05/06/2026
ইসলামে বিধানদাতা কে? আল্লাহ নাকি রাসূল?
রাসূল কি স্বাধীন আইনপ্রণেতা, নাকি ওহীর অনুসরণ ও বাস্তবায়নকারী?
শয়তানের সূক্ষ্ম ফাঁদ!
বর্তমান মুসলিম সমাজে অতিভক্তির আড়ালে এমন কিছু আকিদা ঢুকে পড়েছে, যা প্রকারান্তরে আমাদের শিরকের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, রাসূল স্বাধীনভাবে যেকোনো বিধান দিতে পারতেন। অর্থাৎ, আল্লাহর মতোই রাসূলের আদেশ নির্দেশ ও বিধান দেওয়ার এখতিয়ার ছিলো।
কিন্তু, পবিত্র কোরআন কী বলে এ ব্যাপারে ?
চলুন, বিষয়টিকে কোরআনের আলোকেই খতিয়ে দেখি -
১. "রাসূল যা দেন তা গ্রহণ কর" আয়াতটির আসল প্রসঙ্গ কী?
"আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে 'ফায়' হিসেবে যে সম্পদ দিয়েছেন তা আল্লাহর, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীন ও পথচারীদের জন্য, যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে ।
(সূরা আল-হাশর, ৫৯:৭)
এরপর বলা হয়েছে - "রাসূল তোমাদের যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর, আর যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।"
( সূরা আল হাশর ৫৯:৭ )
বাস্তবতা - এই আয়াতের মূল প্রসঙ্গ ছিল 'ফাই' বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন।
রাসুলের প্রশাসনিক ও বিচারিক সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার নির্দেশ এটি।
ভিত্তি কী? রাসুল নিজের ইচ্ছায় কোনো নির্দেশ দিতেন না।
[বলুন] " আমার প্রতি যা ওহীরূপে প্রেরণ করা হয়, আমি তো শুধু তারই অনুসরণ করি"
(সূরা আন-আম: ৫০)
"বলুন, নিজ থেকে এটা বদলানো আমার কাজ নয়। আমার প্রতি যা ওহী হয়, আমি শুধু তারই অনুসরণ করি ।
আমি আমার রবের অবাধ্যতা করলে অবশ্যই মহা দিনের শাস্তির আশংকা করি।"
(সূরা ইউনুস: ১৫)
অর্থাৎ, তাঁর কর্তৃত্ব স্বাধীন নয়, ওহী-নির্ভর।
২. রাসুলের আনুগত্য মানেই আল্লাহর আনুগত্য।
"কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল, আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনাকে তো আমি তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠাই নি"।
(সূরা আন-নিসা: ৮০)
যদি রাসুলের নিজস্ব স্বাধীন আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকতো, তবে ইসলামের উৎস হতো দুটি। একটি আল্লাহর বিধান অপরটি রাসূলের বিধান।
কিন্তু, আয়াত স্পষ্ট করছে - রাসূল আল্লাহর বার্তা হুবহু পৌঁছে দেন বলেই তাঁর আনুগত্য করা মানে আল্লাহরই আনুগত্য করা।
৩. রাসুল বিচারক ছিলেন, কিন্তু আইনপ্রণেতা নন।
"অবশ্যই আমি সত্য সহকারে তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যেন তুমি যা আল্লাহ তোমাকে জানিয়েছেন, সে অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার ফায়সালা কর এবং খিয়ানতকারীদের পক্ষে তর্ক করো না।"
(সূরা আন-নিসা: ১০৫)
আজকের যুগে একজন বিচারক যেমন রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী বিচার করেন কিন্তু, নিজে আইন বানান না;
ঠিক তেমনি রাসূলও আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানের আলোকেই বিচার করতেন।
৪. হালাল-হারাম করার চূড়ান্ত মালিক কে ?
(সূরা আরাফ ৭:১৫৭)
এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, রাসূল মানবজাতির জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন। ইহুদি-খ্রিস্টানদের ওপর অতীতের যে কঠিন ধর্মীয় বোঝা ও বিধি-নিষেধ ছিল, তা সহজ করতেই রাসুলকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তবে মনে রাখতে হবে, রাসুল এই হালাল-হারামের ঘোষণা দিতেন আল্লাহর ওহী ও নির্দেশনার আলোকেই, নিজের মনগড়া প্রবৃত্তি থেকে নয়।
কারণ, আল্লাহ নিজেই অন্য আয়াতে রাসুলকে ভালোবেসে সতর্ক করে বলেছিলেন-
"হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তুমি তা কেন হারাম করছ?"
