11/08/2020
“ডা. মুশফিকুর রহমান পিন্টু: মানবতার সেবায় একজন অবিদিত কাণ্ডারি”
পুরো বিশ্বজুড়ে চলমান রয়েছে এক মহাদূর্যোগ; অদৃশ্য এক শত্রুর আচ্ছাদনে ছেঁয়ে গেছে জনজীবন। শত্রুর এই করালগ্রাসে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া মানবজাতি কোনো উপায়ান্তর খুঁজে না পেয়ে, বেছে নিয়েছে গৃহবন্দীত্ব। এই সে-ই বন্দীত্ব, যা প্রতি শতকেই এক-আধবার পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে আগেও। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস হতে শিক্ষা নেবার মতো চৌকসী নজির তৈরি হয়নি এ পৃথিবীর বুকে। কোভিড-১৯ নামক এই অতিমারী রুখতে তাই ছিলো না আহামরী কোনো প্রস্তুতি। হোঁচট খেয়ে টনক নড়েছে, মানবজাতি বুঝতে পেরেছে সে হোঁচট খেয়েছে, এবার উঠে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু উঠে দাঁড়ানোর নিয়ম যে, সে জানে না। হাঁটতে শুরুর আগেই যদি হোঁচটের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রাখতো সে, তাহলে এই অতিমারী হয়তো আজ দেখতেই হতো না আমাদের।
অতিমারীর হাত থেকে বাঁচতে আমরা সাধারণেরা গ্রহণ করেছি গৃহবন্দীত্ব, কিন্তু চিকিৎসাপেশায় ব্রতী মানুষেরা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে গেছেন মানব-ঢাল সৃষ্টি করে। জীবনের পরোয়া না করে, পরিবার-পরিজন ছেড়ে হাসপাতালগুলোতে লড়াই করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। এরও কোনো নিশ্চয়তা নেই যে, যুদ্ধক্ষেত্রের এই সম্মুখ প্রাঙ্গন হতে একজন যোদ্ধা একদিন নিরাপদে নিজ ঘরে ফিরতে পারবেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের অব্যক্ত গল্পগুলো বলতেই আমাদের প্রাণপ্রিয় ‘সন্ধানী’-র পক্ষ হতে নিয়মিত এ আয়োজন। এরই ধারাবাহিতকতায়, আজ পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি, কোভিড-১৯ যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখ প্রাঙ্গনে আসীন ডা. মুশফিকুর রহমান পিন্টু-র সাথে।
আধুনিক শল্যচিকিৎসা-র অন্যতম একটি ভিত্তি হলো অ্যানেস্থেশিয়া। একটা সময় ছিলো, মানুষ সহজে শল্যচিকিৎসা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে চায়তো না। জীবন-মরণের প্রশ্নেই কেবল মানুষকে রাজী করানো সম্ভব হতো। তৎকালীন শল্যচিকিৎসা-র স্মৃতিকে একজন রোগী আর কখনো ভুলতে পারতো না।
শল্যচিকিৎসায় রোগীকে ব্যথামুক্ত করতে থমাস গ্রিন মর্টন নামক একজন চিকিৎসক যে ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায়, ডা. পিন্টু ভাইয়ার মতো বহু অ্যানেস্থেশিওলজিস্টের আপ্রাণ আরাধনায় আমরা পেয়েছি আধুনিক অ্যানেস্থেশিওলজি।
হ্যাঁ, আমাদের সকলের প্রিয় ডা. পিন্টু এমনি একজন চিকিৎসক; একজন অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট। বর্তমানে তিনি কর্মরত রয়েছেন, সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও করোনা ডেডিকেটেড শহীদ ডা. শামসুদ্দীন সদর হাসপাতালে। সম্মুখ সমরের একজন যোদ্ধা হিসেবে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন হাসপাতালের আই.সি.ইউ বিভাগে। সেই সাথে নিয়মিত অপারেশন থিয়েটারেও রোগীর প্রতি সকল ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে দিয়ে যাচ্ছেন অ্যানেস্থেশিয়া সাপোর্ট। জনজীবন থেমে গেলেও একজন চিকিৎসকের থেমে যাবার ফুসরৎ নেই। এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা সামগ্রীর অপ্রতুলতা, তা-ই বলে সেবাদান কার্যক্রম থামিয়ে রাখলে চলবে কেন হে! যথাসাধ্য করে নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে তবেই রোগীর মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন ডা. পিন্টু।
