30/03/2025
"উমরকে যে গুলিটা করা হয় সেটা সামনের আরো দুইজনকে আহত করে ওর বুক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়, এবং পিছনের একটা সিলিন্ডারকে ব্লাস্ট করে।..."
'১৯ জুলাই আমরা জুমা শেষে লক্ষ্মীবাজার আন্দোলনের দিকে রওয়ানা দিই৷
আমরা ৪ জন একসাথে দাঁড়ায়ে ছিলাম। সামনেই সংঘর্ষ চলতেছিল। উমর ফারুক পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটু আগানোর চেষ্টা করতেছিল৷ হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হয়। তখন ওকে একটা গেইটের ভিতর ঢুকে যাইতে দেখি। আমরা ৩ জনও একেকদিকে সরে যাই।
পরিস্থিতি একটু শান্ত হওয়ার পর আমি চিন্তা করলাম যে, উমর ত গেইটের ভিতরেই ঢুকছে, ও সেইফ। বাকি ২ জনের খোঁজ আগে নিই। ওদেরকে ফোন দিয়ে জানতে পারি ওরা ঠিকঠাক আছে। তারপর উমরকে ফোন দিই৷ একটা অপরিচিত লোক কল রিসিভ করে বলে, ও মারা গেছে!
উমরকে যে গুলিটা করা হয় সেটা সামনের আরো দুইজনকে আহত করে ওর বুক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়, এবং পিছনের একটা সিলিন্ডারকে ব্লাস্ট করে৷
আমরা প্রাথমিকভাবে জানতাম ওর শরীরে গুলি লাগছে ৩টা। আসলে বাকি দুইটা গুলি না৷ ব্লাস্ট হওয়া সিলিন্ডারের দুইটা অংশ ওর পিঠে ঢুকে গেছিল।
উমরের লাশের জন্য আমাদের ঢাকা হসপিটালে আর থানায় দৌড়ানো লাগছিল ২ দিন।
লাশ দ্রুত বুঝে পাওয়ার জন্য আমাদেরকে ওরা একটা কাগজে সাইন করতে বলছিল, যেটার সারমর্ম ছিল মোটামুটি এমন, 'যে মারা গেছে সে জঙ্গী। সে পুলিশের উপর নিজেই আক্রমণ করে। প্রাণরক্ষার্থে পুলিশ তাকে গুলি করতে বাধ্য হয়।' আমরা অবস্থা ধরতে পেরে সাইন করতে অস্বীকৃতি জানাই।
আমাদের থানায় যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সূত্রাপুর থানার পরিস্থিতি ছিল এমন যে, ঢুকতে চেষ্টা করলেই গুলি করে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত যখন ঢুকি, আমাদেরকে জানানো হয়, ১৯ তারিখ এই এলাকায় কোনো সংঘর্ষ হয়নাই। অথচ ওইদিন ওইখানে শুধু মারা'ই গেছিল ৭ জন!
সেদিন আমি ঢাকা মেডিকেলে ট্রাক ভরে, ভ্যানগাড়ি ভরে লাশ আনতে দেখছি। ট্রাকের তেরপলের উপর থেকে রক্ত ছুইয়ে ছুইয়ে পড়তেছিল।
মর্গে লাশ রাখা হইছিল একটা উপরে একটা। আমি আরেকটা অদ্ভূত বিষয় খেয়াল করছিলাম। কোনো লাশের চেহারাই চেনা যাচ্ছিল না! মুখে হয়ত কোনো একটা মেডিসিন ইউজ করা হইছে, যেন লাশ শনাক্ত করতে না পারা যায়।
পরিস্থিতি এমন ছিল, উমরের জানাজা পড়ার জন্য আমরা তার গ্রামের বাড়িতেও যাইতে পারিনাই।
উমর ছিল আমার রুমমেট। আমরা একই বিছানায় ঘুমাইছি, একই পাতে খাইছি। আমার সবই ও জানতো, ওর সবই আমি জানতাম। ৮ মাস হয়ে গেল, আমি এখনো স্ট্যাবল হয়ে উঠতে পারিনাই।
উমরের আম্মু পুরাপুরি ভেঙে পড়ছে, লাশও দেখতে পারেনাই। আমাকে এখনো মাঝেমধ্যে ফোন দিয়ে বলে, বাবা, ওমর কি রাগ করছে? ফোন ধরেনা কেন আমার?'
- গাজি আলাউদ্দিন বেলাল (শহিদ উমর ফারুকের বন্ধু)