27/09/2024
আজ সকালে যে মানুষটিকে আমি বলেছি "সিগারেট নিয়ে হসপিটালে ঢুকছেন কেন? ফেলে আসুন"--তিনি বাইরে গিয়ে বলবেন ডাক্তারদের ব্যবহার ভালো না।
ছোট ছোট দুতিনটা বাচ্চা নিয়ে সিসিউতে রোগী দেখতে এসেছেন যে রোগীর দুঃসম্পর্কের আত্নীয়া, যাকে আমি বলেছি, " সিসিউতে কি বাচ্চাদের আনার জায়গা? একটু পরপর এখানে রোগী মারা যায়, রোগীদের কারেন্টের শক দিই প্রায়শই এখানে, বাচ্চাটা এটা দেখলে ওর কোমল মনে এর ছাপ রয়ে যাবে না? বাইরে নিয়ে যান৷ "--তিনিও বাসায় গিয়ে গল্প করবেন বাবুকে নিয়ে গিয়েছিলাম ডাক্তার খারাপ ব্যবহার করেছে/ ঢুকতে দেয়নি।
যে মৃতপ্রায় রোগীটিকে শেষ চেষ্টা হিসেবে যখন সিপিআর দিতে দিতে ঘাম ঝরছিলো তখন আরেক রোগীর লোক ঠিক সেই মুহূর্তে এসে যখন বলে তার রোগীর অমুক সমস্যা তখন এমন স্ট্রেসফুল কন্ডিশানে 'মানুষ এতো স্বার্থপর হয় কীভাবে?' ভাবনায় আমি যখন চিতকার করে ওয়ার্ড মাথায় তুলে ফেলেছিলাম সেই লোকটিও নিজের স্বজনকে গিয়ে বলবে ডাক্তার রাগারাগি করেছে। আচাষা ব্যবহার। দেখবে না আমি আরেকজনের বাবাকে বাঁচানোর শেষ সম্ভাব্য চেষ্টাটা করছিলাম।
ভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়ার মতো বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষণে যখন রোগীকে শক দিই তখন ওয়ার্ডের সব রোগীর লোক এসে ভিড় করে। কাজ বিঘ্নিত হওয়ায় তাদের সরে যেতে যখন নির্দেশ দিলাম তাদের মুখ কালো হয়ে গেলো। তারা চা-বিড়ি খেতে খেতে চায়ের দোকানে আমাকে গালি দেবে।
এক রোগীর সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় আমরা যখন তার পাশে থাকি, তখন আরেক রোগীর লোক এসে তার রোগীর সমস্যা যখন বলা শুরু করে বা রিপোর্টটা দেখানো শুরু করে তখন আমরা বলি পরে দেখব। তখন তারা গজমজ করে বলে ডাক্তারদের ডাকলে পাওয়া যায় না৷ ডাক্তাররা আসতে চায় না।
রোগী ভর্তি করিয়েই যখন ইন্টার্নদের রিসিভ করার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি আমার কছে চলে এসে বলে এক্ষুণি আসেন, তখন আমি যদি বলি ৪৩৫ নম্বর রুমের ডাক্তার সাহেবের কাছে যান তারা বলে আমরা এখান থেকে ওখানে ঘুরাই। রোগী দেখতে চাই না।
এক রোগীর লোকের সাথে যখন ১০-১৫ জন বসে থাকে রাউন্ডের সময় সিসিউর ভেতর, যখন আমি বলি ১ জন শুধু থাকুন বাকিরা বাইরে যান, আমার প্রফেসরের সামনে রোগীর ইয়াং এটেন্ডেন্ট যখন রোগীর বিছানাতেই পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকে, আমি যখন বিছানা থেকে নামতে নির্দেশ দিই, বলি রোগীর বিছানায় বসা নিষেধ--ডাক্তারের ব্যবহার ভালো না...
ডাক্তারদের লিফটের সামনে অনেক রোগীর লোক গোলমাল করে দাঁড়িয়ে থাকে। এসব দেখে বেশিরভাগ সময় হেঁটেই উঠি ঘামতে ঘামতে। যদি কখনও প্রয়োজন হয় যখন সরে যেতে বলি, তখনও ঠেলাঠেলি করে গায়ের উপর উঠে গেলে যখন বলি এটা তো ডাক্তারদের লিফট, আপনাদের লিফট তো ঐপাশে--তখন ডাক্তার অহঙ্কারী হয়ে যায়।
হসপিটালের মাঝখানে পায়ের সামনে রোগীর লোক থুথু ফেললে/পানের পিক ফেললে যদি ডাক্তার বিরক্ত হয়, ডাক্তাররা নাকউঁচু...হসপিটাল নোংরা করা সবার অধিকার। এই অধিকার কেন তারা পাবে না?
"নাকে নল দেওয়ার পর রোগীকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে যান/ স্প্রেটা নিজে স্প্রে করে দিয়ে যান/ রাত ১০ টায় ডিপার্টমেন্টাল হেডকে দেখার ব্যবস্থা করে দিয়ে যান/রোগীকে ঢাকায় নিয়ে যাব একজন ডাক্তার এম্বুলেন্সে চলুন/ রোগীর ইয়াং আত্নীয়ের ব্লাড প্রেশারটা একটু মেপে দিয়ে যান/ আপনাদের রুমে তো কয়েকটা খাট আছে এখানে রোগী শোয়ানো যাবে কি না/ চিকন পিনের চার্জার হবে কি না/ এক রোগীর ১০ জন আত্নীয় কিছুক্ষণ পরপর আলাদাভাবে রোগীর অবস্থা বুঝিয়ে দিন"--এসব আমরা শুনে শুনে অভ্যস্ত। আমরা ধরে নিই অজ্ঞতার কারণে এমন করছেন, আমরা এসবে রিয়েক্ট করি না৷ বুঝিয়েই বলে দিই বেশিরভাগ সময়।
আমার পরিবার, আত্নীয়, বন্ধুবান্ধব, কলিগ ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞেস করে দেখবেন আমার ব্যবহারের কথা। অন্য আর কিছু না হোক অন্তত ব্যবহার ভালো এতোটুকু শুনবেন তা আমি নিশ্চিত৷
আপনার বাসায় প্রোগ্রাম। দাওয়াত দিয়েছেন ৩০০ মানুষ, চলে আসে যদি ৩০০০--আপনার অবস্থা কী হবে? আপনি কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন? আমি যেখানে কাজ করি সে ডিপার্টমেন্টে সার্ভিস দেওয়া যাবে সর্বোচ্চ ৭২ জনকে, আমার যদি ২৫০-৩০০ মানুষকে প্রতিনিয়ত সার্ভিস দিতে হয়, আমি কি তাদের সন্তুষ্ট করতে পারব যতোটুকু করা দরকার ছিল? বিনা বেতনে কাজের কথা আর উল্লেখ করলাম না। শুধু দুটো প্রশ্ন করি।
১. আপনার তো একজনই রোগী। আপনার ডাক্তারের তো ২৫০ জন রোগী। শুধু নিজের স্বার্থ না ভেবে তাকে একটু বুঝবেন না? সেও তো রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। কোনো দৈবশক্তিপ্রাপ্ত বা এলিয়েন না।
২. এই দেশে কোন কোন প্রফেশানের মানুষদের সার্ভিসে আপনি সন্তুষ্ট?
ডা. মারুফ রায়হান খান