02/12/2025
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞাতার্থে
প্রিয় অভিভাবকবৃন্দ,
স্নেহের শিক্ষার্থীরা,
আপনারা ইতোমধ্যে জেনেছেন যে সারা বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে—সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বর্তমানে কর্মবিরতিতে রয়েছেন। এর ফলে আপনাদের মধ্যে নানা ধরনের অস্বস্তি, অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—এটা আমরা আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করি।
আপনাদের এই অসুবিধা ও মানসিক চাপে আমরা গভীরভাবে দুঃখিত। তবুও কেন শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে কর্মবিরতির মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—তা আপনাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করি।
কর্মবিরতির কারণসমূহ:
১. দীর্ঘ ৭ বছরের প্রমোশন ১৫ বছরেও হচ্ছে না
শিক্ষকদের জন্য ৭ বছরে প্রমোশন দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে বহু শিক্ষক ১৫ বছর হয়ে গেলেও সেই প্রমোশন পাচ্ছেন না। একই পদে থেকে বছরের পর বছর আমাদের কর্মজীবন স্থবির হয়ে আছে।
২. ২০ বছর চাকরি করেও কোনো টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড নেই
সরকারি চাকরিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পাওয়ার কথা। এমনকি এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় থাকলেও বহু বছর ধরে মাধ্যমিক শিক্ষকদের তা প্রদান করা হচ্ছে না।
৩. গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য—ফলে প্রশাসনিক দায়িত্বে বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের ৮০% পদের কোনো নিয়োগ নেই।
জেলা শিক্ষা অফিসারের অর্ধেকেরও বেশি পদ শূন্য।
এই কারণে বিদ্যালয় পরিচালনা, মনিটরিং, একাডেমিক কার্যক্রম—সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে।
৪. সহকারী শিক্ষকের প্রায় ২৫০০ পদ শূন্য
ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষাদান করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
৫. একই এন্ট্রি পদের শিক্ষকদের সঙ্গে বৈষম্য
আমাদের সঙ্গে একই সময়ে যারা ১০ম গ্রেডে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন—তাদের অধিকাংশের এন্ট্রি গ্রেড ৯ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে।
কিন্তু সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখনো ১০ম গ্রেডেই রয়ে গেছেন—যা এক বড় অবিচার।
কেন শিক্ষকরা কর্মবিরতি করতে বাধ্য হয়েছেন?
দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা, স্মারকলিপি, মানববন্ধন—সবকিছু করেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
আমাদের পেশাগত মর্যাদা, পদোন্নতি, বেতন-গ্রেড, প্রশাসনিক স্থবিরতা—সবকিছু উপেক্ষিত হওয়ায় শিক্ষকদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা চাই সবার মতো ন্যায্য অধিকার—যা আইন, নিয়ম এবং আদালতের রায় অনুযায়ী আমাদের পাওয়ার কথা।
শিক্ষকরা কখনোই শিক্ষার্থীদের অসুবিধা চান না। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকই আমাদের শক্তি, আমাদের অনুপ্রেরণা। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলায় আমরা বাধ্য হয়েছি শান্তিপূর্ণ কর্মবিরতির পথে হাঁটতে।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ
আপনাদের অসুবিধার জন্য আমরা সত্যিই আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
আমরা আশা করি—আপনারা শিক্ষকদের এই ন্যায্য দাবির প্রতি সহমর্মী হবেন।
আমরা চাই—সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হোক এবং আমরা আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসতে পারি।
শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা—আমরা সবাই একটি পরিবারের মতো।
এই পরিবারকে এগিয়ে নিতে হলে আপনাদের সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সমর্থন আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে
আমাদের দাবি শিক্ষক সমাজের উন্নতির জন্য, আর শিক্ষক সমাজের উন্নতি মানেই শিক্ষার্থীদের উন্নত ভবিষ্যৎ।
আমরা শিগগিরই স্বাভাবিক শিক্ষাকর্মে ফিরে আসতে আশাবাদী।
আপনাদের ভালোবাসা, প্রার্থনা ও সমর্থন আমাদের পথচলার শক্তি হবে।
সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা।
শিক্ষার্থীদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আবারো দুঃখ প্রকাশ করছি।