয়ে যায় একেবারে স্বাধীন।
পতনের এসব কারণ যেকোনো সভ্যতায় দেখা দিলে নিঃশেষে তার অনিবার্য ফল হয় ধ্বংস। তবে ইসলামি সভ্যতা এবং অন্যান্য সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য হলো, মানুষের খেয়াল-খুশিতে গড়ে-ওঠা সভ্যতার পেছনে ঐশী মদদ না থাকায় তা চিরতরে হারিয়ে যায়। কিন্তু ইসলামি সভ্যতার পেছনে ঐশী মদদ থাকায় তা একেবারে হারিয়ে যায় না। আল্লাহর বলে দেওয়া উন্নতির মাধ্যমগুলো অনুশীলন করলে মুসলিম জাতি পতনের পরও সেই ধ্বংসস্তূপে গড়ে নিতে পারে ইসলামি সভ্যতার মজবুত ও নয়নাভিরাম প্রাসাদ। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ আলোচ্য গ্রন্থ দ্য অটোমান এম্পায়ার-এর বিষয়বস্তু।
বলা হয়, উসমানিদের আগ পর্যন্ত জগৎ-ইতিহাসে মানবসভ্যতার উপর মানুষ কর্তৃক যে ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে গেছে এর মধ্যে দুটি ধ্বংসযজ্ঞের কোনো তুলনা ছিল না—একটি ইয়াহুদি জাতির উপর বুখতে নাসার (নেবুচাদ নাজার) কর্তৃক ধ্বংসযজ্ঞ, অপরটি মুসলিমদের উপর তাতারদের ধ্বংসযজ্ঞ। তাতারদের ধ্বংসতাণ্ডবে বাগদাদ পরিণত হয় পুরা কাহিনিতে। ৪০ লাখ মানুষের গোরস্থানে পরিণত হয় প্রাচী-প্রাতিচী সভ্যতার প্রসূতি বাগদাদ। যে খলিফা ও আমিরগণ মুসলিমবিশ্বকে তাতার দানবদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নর্তকি আর মদের আসরে মগ্ন ছিল, খিলাফতের আসন দখল করে আল্লাহর দীনকে নিয়ে তামাশা করছিল হালাকু খান সহজভাবে তাদের হত্যা করেনি; পাগলা হাতি দিয়ে মাড়িয়ে, ঘোড়ার পায়ে পিষে, বস্তায় পেছিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে, পিটিয়ে, কুপিয়ে নানাভাবে হত্যা করে। তাদের সুন্দরী স্ত্রী-কন্যাদের দাসী হিসেবে রেখে বাকিদের হত্যা করে।
যে আলিমগণ দীনকে যশখ্যাতি আর অর্থোপার্জনের অবলম্বন বানিয়েছিল, অনর্থক তর্ক-বিতর্ক করে আল্লাহর দীনকে উপহাসের পাত্রে পরিণত করেছিল, নিজেদের মধ্যে ফিরকাবাজি করে সার্বক্ষণিক দাঙ্গায় ইন্ধন জুগিয়েছিল, তাতাররা তাদের সামনে তাদের স্ত্রী-কন্যাকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে। সুন্দরীদের বেছে নিয়ে দাসী বানায়। আর আলিমদের টুকরো টুকরো করে রাস্তায় ফেলে রাখে; অথবা দিজলার পানিতে ভাসিয়ে দেয়। পরিণতিতে তারা হয় স্থলজ ও জলজ প্রাণীর খাদ্যে।
নগরী ধ্বংস করার পর হালাকু খান যখন জানতে পারে মাটির নিচে গুপ্ত কক্ষে কিছু লোক আত্মগোপন করে আছে, তখন সে দিজলার বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার হুকুম দেয়। ফলে তাদেরও সলিলসমাধি ঘটে। তাতাররা তিলোত্তমা বাগদাদ এমনভাবে ধ্বংস করে যে, সৃষ্টির শুরু থেকে নক্ষত্রমণ্ডল পৃথিবীর বুকে এমন বীভৎস ধ্বংসলীলা আর কখনো দেখেনি।
কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের উপর কীভাবে বেড়ে উঠল উসমানিদের বিশাল ইসলামি সভ্যতা, কীভাবে পৌঁছাল উন্নতির শীর্ষে, এরপর কোন কোন ঘুণপোকা কুড়ে কুড়ে খেল তাদের সে বিশাল সভ্যতা, কীভাবে আছড়ে পড়ল পতনের বেলাভূমে; মুসলিম জাতি কোন মাধ্যম গ্রহণ করলে আবারও ফিরে পাবে তাদের গৌরবময় অতীত, সে লক্ষ্যে কী করা দরকার, কী পরিহার করা প্রয়োজন, সেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে বর্তমান বিশ্বের আলোচিত ইতিহাসবিদ ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবির আদ দাওলাতুল উসমানিয়া আওয়ামিলুন নুহুজ ওয়া আসবাবুস সুকুত নামক গ্রন্থে।
খিলাফতব্যবস্থা পতনের শতাব্দীকাল পর বর্তমান সময়ে আমরা যখন একেবারে অন্ধকার সময় পার করছি, যখন আমাদের যুবশ্রেণির কাছে খেলার খবর আর পচা রাজনীতির বিষয় পঠনসূচির মুখ্য উপাদান, যখন ইতিহাস তাদের কাছে অপাঠ্য একটি বিষয়, সেই কঠিন মুহূর্তে ব্যবসায়িক ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কালান্তর প্রকাশনীর কর্ণধার প্রিয় আবুল কালাম আজাদ যে দুর্বার সাহস বুকে নিয়ে জাতির সামনে একের পর এক ইতিহাসগ্রন্থ পেশ করে যাচ্ছে, তাতে সে অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। আল্লাহ তাঁর খেদমত কবুল করুন।
ইতিহাস ফিরে আসে বলে একটা কথা চালু আছে। কথাটা অসত্য নয়। হয়তো আবুল কালাম আজাদের মতো যুবকদের প্রয়াসেই সে ধারা সূচিত হতে পারে।
ইতিহাসের মতো তাত্ত্বিক বই রচনা কিংবা অনুবাদের জন্য যে নিবিড় সময়ের প্রয়োজন নানাবিধ ব্যস্ততায় আমি তা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। তাই ভুল-ত্রুটি থাকাটা একেবারে স্বাভাবিক। তারপরও প্রিয় ভাই সালমান মোহাম্মদের অশেষ শুকরিয়া, সে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে বইটি দেখে দিয়েছে। আল্লাহ তাঁর ইলম ও আমলে বরকত দিন।
আমরা বার বার বলে এসেছি এবং বিশ্বাসও করি যে, লেখক, অনুবাদক, প্রকাশক, সম্পাদক, মুদ্রক, বাঁধাইকারী, পরিবেশক, পাঠক—এককথায় বইসংশ্লিষ্ট সবাই একই পরিবারভুক্ত। একে অন্যের সম্পূরক। একটা বই যথাসম্ভব নির্ভুলভাবে পরিবেশন করা প্রকাশকের দায়িত্ব; আর পাঠকের দায়িত্ব হচ্ছে গঠনমূলক সমালোচনা। আমরা আমাদের পাঠকশ্রেণির কাছ থেকে তা-ই প্রত্যাশা করব। ইনশাআল্লাহ যেকোনো ভুল পরবর্তী সময়ে শোধরে নেওয়া হবে। আল্লাহ আমাদের সকলের প্রয়াস কবুল করুন। উত্তম জাজা দিন। আমিন।
আবদুর রশীদ তারাপাশী
১৮ অক্টোবর ২০১৯
বই : দ্য অটোমান এম্পায়ার (১ম ও ২য় খণ্ড)
[উসমানি খিলাফতের ইতিহাস]
ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি
অনুবাদ : আবদুর রশীদ তারাপাশী
প্রকাশক : কালান্তর প্রকাশনী
মুদ্রিত মূল্য : ১,০০০/-
প্রি-অর্ডার মূল্য : ৬৫০/-
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৮৮০
01765735638