তিনি শুধু ভাবেন, একজন রোগী যখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাবে, হাসিমুখে সে তার হাসপাতালের অভিজ্ঞতাগুলো বর্ণনা করবে; এসবের মাঝেই লুকিয়ে থাকবে তাঁর নির্মল সার্থকতা।
ডা. পিন্টু এস.এস.সি পাশ করেন ১৯৯৬ সালে, ঢাকাস্থ ‘হযরত শাহ্ আলী মডেল হাই স্কুল’ হতে। পরবর্তীতে নিজ কৃতিত্বকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিতে, ভর্তি হন ‘নটর ডেম কলেজ’-এ। সেখান থেকে এইচ.এস.সি পাশ করেন ১৯৯৮ সালে। একই বছর, চিকিৎসক হবার আজন্ম স্বপ্ন বুকে নিয়ে, নানাজান ও মামার উৎসাহ-অনুপ্রেরণা সাথে নিয়ে ভর্তি হন সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে।
ভর্তি হয়েই নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিবলে শুরু করেন এক যজ্ঞ। এ-ই তো সময়, নিজেকে প্রস্তুত করবার; একদিন যে মানুষের সেবায় বিলিয়ে দিতে হবে নিজের এ বিদ্যা। হাজারো মানুষেরা সেবায় নিয়োজিত হবার স্বপ্ন চোখে নিয়ে তিনি চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। আর সেই পড়াশোনা-র পাশাপাশি নাম লিখিয়েছেন মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থী দ্বারা পরিচালিত সংগঠন ‘সন্ধানী’-র খাতায়। সন্ধানী-র মানবসেবামূলক কার্যক্রমগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জুড়ে নিয়েছেন নিজেকেও। ছাত্রাবস্থাতেই ডা. পিন্টু-র মনে মানবসেবার যে জ্বালানী তৈরি হয়েছিলো, তা যেন আজও জ্বলছে। নিজ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ, সন্ধানী সিওমেক ইউনিটের কার্যকরী পরিষদে একাধিক পদপ্রাপ্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন; এগুলোর মাঝে ‘ছাত্র কল্যাণ সম্পাদক’, ‘প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক’, ‘সাধারণ সম্পাদক’, ‘কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির একজন সম্মানিত উপদেষ্টা হিসেবে বহাল রয়েছেন।
সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হতে পাশ করে একজন চিকিৎসক হয়ে পরবর্তী যাত্রা শুরু করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে; সেখানে তিনি অ্যানেস্থেশিয়া বিভাগে ডিপ্লোমা ডিগ্রী অর্জন করেন। এছাড়াও, বিসিএস দিয়ে একজন স্বাস্থ্যক্যাডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে; একজন ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসার হিসেবে।
দুই সন্তানের জনক ডা. পিন্টু অবসর সময়গুলো পরিবারের সাথে কাটাতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কিন্তু এই মহাদূর্যোগে সেটিও হয়তো সবসময় সম্ভবপর হয়ে উঠে না। ডা. পিন্টু-র এ ত্যাগী জীবনযাত্রায় চিরসঙ্গীনী হয়েছেন স্ত্রী ডা. মাহমুদা আক্তার, যিনি নিজেও একজন সহকারী সার্জন।
কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে জনজীবন থমকে দাঁড়ালেও থেমে নেই হাসপাতালের কাজ। সকল চিকিৎসক নিজ নিজ অবস্থান হতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে চলেছেন। তাঁদের ত্যাগগুলো সাধারণ মানুষ বুঝুক, আর না-ই বা বুঝুক; চিকিৎসাপেশায় সংগ্রামী বলীয়ানেরা নিজ দায়িত্ব ছেড়ে পিছিয়ে দাঁড়াবে না। আমরা কি সামান্য ধন্যবাদজ্ঞাপনও করতে পারি না! সম্মুখ সমরপ্রাঙ্গনে আমাদের পক্ষ হয়ে লড়াই করে চলা প্রতিটি চিকিৎসক আমাদেরই ভাই-বোন, আমাদের দেশের সম্পদ।
আপনি কাঁটা দিয়ে আঘাত করবেন, আর একজন চিকিৎসক এর সাথে জুড়ে থাকা ফুলটুকুকেই উপহার ভেবে তুলে নিবে। এমনই জীবন, এমন জীবনেরই প্রতিজ্ঞা, মানবসেবায় বিলিয়ে দেয়া এমনই এক বিশাল গল্পগাঁথা।
লেখকঃ এস. এম. মইনুল কবির (সন্ধানী সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ইউনিট)