(সূরা আত-তাহরীম: ১)
সুতরাং, চূড়ান্ত আইনদাতা বা বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ-ই।
আল্লাহ আরও সতর্ক করে বলেছেন,
"আর তোমাদের জিহবা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না।"
(সূরা আন-নাহল: ১১৬)।
সুতরাং, চূড়ান্ত আইনদাতা একমাত্র আল্লাহ।
৫. তিনি নিজের প্রবৃত্তি থেকে কিছু বলেন না।
"তিনি মন গড়া কোনো কথা বলেন না।
এটি তো ওহী, যা তাঁর কাছে প্রেরণ করা হয়।"
(সূরা আন-নাজম: ৩-৪)
এই আয়াত প্রমাণ করে দ্বীনের মূল বার্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ওহী।
তবে, রাসুলের কিছু ব্যক্তিগত বা মানবিক সিদ্ধান্ত কোরআনে আল্লাহ নিজেই সংশোধন করে দিয়েছেন -
(যেমন: সূরা আনফাল: ৬৭, সূরা তাওবাহ: ৪৩)। যা প্রমাণ করে তিনি মানুষ ছিলেন এবং আল্লাহর নির্দেশনার অধীন ছিলেন।
রাসুল কি সুপারিশকারী নাকি কিয়ামতের দিন অভিযোগকারী ?
আজ আমরা উম্মত হিসেবে রাসূলের সুপারিশের আশায় বসে আছি, কিন্তু কোরআন বলছে কিয়ামতের দিন রাসূল আমাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে এক ভয়াবহ অভিযোগ দায়ের করবেন!
"আর রাসূল বলবেন: হে আমার রব! আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে পরিত্যক্ত বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেছিল।"
(সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩০)
কোরআন বাদ দিয়ে যারা নিজেদের মনগড়া দ্বীন বানায়, তাদের বিরুদ্ধে রাসুল নিজেই আল্লাহর কাছে মামলা করবেন।
আল্লাহর নামে বানিয়ে কথা বলার শাস্তি !
দ্বীনের ব্যাপারে নিজের থেকে একটা শব্দও বাড়িয়ে বলার অধিকার কি রাসুলের ছিল ?
আল্লাহ বলেন:
"আর যদি তিনি (রাসূল) আমার নামে কোন কথা বানিয়ে বলত,
তবে অবশ্যই আমি তাকে শক্তভাবে পাকড়াও করতাম,
অতঃপর অবশ্যই আমি তার জীবনধমনী / হৃদপিন্ডের শিরা (ওয়াতীন) কেটে দিতাম।"
(সূরা আল-হাক্কাহ, ৬৯:৪৪-৪৬)
যেখানে রাসূল-কে নিয়ে আল্লাহ এমন কঠিন কথা বলেছেন, সেখানে আজ কিছু মানুষ কিভাবে কোরআনের বাইরে গিয়ে দ্বীনের নামে নতুন নতুন প্রথা ও বিধান তৈরি করে?
শয়তানের সূক্ষ্ম ফাঁদ- ইহুদি-খ্রিস্টানদের পথেই কি আমরা হাঁটছি?
অতীতের আহলে কিতাবরা (ইহুদি ও খ্রিস্টানরা) তাদের নবীদের ভালোবাসতে বাসতে একপর্যায়ে আল্লাহর আসনে বসিয়ে দিয়েছিল, কেউ বা আল্লাহর পুত্র বানিয়ে নিয়েছে।
আজকের মুসলিম সমাজের বড় একটা অংশও একই ফাঁদে পা দিয়েছে।
কেউ রাসুল-পূজায় লিপ্ত হয়ে তাকে 'সর্বজ্ঞ' বা 'সব ক্ষমতার মালিক' বানাচ্ছে।
কেউ আলীকে অতিভক্তির কারণে অতিমানবীয় স্তরে নিয়ে যাচ্ছে।
এগুলো সবই শয়তানের সূক্ষ্ম চাল। আর এই চালের শিকার হয়ে অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনার পরও শিরকে লিপ্ত হচ্ছে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
"আর তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে শিরকও করে।"
(সূরা ইউসুফ ১২ : ১০৬)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না ।
এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন।
আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রচনা করে।"
(সূরা আন-নিসা, ৪:৪৮)
যারা কোরআনকে পূর্ণাঙ্গ মনে করে না, তারাই রাসূল রাসূল বলে চিল্লাইয়া কোরআনের বাইরে গিয়ে শিরকের সাগরে ডুব দেয়।
আসুন, কোরআনের এই অকাট্য সত্যকে গ্রহণ করি। রাসূলকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর মহান রাসূল হিসেবে মর্যাদা দেই, তাকে আল্লাহর সমকক্ষ না বানাই।
আল্লাহ আমাদের শয়তানের এই সূক্ষ্ম শিরকের জাল থেকে হেফাজত করুন।